ভিক্টোরীয় যুগে ব্রিটেনে পেঁয়াজ বিক্রির একটি জনপ্রিয় স্থান ছিল বার্মিংহাম অনিয়ন ফেয়ার। সাধারণত সেপ্টেম্বরের শেষ মঙ্গলবার এ মেলা অনুষ্ঠিত হতো। এটা ছিল শরতের এক উৎসব এবং একই সঙ্গে দারুণ ব্যস্ত এক বাজার। দি ইলাসট্রেটেড লন্ডন নিউজ উনিশ শতকের শেষ দিকে দাবি করেছিল এমন ভালো জাতের ও এত পরিমাণে পেঁয়াজ দুনিয়ায় আর কোথাও এক ছাদের তলায় মিলবে না। ১৮৭৪ সালে এ মেলা ঘুরে সাংবাদিক জেমস গ্রিনউড লিখেছিলেন—

বুল রিঙে, যেখানে মেলা অনুষ্ঠিত হয়, পৌঁছনোর অনেক আগেই আপনার নাকে পেঁয়াজের ঘ্রাণ এসে ধাক্কা দেবে। সাগরে যাওয়ার আগেই যেমন পানির নোনতা ভাব টের পাওয়া যায়, তেমনি মেলায় প্রবেশের আগে থেকেই ঠোঁটে পেঁয়াজের ঝাঁঝাল স্বাদ টের পাওয়া যাবে।

ব্রিডাররা তাদের নতুন বীজ ক্যাটালগসহ হাজির হতেন। এগুলোয় তাদের পেঁয়াজের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হতো। এতে থাকত নানা বিশেষণ আর রঙিন অলংকরণ। এককথায় আকর্ষণীয় মার্কেটিং। বড় কোম্পানিগুলো তাদের পেঁয়াজ কেন অন্যের চেয়ে সেরা তার বিবরণ দিত এসব ক্যাটালগে। বোঝা যাচ্ছে, শিল্প বিপ্লবের দেশে পেঁয়াজ আস্তে আস্তে বাণিজ্যিক পণ্য হয়ে উঠছে। তবে তখনো তা মুখ্যত কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বার্মিংহামের মেলার বর্ণনা দিতে গিয়ে দি ইলাসট্রেটেড লন্ডন নিউজ জানিয়েছিল—‘মেলায় আগত ডিলার ও ক্রেতার মূলত ওয়ারউইকশায়ারের গ্রামাঞ্চলের মানুষ। শহরের বণিকদের আগমন তেমন বেশি নয়। আর আসে শ্রমিকদের স্ত্রীরা।’ উনিশ শতকে ব্রিটেনের গরিবদের খাবারের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান ছিল পেঁয়াজ। সে সময় যে সবজিটির পেছনে তারা বেশি ব্যয় করত তা এ ঝাঁঝাল স্বাদের পেঁয়াজ। একই সময়ে আমেরিকায়ও পেঁয়াজ সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে নিয়মিত উপস্থিত থাকত।

বহুকাল ধরেই রান্নার অতিজনপ্রিয় ও প্রয়োজনীয় উপাদানের মধ্যে একটি হলো পেঁয়াজ। ইতিহাসবিদদের মতে, মানবসভ্যতায় গোড়ার দিকে চাষ হওয়া কিছু ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম। নানা জলবায়ুতে খাপ খাইয়ে নেয়া, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য ও সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় প্রাচীন মানুষের কাছে পেঁয়াজ ছিল অতিপ্রয়োজনীয় একটি খাদ্যপণ্য। 

খ্রিস্টপূর্ব ৫১ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যে অধিবাসীরা কর ও ভাড়া পরিশোধ করতেন পেয়ঁাজ দিয়ে। তাই পেয়ঁাজের কদর প্রাচীনকাল থেকেই।

যুক্তরাষ্ট্রের পেঁয়াজ সমিতির তথ্যানুযায়ী, পানির মতো প্রাচীন মানুষের তৃষ্ণাও নাকি মেটাত এ পেঁয়াজ! আবার, ‘‌যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল অনিয়ন অ্যাসোসিয়েশন’-এর তথ্যানুযায়ী পৃথিবীতে যখন কৃষিকাজের প্রচলনও ছিল না, তখনো পেঁয়াজ মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ছিল।

ষোড়শ শতাব্দীতে মানুষ আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায়। উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ গড়া ইউরোপীয়দের প্রথম চাষ করা ফসল ছিল পেঁয়াজ। তবে ইউরোপীয়দের আগমনের আগেই সেখানকার আদিবাসীদের মধ্যে পেঁয়াজের ব্যবহার ছিল। রান্নার পাশাপাশি তারা নানা সিরাপ, রঙ ও ওষুধ প্রস্তুত করার জন্য পেঁয়াজ ব্যবহার করত। পেঁয়াজের জনপ্রিয়তার কারণেই বিশ্বজুড়ে এটি বাণিজ্য পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়। ইউরোপজুড়ে যে সবজিগুলোর চাহিদা বাড়ছিল তার মধ্যে এটি ছিল একটি। এর অন্যতম কারণ ছিল এটি দ্রুত পচনশীল নয়, যদি শুকনো ও সূর্যালোক থেকে দূরে রাখা হয় পেঁয়াজ ছয় মাস পর্যন্ত ভালো থাকে, তাই সংরক্ষণ করা সহজ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তুষার হিম ঠাণ্ডায়ও এটি সহনশীল। এককথায় যেকোনো আবহাওয়ায়ই পেঁয়াজ ফলানো যায়। পাশাপাশি পেঁয়াজ উচ্চফলনশীল ও চাষে বেশি শ্রম দিতে হয় না।

