পেঁয়াজ আমাদের নিত্যব্যবহার্য মসলায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু পেঁয়াজের আছে একটা ইতিহাস। এলিজাবেথীয় কালপর্বে পেঁয়াজের কয়েকটি প্রকার সম্পর্কে জানা যায়। এগুলো পরবর্তী সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে রফতানি হয়। সেভাবেই পশ্চিম থেকে পূর্বে এসেছিল। মজার ব্যাপার এসব পেঁয়াজের নাম ছিল সন্তদের নামে। যেমন ইংরেজ বোটানিস্ট জন পার্কিনসন (১৫৬৭-১৬৫০ খ্রি.) এ নিয়ে লিখেছেন। তিনি পেঁয়াজের বেশ কয়েকটি জাতের নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে আছে সেন্ট অমের্স ও সেন্ট থমাস অনিয়ন। এর মধ্যে সেন্ট অমের্স আবার ফ্রান্সের একটি শহরের নাম। এভাবে শহর, ব্যক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জুড়ে পেঁয়াজ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা কিংবদন্তি।

ইউরোপীয়রা মধ্যযুগের পর ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বিশেষত দক্ষিণ ও পূর্বে। এসব জায়গায় তারা স্থাপন করেছিল কলোনি। সেই সব কলোনিতে তারা নিয়ে গিয়েছিল তাদের পছন্দের সবজি ও মসলা। এসবের সূত্র আছে ইউরোপীয়দের কবিতা ও গল্পে। যেমন কবি জন স্কেলটন তার কবিতায় দ্য স্প্যানিয়ার্ড অনিয়নের কথা লিখেছেন। অন্যদিকে বাগানবিশারদ জন এভলিন লিখেছেন সবচেয়ে সেরা জাতের পেঁয়াজ আসত স্পেন থেকে।

কিন্তু এখানেও একটা প্রশ্ন আসে। পেঁয়াজ পশ্চিমের না পূর্বের? কেননা ভারতেও পেঁয়াজের একটা খোঁজ পাওয়া যায় এবং সেটা ইউরোপীয়দের আগমনের কাছাকাছি সময়ের। যেমন বলা হয় মাংসের পদ দোপেঁয়াজা তৈরি করেছিলেন আকবরের এক সভাসদ। মজার ব্যাপার তার নামই নাকি মোল্লা দোপেঁয়াজা। তাহলে তার নাম থেকে পেঁয়াজের নাম হলো নাকি পেঁয়াজ থেকে তার নাম হলো—সে এক বিসংবাদ। দোপেঁয়াজা আবার হায়দরাবাদের স্থানীয় ডিশ। তাহলে ধরা যেতে পারে সেখানেও পেঁয়াজ ছিল। এখন পেঁয়াজকে তাহলে পাওয়া যাচ্ছে স্থানীয় কালচারের সঙ্গে এবং আমরা দেখছি পেঁয়াজের সঙ্গে মেলানো মানুষের নামও পাওয়া যায় ফোকলোরে। এখানে ফোকলোর কথাটা বলা হচ্ছে কারণ মোল্লা দোপেঁয়াজা নামক ব্যক্তিটি সম্পর্কে মোগল ইতিহাসে আলোচনা খুব বেশি নেই। তবে তাকে ‘ভাঁড়’ গোত্রের বলেই অনেকে উল্লেখ করেছেন। দোপেঁয়াজা সম্পর্কে নানা কৌতুক পাওয়া যায়। তাহলে তিনিও আসলে ফোকলোরেরই অংশ এবং তার তৈরি ডিশ দোপেঁয়াজার কথাও ভারতের লোককথায় পাওয়া যায়।

মধ্যযুগের আগেও ভারতের লোককথা বা লোকাচারের সঙ্গে মসলার সংযোগসূত্র মেলে। যেমন একটা বিষয় হিন্দুদের মধ্যে এখনো প্রচলিত। তাদের অনেকেই পেঁয়াজ রসুন খায় না। আমিষের সঙ্গে তুলনা করে। বিশেষত প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণ ও বৈশ্যরা পেঁয়াজ রসুন বর্জন করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল এতে শরীর গরম হয় এবং কামনা বাসনা বাড়ে। কিন্তু পেঁয়াজ, রসুন প্রভৃতির ঔষধি গুণ তারা জানতেন। ভারতের প্রাচীন চিকিৎসা বা ওষুধ প্রস্তুতিতে পেঁয়াজের ব্যবহার ছিল। বেদসহ আরো অনেক গ্রন্থে দেখা যায় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সমাধানে রসুন ও পেঁয়াজ খাওয়ার চল ছিল।

