১ জুলাই ১৯২১: স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর সেই সময়টি ছিল বিভাগপূর্ব বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল সময়। অসহযোগ খিলাফত আন্দোলনে তখন সমগ্র বাংলাদেশ খুবই উত্তপ্ত। এ সময় ঢাকা শহরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অভূতপূর্ব অবনতি ঘটে। পক্ষ তখন দুটি নয়, তিনটি। হিন্দু-মুসলমান উভয়েই ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে থাকলেও মুসলমানদের একটি পক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার বিরোধী। যদিও সামগ্রিকভাবে কংগ্রেস কর্মীদের জোর ও সাংগঠনিক তত্পরতা বেশি, কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনের বিরোধী পক্ষও দুর্বল ছিল না। ঢাকার নবাব হাবিবুল্লাহ প্রথমে ছিলেন দোদুল্যমান, পরে আন্দোলনের বিরোধী শিবিরে যোগ দেন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জন তিনি সমর্থন করেননি।

১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি যতটা আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে হতে পারত, তা হয়নি। সেদিনের ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি ছিল আনন্দ ও বেদনায় মিশ্রিত। পূর্ব বাংলার ও ঢাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনেকেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন। প্রধানত সরকারি কর্মকর্তারাই কার্জন হলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। অনেক বিশিষ্ট হিন্দু নেতা যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। এক অনাড়ম্বর কিন্তু ভাবগম্ভীর পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নবাব হাবিবুল্লাহ।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী এ সময় লেখাপড়া ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ঢাকার হিন্দু-মুসলমান বহু নেতা কারাভোগ করেন। এমনকি রাজভক্ত ঢাকার নবাব পরিবারেরও কেউ কেউ কারাবরণ করেন। যেমন— খাজা আবদুল বারী, খাজা সোলায়মান কদর, আবদুস শাকুর, জিন্দাবাহারের জমিদার চৌধুরী গোলাম কুদ্দুুস, তার ভাই চৌধুরী সেলিম জেলানী প্রমুখ। ঢাকা জেলা কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ (পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী), জেলা কংগ্রেস সভাপতি অতুলচন্দ্র সেন, চন্দ্রকান্ত বেদন্তকান্তী, মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ তখন অন্তরীণ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকার হিন্দু ও মুসলমান নেতারা অনেকেই যোগ দিতে পারেননি। ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে তখন ঢাকার প্রতিটি পাড়া-মহল্লা মুখরিত। সর্বভারতীয় নেতারা এ সময় ঢাকা সফর করে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির ওপর জোর দেন। ১৯২০ সালের ১৮ মার্চ করোনেশন পার্কে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় বিপিনচন্দ্র পাল হিন্দু-মুসলমানের মিলনে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী করতে হবে।’ যদিও বাস্তবে সেই বন্ধুত্ব হয়েছিল ক্ষণস্থায়ী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জনের আন্দোলন থেকে নবাব হাবিবুল্লাহ ও এ কে ফজলুল হক নিজেদের সরিয়ে নেন। ফজলুল হক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুসলমানরা, কারণ তারা এমনিতেই রয়েছে পিছিয়ে। এভাবে লেখাপড়া ফেলে রাজপথে আন্দোলন করলে এবং সেজন্য কারাভোগ করলে মুসলমানরা আরো পিছিয়ে পড়বে; শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, চাকরি-বাকরিসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে খাজা ইউসুফের তত্পরতা ছিল অসামান্য। খাজা ইউসুফ সম্পর্কে গভর্নরের মন্তব্য ছিল, তিনি একজন:

... eminent townsman... to whom the town of Dacca owes so much. The Nawab Sahib is a man who set the compass which was to guide him on his course which he then set for himself. He has haves veered. The loadstone upon which he set the needle of his compass was the welfare of the town and district of Dacca and the betterment of his fellowmen.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ফজলুল হকের অবদান অসামান্য হলেও ১৯২০-২১ সালে তার সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ভালো ছিল না। কারণ তিনি সে সময় কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশ করছিলেন সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি সরকারকে পূর্ণ সহায়তা দেন।

অসহযোগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রথমে অবস্থান নেন ফজলুল হক, মুক্তাগাছার জমিদার জগিকশোর আচার্য চৌধুরী, শেরপুরের জমিদার রায় বাহাদুর চারুচন্দ্র চৌধুরী, মহারাজা শশীকান্ত আচার্য, বরিশালের খান বাহাদুর হেমায়েতউদ্দিন, যোগেন্দ্রনাথ ষোষ, হাকিম হাবিবুর রহমান, রেবতী মোহন বর্মণ, প্রদ্যোৎ কুমার ঠাকুর, নবাব সৈয়দ শামসুল হুদা, নবাব সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। তারা তখন বাংলার খুবই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তবে হিন্দু জমিদারদের কেউ কেউ পরে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে আন্দোলনের পথ গ্রহণ করেন।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯২১ সালের ১ জুলাই স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি দিন। বিশেষ করে বাঙালির আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে দিনটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এদিন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল:

১. পূর্ববঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার।

২. ভারতে একটি স্বশাসিত ও আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা আবাসিক ও শিক্ষাক্রম একই সঙ্গে পরিচালনার জন্য ভারত সরকারের ইচ্ছা পূরণ এবং

৩. কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর থেকে চাপ কমানো।

অবশ্য যখন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করা হয়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আদর্শ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে এবং তা হবে একটি শিক্ষাদানমূলক ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।

[Dacca University]... would be a University open to all— a teaching and a residential University.

পূর্ব বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের কথা প্রায়ই বলা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শুরু থেকেই একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এ বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা পূর্ব বাংলার সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ উপকৃত হয়েছে। বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে গ্রামীণ মুসলমান মধ্যবিত্ত, সম্পন্ন কৃষক ও নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে ২৫ বছরের মধ্যে পূর্ব বাংলায় একটি নতুন হিন্দু-মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হয়, যারা শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই দশকের মধ্যে পূর্ব বাংলায় একটি আলোকিত আধুনিক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে।

প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে হার্টগকে কাজ করতে হয়েছিল চরম সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে। ১৯২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন উৎসবে তিনি তার সে সংকটের কথা বলেন। তিনি বলেন, শুরুতে ছিল অস্বাভাবিক সমস্যা— a position of exceptional difficulty. রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল সংঘাতপূর্ণ, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিবেশও ছিল প্রতিকূল। চব্বিশ পরগনার অধিবাসী, মুসলিমবিদ্বেষী ও তার নিজের হিন্দু সমাজেই নিন্দিত শিক্ষামন্ত্রী পি সি মিত্তারের কাছ থেকে উপাচার্য প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি, বরং পেয়েছেন অব্যাহত অসহযোগিতা ও অসদয় আচরণ। ন্যূনতম অর্থ বরাদ্দে তার অনীহা হার্টগকে হতাশ করে। সে কথা তিনি প্রথম কোর্ট সভাতেই প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নাথান কমিশন আনুষঙ্গিক ব্যয় বরাদ্দ ধার্য করেছিল ১৩ লাখ টাকা। ওই টাকা ছিল খুবই অপ্রতুল। তিনি বলেন, তা দিয়ে একটি আবাসিক  বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে মুসলমান ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে আরো বেশি টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এসব প্রয়োজনের কথা বলার পরও মন্ত্রী বরাদ্দ কমিয়ে ১৩ লাখ থেকে ৫ লাখে নামিয়ে আনেন। এ অঞ্চলের জনগণ মিত্তারের ওই কাজকে মনে করেছিল প্রতিহিংসাপরায়ণতা। খর-ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও স্বাধীনচেতা উপাচার্য মন্ত্রীর অনুদারতার সমালোচনা করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ্য লাইব্রেরিয়ান মুহম্মদ সিদ্দিক খান লেখক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। তার বইও রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক হিসেবে তিনি পুরনো অনেক বই ও দলিলপত্র দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থসংকট নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে হার্টগ ছিলেন গভীর সমস্যায়। স্যার মাইকেল স্যান্ডলারকে লেখা তার একটি চিঠি থেকে তা বোঝা যায়। তিনি [হার্টগ] লেখেন, ‘আমার ব্যক্তিগত অসুবিধা ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যাপারে আমি অত্যন্ত অসুবিধায় আছি। বাংলা সরকারের মন্ত্রণালয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বরাদ্দ ৫ লাখ টাকায় কমিয়ে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আমি খড় বিনা ইট তৈরি করতে পারব না। আমি পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ ছাড়া উপযুক্ত মানের দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারব না’।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক অপ্রতুলতার জন্য হার্টগ যে বিশেষ বিচলিত থাকতেন, তা লেডি ম্যাবেল হার্টগের দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি তার স্বামী সম্পর্কে স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে লিখেছেন, প্রথম থেকেই হার্টগ বুঝেছিলেন যে খরচের ব্যাপারে তাকে খুবই মিতব্যয়িতার সঙ্গে চলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সংকট তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সামাল দিয়েছিলেন।