মধ্যযুগীয় ব্রিটেনে নিয়মিতভাবে খাদ্যতালিকার ছয় ধরনের সবজির মধ্যে পেঁয়াজ ছিল অন্যতম একটি। মধ্যযুগে ভেষজজাতীয় খাবারের চাহিদা বেশি ছিল। অবশ্য, এ সময়ে পেঁয়াজ লোকপ্রিয় হওয়ার পেছনে আর একটি কারণ ছিল এর বহুমুখিতা। এটি সুপ বা স্টু তৈরিতে যোগ করা হতো। খাবারে মিষ্টি স্বাদ বাড়াতে ও সুগন্ধ যুক্ত করতে এর জনপ্রিয়তা ছিল।

ইংরেজ ভেষজবিদ ও উদ্ভিদবিদ জন পারকিনসন (১৫৬৭-১৬৫০) আজকের ট্রাফালগার স্কোয়ার থেকে খুব দূরে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে একটি বিখ্যাত বোটানিক্যাল গার্ডেন করেছিলেন। তিনি উদ্ভিদ চাষের ওপর একটি গ্রন্থে লিখেছেন বিশ্বের সেরা পেঁয়াজ আসে স্পেন থেকে । কবি জন স্কেলটনও ১৫২২ সালে লিখেছিলেন ‘‌স্প্যানিয়ার্ড অনিয়ন’। আবার মার্টিন লিস্টার তার লেখা জার্নি টু প্যারিসে (১৬৯৯) ফরাসিদের খাওয়া কিছু পেঁয়াজের জাত উল্লেখ করেছেন। আকারে বড়, লাল রঙের ও মিস্টি স্বাদযুক্ত পেঁয়াজই ছিল বেশি প্রচলিত। তাই বলা যায় পেঁয়াজ মোটামুটি ইউরোপ থেকেই ছড়িয়ে পরেছিল গোটা দুনিয়ায়।

অ্যালিয়াম অ্যাকুমিনেটাম এটি উত্তর আমেরিকার একটি উন্নত আদিবাসী জাত পেঁয়াজ, যাকে টেরাপিন পেঁয়াজও বলা হয়। আমেরিকাকে নিউ ওয়ার্ল্ড বলা হতো। এ নিউ ওয়ার্ল্ডে পেঁয়াজের উল্লেখ করেছিলেন উইলিয়াম উড। ১৬৬৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তার বই, যেটি প্রাণবন্ত আমেরিকাকে নিয়ে ছিল। সেখানে তিনি পেঁয়াজের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সে সময় ম্যাসাচুসেটসের কিচেন গার্ডেনে পেঁয়াজ সহজে চাষ করা যেত। সম্ভবত ইউরোপ থেকে বসতি স্থাপনকারীরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সে সময় থেকেই রান্নায় পেঁয়াজ প্রধান খাদ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল। ফলে এর কদরও বাড়তে থাকে। পেঁয়াজের ইতিহাস দীর্ঘ পঁাচ হাজার বছরের। তবে মধ্যযুগ থেকেই আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে পেঁয়াজ সবজির চেয়েও বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে আয়ুরবেধিক ওষুধ হিসেবে। পেঁয়াজ বাণিজ্যে এক-একটি দেশে ভিন্ন রকম কারণে অগ্রসর হয়েছিল। পূর্বে ইউরোপ যেমন খাবারে মিস্টি স্বাদ ও সুগন্ধ যোগে সবজি হিসেবে খাদ্যতালিকায় যোগ করেছিল। আবার ভারতীয় উপমহাদেশে পেঁয়াজ রান্নায় মসলার একটি রূপ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সব খাঁটি ভারতীয় খাবারে পেঁয়াজের ব্যবহার করা হয়। ভারতীয়রা বিশ্বাস করত এটি ওষুধের মতো কাজ করে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রান্নার অংশ হিসেবে এটি স্থান পেয়েছিল।

১৯৩৯ সালে ব্রিটেনে যে পরিমাণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল তার ৯৮ শতাংশই বিদেশে উৎপাদিত। ফ্রান্স কিংবা নেদারল্যান্ডসে। এ সময় একদল ভ্রাম্যমাণ পেঁয়াজ বিক্রেতা ছিলেন যাদের বলা হতো ’অনিয়ন জনিস’। এরা সাইকেলে চেপে পেঁয়াজ বিক্রি করত। কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে ’অনিয়ন জনিস’রা ব্রিটেন ত্যাগ করে।

মধ্য এশিয়া ও মিসরে পেঁয়াজ উৎপাদন আগে বেশি থাকলেও বর্তমানে ভারত ও চীন পেঁয়াজ উৎপাদনে সর্বোচ্চ। পেঁয়াজের নানা গুণের মাঝে এটি ক্যান্সারসহ নানা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে। চুল পড়া কমানো, ত্বক ভালো রাখা ও রক্তের সঠিক চলাচলে সাহায্য করে। ফলে এর উৎপাদন ও বাণিজ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বাড়তে থাকে। ব্রিটেনে হঠাৎই পেঁয়াজ দুর্লভ হয়ে উঠল। দাম বেড়ে গেল। লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে। সরকার সবাইকে বাগানে পেঁয়াজ চাষ করতে পারমর্শ দেয়।

টমেটোর পরে পেঁয়াজ বিশ্বের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ হর্টিকালচারাল পণ্য। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে আছে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, ইরান।

পুরো বিশ্বে হাজারো জাতের পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে, তাও কেন পেঁয়াজের দাম হাতের নাগালের বাইরে। এ প্রশ্নের উত্তর হতে পারে বিশ্বজুড়ে এর চাহিদা ও গুণাগুণের জন্য এটি জনপ্রিয়। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা পেয়েছে সিন্ডিকেট সফলতা।

ফারিহা আজমিন: লেখক