কিন্তু এখনো স্বামীনারায়ণ গোত্রের লোকেরা এ দুই মসলা গ্রহণ করেন না। বচনামৃতেও পেঁয়াজ ও রসুন খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে। তিন হাজার বছর পুরনো জৈন মতেও পেঁয়াজের কথা আংশিকভাবে পাওয়া যায়। জৈনরা অহিংস। তারা কোনো জীবের ক্ষতি করতে নারাজ। তাদের ধর্ম অনুসারে মাটির নিচে জন্মে এমন খাবার গ্রহণ নিষেধ। কেননা এর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ নানা ছোট জীবের ক্ষতি হতে পারে। জৈনদের ধর্মগ্রন্থে পেঁয়াজ জাতীয় মসলার কথা আছে। এছাড়া তারা মূল জাতীয় ফল, সবজি ও মসলাকে অনন্তকায়া মনে করে। সে কারণে এসব খাদ্য হিসেবে গ্রহণে নারাজ। কিন্তু ভারত বলতে যে ভূমিভাগ আমরা বুঝি সেখানকার খাবারে পেঁয়াজের ব্যবহার ছিল এবং তা ব্যবহার করা হতো অ্যান্টিবায়োটিকের গুণ থাকার কারণে। সেকালে মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক বুঝতেন না। তবে ঔষধি গুণ আবিষ্কার করেছিলেন।

ওদিকে ইউরোপেও পেঁয়াজ নিয়ে নানা চর্চা চলেছে। ১৬৯৯ সালে প্রকাশ হয় এভলিনের লেখা এসেটারিয়া। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা সাধারণত সালাদে পেঁয়াজ ব্যবহার করি। এটা রসুনের মতো গরম না। তবে ক্ষুধা বৃদ্ধি করে।’ অর্থাৎ মধ্যযুগ ও এর পরেও ইউরোপে পেঁয়াজের ব্যবহার বেশ ভালোই ছিল। এরপর তারা অবশ্য পেঁয়াজ ব্যবহারে পরিমাণ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়েও নানা মত দিয়েছেন। কিন্তু এর মধ্যে দেখা যায় আঠারো শতকের দিকে উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপ পেঁয়াজকে অবসরে পাঠানোর দিকে হাঁটছিল। অন্যদিকে পূর্ব ও দক্ষিণ ইউরোপ রসুন খাওয়া বাড়িয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে আবার দেখা যায় আমেরিকান ও ব্রাইটনদের কাছে প্রিয় ছিল ফ্রেঞ্চ অনিয়ন সুপ। পেঁয়াজকে ক্যারামেলাইজ করে তৈরি করা হতো এটি।

পেঁয়াজের ব্যবহার বিশ্বের নানা অঞ্চলেই ছিল এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন লেখার পাশাপাশি ছবিতেও। পেঁয়াজ ও রসুন বিক্রেতাদের ছবিও এঁকে গেছেন তারা। এর মধ্য থেকে মসলা দুটির জনপ্রিয়তাও বোঝা যায়। ‘অনিয়ন ভেন্ডর’ শিরোনামে সতেরো শতকের একটি ছবিতে দেখা যায় বাঁকে পেঁয়াজ ঝুলিয়ে ফেরি করছেন এক ফেরিওয়ালা। মার্সেলাস লারুনের আঁকা ‘বাই মাই ফোর রোপস অব হার্ড অনিয়নস’ ওই শতকের লন্ডনের চিত্র দেখায়। সেখানে পেঁয়াজ ফেরি করা হতো। উনিশ শতকের চীনা চিত্রকর্মে দেখা যায় রসুন দিয়ে চিকিৎসার কথা। এছাড়া অষ্টাদশ শতকের ফরাসি চিত্রে দেখা যায় কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়ার দৃশ্য। এদিকে রাশিয়ায় ১৭১৪ সালে তৈরি একটি গির্জার গম্বুজ তৈরি হয়েছে পেঁয়াজের আকৃতিতে। বোঝাই যায় পেঁয়াজ সেখানে জনপ্রিয় ছিল।