উপাচার্য হিসেবে তার বিদায়ের বছরে (১৯২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দেড় হাজার। তাদের মধ্যে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ছিলেন ৬৫ জন। পূর্ববতী বছরের শিক্ষার্থী ছিলেন ১ হাজার ৩১১ জন। ওই বছর আসাম প্রদেশের ছাত্র ছিলেন ৭০ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হলে আসামের শিক্ষার্থীদেরও (যাদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যাই ছিল বেশি) পক্ষে কলকাতায় গিয়ে পড়ালেখা ও উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করা সম্ভব হতো না। হার্টগ সে কথা বলতেন।

বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টকে হার্টগ একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে মনোনীত সদস্যদের সেখানে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ দেয়া হতো। অতিশয় বিরূপ মন্তব্যও তিনি শুনতেন। অন্য কোনো সদস্য বাধা দিতে চাইলে তিনি সভাপতি হিসেবে তাকে সে সুযোগ দিতেন না। সভার মিনিটসও নিখুঁতভাবে সংকলিত হতো।

স্যার ফিলিপ হার্টগের পাঁচ বছরের বেশি অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা তার  উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় উপাচার্য জি এইচ ল্যাংলি অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেন:

It is  not possible for me to say how much the University owes to his exceptionally wide experience of University administration, to his enthusiasm, to his untiring energy, and his unwavering faith in the future of the institution which during these years he led with such devotion.

ল্যাংলি গভর্নরকে বলেছিলেন, ‘আমি তার জায়গায় যোগ দেয়ার পর থেকে প্রতিদিনই বুঝতে পারছি কী কঠিন ছিল তার কাজ এবং কী নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তা সম্পন্ন করেছেন।’ ল্যাংলি বলেন, স্যার ফিলিপ হার্টগের চরিত্রের আরেকটি দিক হলো, তিনি শুধু প্রশাসন নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন না। প্রতিটি ছাত্রের সুবিধা-অসুবিধা ছিল তার ভাবনার বিষয়। ছাত্ররাও তাকে তাদের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করতেন এবং যেকোনো ব্যাপারে সরাসরি তার কাছে চলে যেতেন। সাধ্যমতো তিনি তাদের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং সমাধানের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিতেন। ল্যাংলির ভাষায়:

It is the deep personal interest which he took in the welfare of students. He was confidently look forward to Dacca student gaining a reputation for themselves in the future.&dquote;&dquote;

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে, স্নাতক ও মাস্টার্স করে কে কোথায় কী চাকরি পাচ্ছেন বা কী করছেন, সেই খোঁজ রাখতেন হার্টগ। তার সময় পাসের হার ছিল খুব কম, মাত্র কয়েকজন। ১৯২৩ সালে পাস করা একজন একটি কলেজে অধ্যাপকের চাকরি পান। সে সংবাদ শুনে খুবই খুশি হন হার্টগ। অন্য সরকারি চাকরির চেয়ে শিক্ষকতার চাকরিকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। ওই ছাত্রের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কলেজে যোগদানকে হার্টগ গণ্য করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত শিক্ষার ফল— it was because of his experience in Dacca [University] that he was selected.

