রবার্ট এফ ওয়ার্থ। অনুবাদ: শওকত হোসেন
(গত সংখ্যার পর)
স্বদেশী প্রচারণা রামদেবের ভীষণ কাজে এসেছে। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ কেবল কার্যকর বিক্রির কায়দাই নয়, এটা রামদেবকে তার নিজস্ব ব্যবসায়িক কায়কারবারের বিরুদ্ধে হামলা পাশ কাটাতেও সাহায্য করেছে। পতঞ্জলির এক-চতুর্থাংশ শ্রমিক কম মজুরি পাওয়ার দাবি তুলে ধর্মঘটে নামলে ২০০৫ সালের দিকেই এসব হামলা শুরু হয়েছিল। রামদেব ও বালকৃষ্ণ দ্রুত তাদের বরখাস্ত করেন, কিন্তু কোনো কোনো শ্রমিক প্রতিষ্ঠানের ওষুধের নমুনা রেখে দিয়েছিলেন এবং বলেছেন, ওইসব ওষুধে মানুষের মাথার খুলির গুঁড়োসহ (সম্ভবত মাটি বা ছাই থেকে আসা অবশেষ) তালিকার বাইরের বিভিন্ন উপাদানও রয়েছে। সরকারি এক ল্যাবেটরিতে পরীক্ষা করে মানুষ ও পশুর ডিএনএ পাওয়া গেছে। প্রত্যুত্তরে রামদেব ওইসব নমুনা নিয়ে কারসাজি করায় ‘শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী’কে দায়ী করেন (পরবর্তী সময়ে নতুন নমুনা পরখ করে খারাপ কিছু পাওয়া যায়নি)। বিজেপির রাজনীতিকদের মতো ভক্তরাও তার পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছেন।
বছর পরিক্রমায় এভাবে সমালোচনাকে ঠেকানো একটা ধারায় পরিণত হয়েছে। তা সত্ত্বেও পতঞ্জলি এর বিভিন্ন পণ্যের কারণে অন্ততপক্ষে আধডজন আইনি ব্যবস্থার মোকাবেলা করেছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে হরিয়ানা রাজ্যের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পতঞ্জলির গরুর দুধের ঘি ‘নিম্নমানসম্পন্ন ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যায়িত করে। গত এপ্রিলে একটি সরকারি এজেন্সি নমুনা পরীক্ষা করে ‘খাওয়ার অনুপযুক্ত’ বলে আখ্যায়িত করলে ভারতীয় সেনাবাহিনী সৈনিকদের কাছে জনপ্রিয় পতঞ্জলি জুস বিক্রি বন্ধ করে দেয় (পতঞ্জলি পাল্টা দাবি করে যে, ওই জুস আসলে ওষুধ এবং সে কারণে ভুল পরীক্ষা চালানো হয়েছে)। গত বছর বেরোনো রামদেবের নিষিদ্ধ ঘোষিত জীবনীতে সাংবাদিক প্রিয়াঙ্কা পাঠক-নারায়ণ লিখেছেন, বাজারের সবচেয়ে খাঁটি হিসেবে বিজ্ঞাপিত পতঞ্জলির ঘি লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র উৎপাদকের কাছ থেকে সংগৃহীত গরু, মোষ ও ছাগলের দুধের মিশেলে তৈরি শ্বেত মাখন থেকে তৈরি করা হয়। ভারতে ধর্মীয় কারণে খাঁটি ঘির প্রয়োজন থাকায় এ-জাতীয় ব্যাপার গুরুত্ববহ।
কয়েকজন সাবেক কর্মচারী বলেছেন, রামদেব সেফটি ভায়োলেশনের চেয়ে বেশি কিছুর দোষে দোষী। বেশ কয়েক বছর প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা পতঞ্জলির এক সাবেক উচ্চপদস্থ নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সঙ্গে আলাপের সময় প্রতিশোধের আশঙ্কার কথা বলেছেন। বিদায় নেয়ার কারণ জানতে চাইলে রামদেব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কারণ তিনি অসৎ। কারণ তিনি একজন কপটাচারী।’ জোচ্চুরি ও কর্মচারীদের ওপর নির্যাতনের গুরুতর দাবি তোলেন তিনি (ভারতীয় পত্রপত্রিকায় এসব নিয়ে লেখালেখি হলেও কিছুই আদালতে প্রমাণ করা হয়নি বলে মনে হয়)। একটি ঘটনায় রামদেবের ভাই রামভারত জড়িত ছিলেন। ২০১৩ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে চুরির দায়ে সন্দেহভাজন এক শ্রমিককে অপহরণ ও আটকের অভিযোগ তোলা হয় (পরে এ অভিযোগ তুলে নেয়া হয়)। আরেকজন সাবেক পতঞ্জলি নির্বাহী আমাকে একই ধরনের ঘটনার কথা বলে যোগ করেন, তার দৃষ্টিতে উেকাচ দেয়ার পরিকল্পনায় সায় না দেয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন হুমকি পেতে শুরু করেছিলেন। বালকৃষ্ণর কাছে অভিযোগ করেছিলেন, বললেন তিনি, কিন্তু টেলিফোন আসা অব্যাহত ছিল— জীবন হুমকির মুখে ভেবে তিনি ইস্তফা দেন। পতঞ্জলির একজন মুখপাত্র স্পষ্ট ভাষায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটার কথা অস্বীকার করেছেন।
২০০৭ সালে রামদেবের গুরু, শঙ্কর দেব নামে একজন, দারিদ্র্য ও অসুস্থতার কবলে পড়ার পর কোনো রকম দিশা না রেখে অদৃশ্য হয়ে যান। তার প্রতি রামদেবের অবহেলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে (কারণ দেবই রামদেবকে সন্ন্যাসের দীক্ষা দিয়েছিলেন, রামদেব তাকে মা-বাবার মতো সেবা করবেন বলেই প্রত্যাশা ছিল)। ২০১০ সালে রামদেবের এক ঘনিষ্ঠ পরামর্শক রাজীব দীক্ষিত, যিনি তাকে স্বদেশী অর্থনীতির তালিম দিয়েছিলেন এবং পতঞ্জলিকে জাতীয় ব্র্যান্ডে রূপান্তর করতে সাহায্য করেছেন, সহসা মারা যান। তার কয়েকজন বন্ধু বিশ্বাস করেন যে, রামদেব দীক্ষিতের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে ভালো চোখে দেখেননি এবং খোলামেলাভাবেই এখানে অপরাধের আভাসের কথা বলেছেন তারা। কিন্তু মৃত্যুর কারণ হিসেবে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং রামদেব তাকে জড়ানোর চেষ্টাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র হিসেবে নাকচ করে দিয়েছেন। তাকে এটা এবং অন্যান্য দোষারোপের কথা জিজ্ঞেস করলে হাসিমুখে হাত নেড়ে বাতিল করে দেন তিনি। ‘এসব সত্যি নয়’— আমাকে বলেছেন তিনি, ‘আমি খুবই সাধারণ ও নিরীহ আর সহানুভূতিশীল মানুষ।’
দিল্লির সম্পদশালী ব্যবসায়ীদের তার সম্পর্কে ভীত কণ্ঠে কথা বলতে শুনেছি, যেন তিনি তাদের সবারই ক্ষতি করতে পারেন। একটা বিষয় নিশ্চিত, মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ভারতীয় সরকারের তরফ থেকে অসাধারণ আনুকূল্য পেয়েছেন রামদেব। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পরই ভারতজুড়ে বিজেপির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারগুলো পতঞ্জলির জমি কেনার ক্ষেত্রে চড়া হারে ছাড়ের ব্যবস্থা করতে শুরু করে। অলাভজনক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ধরনের আনুকূল্য পাওয়ার কিছু পূর্বনজির রয়েছে, কিন্তু পতঞ্জলির চুক্তিগুলো ছিল খুবই অস্বাভাবিক। এসব চুক্তির ভেতর বৃহত্তমটিতে পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে পতঞ্জলিকে বলতে গেলে বিনামূল্যেই ১ হাজার ২০০ একর জমি দেয়া হয়। স্থানীয় একজন একাডেমিকের দেখানো রাষ্ট্রীয় আইনি দলিল মোতাবেক বিজেপির সঙ্গে সম্পর্কিত বড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট নিয়ন্ত্রিত একটি এজেন্সি এ চুক্তি সম্পাদন করে। গত বছর রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে অন্য তিনটি ভারতীয় রাজ্যে কোম্পানির ৪৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ বাঁচিয়ে দেয়া বেশকিছু কম দামে জমি বিক্রি ও ইজারা দেয়ার দলিল তুলে ধরা হয়। সমালোচকরা বলছেন, এসব চুক্তি বিভিন্ন নির্বাচনে রামদেবের বিজেপিকে জোগানো সমর্থনের প্রতিদানমাত্র।
বিমানপথে আসাম রাজ্যটি দিল্লি থেকে পুবে আড়াই ঘণ্টার যাত্রা। উত্তরে পার্বত্য রাজ্য ভুটান ও দক্ষিণে নদীমাতৃক বাংলাদেশের মাঝখানে নিবিড় বনভূমি ও পলিমাটির এক চিলতে ভূমি। শহুরে ভারতীয়রা বুনো গণ্ডার আর বাঘ, এর আদিবাসী ‘উপজাতি’ জনগোষ্ঠী ও বিচ্ছিন্নতাবাদের ইতিহাসের জন্য পরিচিত সীমান্ত এলাকা হিসেবে আসামের কথা বলে থাকে। কেন্দ্রীয় সরকারের অবিশ্বাস অনেক গভীরে প্রোথিত, আসামের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদের— রাবার, রেশম, কাঠ, চা ও অপরিশোধিত তেল— প্রতি অবহেলা আর শোষণের ইতিহাসই এর জন্য দায়ী। বাংলাদেশী শরণার্থীদের ব্যাপারে ব্যাপক বিস্তৃত অসন্তোষও রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই সাম্প্রতিক দশকগুলোয় সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে অসা মুসলমান (এটা ডাহা মিথ্যা অভিযোগ, বাংলাদেশের মুসলমানদের সীমান্ত পেরিয়ে আসামে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণই নেই— অনুবাদক)। বিজেপি ও মিত্রদের কাছে আসাম হিন্দুত্ব বা হিন্দু আদর্শের উর্বর ক্ষেত্র বলেই মনে হয়েছে।
২০১৪ সালে দলীয় বিজয়ের অল্প পরই পতঞ্জলি আসামের দুটো বিশাল ভূখণ্ডের দখল নিয়ে একটি বিশাল উৎপাদন কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু করে। অন্তহীন চা বাগানের ভেতর দিয়ে বন্ধুর পথে ৮ ঘণ্টার যাত্রা শেষে কারখানাস্থলে হাজির হই আমি। একজন সাইট ম্যানেজার আমাকে স্বাগত জানান, এসবি সিং নামে ঘন ভুরুর অধিকারী সদাপ্রফুল্ল একজন মানুষ। তার সদ্য নির্মিত অফিসঘরটা দেয়ালে ঝোলানো রামদেবের বড়সড় একটা ছবি বাদে ফাঁকাই বলা চলে। জানালা দিয়ে আমরা মাটি কাটা মেশিন আর নির্মাণ শ্রমিক ও কাদাময় খনির আভাযুক্ত মাটি দেখতে পাচ্ছিলাম।
‘আমাদের এই বসার জায়গায় একটা জঙ্গল ছিল’— বললেন সিং। মাত্র ১৩২ দিনে জঙ্গল সাফ করে মোট ৮৮টি হাতি তাড়িয়ে ১৫৫ একর এলাকায় অয়্যারহাউজ কমপ্লেক্স নির্মাণ করে কাজ শুরু করে পতঞ্জলি (হাতিগুলোকে নিরাপদে কাছের এক চিলতে বনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলে আমাকে জানান সিং)। পরিসংখ্যানের তুবড়ি ছোটালেন তিনি— চার হাজার শ্রমিক, ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যাগ সিমেন্ট, ২০ সদস্যের ব্যবস্থাপনা দল— এ সাফল্যের কারণে চকচক করছিল তার দুচোখ। কারখানা অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এখনো আংশিক উৎপাদনক্ষমতায় কাজ করছে। কিন্তু এরই মধ্যে শত শত শ্রমিক কুকি আর প্রসাধনসামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাজার শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সেটা কেবল কাজের দক্ষতার জন্যই নয়।