এগুলো পুরোপুরি ফোকলোর না। অনেকটাই ইতিহাস। তবে ফোকলোর ও ম্যাজিকের সঙ্গেও আছে পেঁয়াজের সম্পর্ক। সে আলাপ আরো আগ্রহজাগানিয়া। মাটির নিচে জন্মে ও বেড়ে ওঠে এমন সব মসলা নিয়ে ইউরোপে নানা লোককথা আছে। আর এর মধ্যে অনেকগুলো আসলে তাদের বহুদিনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ফল। যেমন মাশরুম ক্ষতিকর নাকি খাওয়ার উপযোগী তা নিয়ে কথা বলে ইউরোপীয় ফোকলোর। বলা হয়, ‘মাঠে ঘাটে ফলা মাশরুম কেমন তা বুঝতে হলে একটা পেঁয়াজ নিন। এর খোলসটি তুলে নিন। তারপর মাশরুমের সঙ্গে সেদ্ধ করতে হবে। যদি সেটা সাদা থাকে তাহলে মাশরুম ক্ষতিকর না। কিন্তু যদি মিশ্রণ নীল বা কালো হয় তাহলে এ মাশরুম বিষাক্ত।’

আমাদের দেশে স্বপ্ন নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। মাছ দেখলে টাকা আসে, মৃত্যু দেখলে ক্ষতির সম্ভাবনা ইত্যাদি। লোকবিশ্বাসের অংশ এসব। পেঁয়াজ নিয়েও স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করে লোকবিশ্বাস আছে ইউরোপে। যেমন বলা হয় যদি কেউ পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর স্বপ্ন দেখে তাহলে পরিবারে রোগ শোক আসে। কিন্তু পেঁয়াজ খাওয়ার স্বপ্ন দেখলে গুপ্তধন মিলবে। সতেরো শতকের ব্রিটেনে বিশ্বাস করা হতো কোনো রোগীর ঘরে একটা গামলায় কাঁচা পেঁয়াজ রাখলে সে ঘরে আসা অতিথিরা রোগ থেকে নিরাপদ থাকবেন। এছাড়া ব্রিটেনের আরো কিছু অংশে মনে করা হতো ঘরের বাইরে পুঁতে রাখা পেঁয়াজ থেকে আবহাওয়া বোঝা সম্ভব। এ নিয়ে একটি ছড়া এমন—

ভারতে মরিচ, হলুদ, সরিষা ইত্যাদি মসলাকে ভূত তাড়ানোর জন্য ব্যবহারের লোকাচার আছে। ইউরোপেও আছে এ ধরনের লোকাচার। যেমন ভ্যাম্পায়ার তাড়ানোর জন্য রসুন ব্যবহারের কথা শোনা যায়। একইভাবে আরো কিছু ক্ষেত্রে পেঁয়াজ ব্যবহারের রেওয়াজ আছে। তবে এক্ষেত্রে রসুনই তাদের বেশি প্রিয় বা অধিক ব্যবহৃত। আরো নানা অদ্ভুত বিশ্বাস ছড়িয়ে আছে পেঁয়াজ নিয়ে। ভ্যাম্পায়ারের সঙ্গে লড়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার ছাড়াও জার্মানরা পেঁয়াজ নিয়ে একটা অদ্ভুত বিশ্বাস রাখে। ১৮২৮ সালে দ্য টাইমসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এক জার্মান হর্টিকালচার বিশেষজ্ঞ সেখানে বলেন, গোলাপ বাগানের পাশে পেঁয়াজ লাগালে গোলাপের সুবাস বাড়ে। এ নিয়ে মজা করে পত্রিকাটি লিখেছিল, ‘জার্মান ব্যক্তিটি বোধ হয় গোলাপের চেয়ে পেঁয়াজের সুবাস বেশি পছন্দ করেন।’

মাহমুদুর রহমান: লেখক