ছাত্ররা ঠিকমতো ক্লাসের লেকচারে উপস্থিত থাকেন কিনা, সে খোঁজ নিতেন উপাচার্য। হাজিরা খাতা দেখতেন। আর এ প্রশ্নে এ শিক্ষাবিদ-প্রশাসক ছিলেন কঠোর। বিশেষ করে বিজ্ঞানের ছাত্ররা ক্লাস না করলে তিনি তাদের পরীক্ষা দিতে দিতেন না। ১৯২২ এবং ১৯২৩ সালে অনেক ছাত্র পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এ নিয়ে কথা উঠলে তিনি নমনীয় হতে অস্বীকার করেন। শিক্ষার মানের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। ১৯২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন ভাষণে তিনি বলেন:

We have not hesitated to maintain a high examination standard from the first and we shall not hesitate to maintain it.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অনার্স পরীক্ষা হয় ১৯২৪ সালের মার্চে। পাস কোর্স ও অনার্স দুটোরই মান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উঁচু রেখেছিল। বিশেষ করে অনার্সের মান যাতে উপমহাদেশের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম না হয়, সেদিকে ছিল তার কড়া নজর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সুপারিশমতো তিন বছরের অনার্স কোর্সের পক্ষে তিনি বলেন, The reputation of a university depends largely on its Honours students.

ড. হার্টগ মৌলিক গবেষণা কাজের ওপর গুরুত্ব দিতেন। যদিও তিনি জানতেন শিক্ষকরা অর্থনৈতিকভাবে খুবই অসুবিধার মধ্যে কাজ করছেন (তার ভাষায়, the trying circumstances under which the staff have worked)। তার প্রাথমিক পর্যায়ের পাঁচ বছরে অসামান্য গবেষণামূলক সব কাজ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিজ্ঞানের শিক্ষকরাও করেছেন, বাণিজ্য ও কলা বিভাগের অধ্যাপকরাও করেছেন।

শুরুতেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। এ কাজে ঢাকা কলেজ লাইব্রেরির অনেক বই পাওয়া যায়। অর্থের অভাবে খুব বেশি বই কেনা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন পারিবারিক ও ব্যক্তিগত লাইব্রেরি থেকে তিনি বই সংগ্রহ করেন। তাদের মধ্যে ঢাকার নবাববাড়ি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবার সৈয়দ শামসুল হুদা, হাকিম হাবিবুর রহমান প্রমুখ তাদের ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বই দান করেন। তবে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও লাইব্রেরির জন্য বই কেনায় হার্টগের কোনো কার্পণ্য ছিল না। তা নিয়ে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের কথা হলে তিনি চ্যান্সেলরকে বলেছিলেন, ‘খুব শিগগির নতুন নতুন ভবন অবশ্যই তৈরি হবে, পুরনো ভবনের সম্প্রসারণও হবে কিন্তু আমার গুরুত্ব হবে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও বই কেনার ওপর। (...the time is probably near, no doubt new building will be necessary for extensions. But I would for rather spend money on books and on the engagement of efficient teachers than on bricks and mortar.)

ছাত্রদের কতজন লাইব্রেরি থেকে বই ধার নেন, তার হিসাব নিতেন হার্টগ। তিনি লাইব্রেরির রেজিস্টার খাতা আনিয়ে দেখতেন। বিকালে হঠাৎ হঠাৎ লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখতেন কত ছাত্র পড়াশোনা করছেন। পাঠকক্ষে বেশি ছাত্র দেখলে খুবই সন্তুষ্ট হতেন তিনি।

কোন শিক্ষক কী রকম পড়াচ্ছেন সে খোঁজ নিতেন ছাত্রদের সাক্ষাত্কার নিয়ে। শিক্ষাদানে শিক্ষকদের কোনো দুর্বলতা দেখলে তাকে গোপনে সে সম্পর্কে বলতেন। সবার সঙ্গেই তার আচরণ ছিল সহানুভূতিপূর্ণ। কারো দোষ যেমন গোপন করতেন না, কাউকে অসম্মান বা আহতও করতেন না।

 

সৈয়দ আবুল মকসুদ রচিত স্যার ফিলিপ হার্টগ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য গ্রন্থের অংশবিশেষ