‘আমরা তাদের মানসিকভাবেও উপযুক্ত করে তুলছি’— বলেছেন সিং। সম্ভাব্য কর্মচারীদের জন্য পতঞ্জলি ৩৮০টির বেশি কর্মশালার আয়োজন করেছে। এসব কর্মশালায় এক ধরনের ‘মূল্য ব্যবস্থা’ শেখানো হয়েছে। আসামের মানুষজনের, বলেছেন তিনি, আমিষজাতীয় খাবার খাওয়ার ও জাতির প্রতি সঠিক সম্মান বোধ না থাকার ‘বদ অভ্যাস’ ছিল। ‘দীর্ঘদিন ধরেই তারা অসাধু লোকজনের কাছ থেকে কলুষিত রাজনীতির কথা শুনে আসছিল’— বললেন তিনি। ‘হাজার হাজার বছর আগে আমাদের সাধু-সন্ন্যাসীরা যেসব কথা বলে গেছেন, আমরা সেগুলোই কাজে প্রয়োগ করেছি। এসব আমরা উদ্ভাবন করিনি। আমাদের শাস্ত্রে যা ছিল সেটাই গ্রহণ করেছি, সেটাকে আধুনিক মোড়কে ধারণ করেছি।’ অন্য কথায়, এগুলো হিন্দুত্বকেই ধারণ করেছে।
সিং আমাকে একটা ইলেকট্রিক গল্ফ কার্টে করে প্রডাকশন কমপ্লেক্স ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। কুকি কারখানা এবং এর ৩০০ ফুট ওভেন দেখার পর রানওয়ের মতো নিদারুণ মসৃণ বাধাহীন বাঁধানো রাস্তা ধরে এগিয়ে গেছি আমরা। আসলে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সঙ্গে পরামর্শ করে নির্মিত একটা রানওয়ে এটি, যাতে জেট ফাইটার ওঠানামা করতে পারে, সিং আমাকে বলেছেন। ‘বাড়তি এয়ারস্ট্রিপের দরকার পড়লে আমরা এটা জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করে দেব’ বলেই সবজান্তার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আবার যোগ করেছেন, ‘আমরা চীনের কাছাকাছি আছি।’ পতঞ্জলি যেন নিজেকে রাষ্ট্রের বর্ধিত অংশ বলেই মনে করে, কিংবা বলা চলে, ভারতীয় লেখক মীরা নন্দার জুতসই ভাষায় ‘মন্দির-রাষ্ট্র-করপোরেট কমপ্লেক্স’ হয়ে দাঁড়ানো ঘটনার বাস্তব রূপ।
আসামে পতঞ্জলির তত্পরতায় আরএসএস দীর্ঘমেয়াদি প্রয়াস থেকে উপকৃত হয়েছে। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকবার নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, অতিসম্প্রতি ১৯৯২ সালে শেষবারের মতো। সময়ে সময়ে দলটি আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে তৃণমূলে সাংগঠনিক তত্পরতা চালিয়েছে এবং প্রায়ই আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক গোপন রাখা বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন গড়ে তুলেছে। মোদিসহ বিজেপির বেশির ভাগ উচ্চপর্যায়ের নেতাই আরএসএস থেকে এসেছেন এবং এর প্রতি আনুগত্য পোষণ করেন। কিন্তু এর বিপুল প্রভাব সত্ত্বেও আরএসএসের ভেতর পিচ্ছিল একটা কিছু রয়েছে। এর আদর্শিকরা জোর দিয়ে বলে থাকেন যে, এটা হিন্দুত্ব বা কোনো একক ধর্মের চেয়ে বড় কিছু এবং তারা ভারতীয় উপমহাদেশ ও দলে প্রতীক জাফরান পতাকার সঙ্গে অতীন্দ্রিয় সংযোগের কথাও বলেন। তারা সামগ্রিক ও ব্যক্তিক, উভয় স্তরে ভারতকে বদলে দিতে চান। ‘এটা মানুষ তৈরির মিশন’— এখন বিজেপির ইংরেজিভাষী প্রকাশনার দায়িত্বে থাকা আরএসএসের একজন প্রবীণ নেতা শিব শক্তি বখশি বলেছেন আমাকে। ‘এমন একজন মানুষ গড়ে তোলা, যিনি সমাজের জন্য কাজ করতে পারবেন, সমাজের একজন নিঃস্বার্থ কর্মী।’ ব্যক্তিগত পরিবর্তনের দিকে এ জোর রামদেবের শারীরিক সুস্থতার প্রচারণার সঙ্গে খাপে খাপে মিলে যায়। বখশি গুরু সম্পর্কে গদগদ ভাষায় কথা বলেছেন। ‘তার বাণী সাধারণ মানুষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন’— বলেছেন তিনি। ‘নির্বাচনে জনমত গঠন করা গুরুত্বপূর্ণ।’
পতঞ্জলির উল্কার মতো উত্থানে অবাক করাসংখ্যক কর্মী আমাকে বলেছেন, তারা প্রতিষ্ঠানটিকে দড়াবাজির খেলা মনে করেন, যা নাও টিকতে পারে। ‘ধারণাগতভাবে, এটা এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান নয়’— আসামের নতুন কারখানার ব্যবস্থাপক সিং বলেছেন আমাকে। ‘এটা একটা বড় আকারের আশ্রম। আর আশ্রমে কী ঘটে? গুরু যা বলে আপনি তা-ই করেন।’ পতঞ্জলির বিক্রি অসাধারণ বেগে বেড়েছে এবং সিং আমাকে বলেছেন, এটা তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। ‘আপনি যখন কোনো কিছুকে টেনে লম্বা করেন, মধ্যখানে একটা ফোকর তৈরি হয়’— পিত্জার তাল টানার ভঙ্গিতে দুহাত দুদিকে সরিয়ে বলেছেন তিনি। হরিদ্বারে প্রসাদ নামে এক তরুণ কর্মচারী আমাকে বলেছেন, রামদেবের কারণে তিনি এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে, নিজের করপোরেট চাকরি ছেড়ে পতঞ্জলিতে যোগ দিতে অনেক কম বেতন চাকরি নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত। ‘আমার মাথায় ঢোকে না, কেমন করে অল্প বেতন দিয়ে গুণাগুণ বজায় রাখতে পারবে’— বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, বিয়ের পর আরো আয়ের দরকার হবে, যখন তিনি এ প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাবেন।
কর্মী ধরে রাখার ব্যাপারটা রামদেবের একটা লাগাতার সমস্যা। প্রতিযোগীদের তুলনায় পতঞ্জলি ২৫-৫০ শতাংশ কম বেতন দেয়ার রটনা থাকা সত্ত্বেও চাকরিপ্রার্থীরা এখানে ভিড় জমান। এক বছর বা তারও কম সময় পরই অনেকে বিদায় হয়ে যান, পতঞ্জলি ও অন্যান্য কোম্পানির নির্বাহীরা বলেছেন। ‘স্বায়ত্তশাসন খুবই কম’— বলেছেন প্রতিশোধের আশঙ্কায় (আরো অনেকের মতো) নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী। ‘...নিয়ন্ত্রণে কে আছেন, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি একজন মাইক্রোম্যানেজার।’ প্রকাশ্য হাসিমুখ চেহারার পেছনে রামদেবকে কেউ কেউ প্রতিহত হলে হিংস্রভাবে আঘাত হানার ক্ষমতাধর একজন স্বৈরতান্ত্রিক মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হরিদ্বারে রামদেবের আশ্রম স্টাইল ব্যবস্থাপনার একটা আভাস পেয়েছি আমি। এখানে এক বিকালে তাকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছিলেন আমাকে। কোম্পানির প্রধান করপোরেট অফিসের দোতলায় হলওয়ে গুরুকে এক নজর দেখার জন্য হাজির হওয়া শিষ্যে গিজগিজ করছিল। একটা গ্রুপ আমাকে জানিয়েছে যে, তারা দক্ষিণের সেই তামিলনাড়ু থেকে এসেছে। শেষ পর্যন্ত রামদেবের জনৈক পরিচারক আমাকে প্রহরীদের পাশ কাটিয়ে একটা কাঠের প্যানেলওয়ালা অফিসে নিয়ে আসে। রামদেব এখানে ঝলমলে বাটনডাউন অক্সফোর্ড শার্ট ও ধূসর ফ্লানেল প্যান্টের ভিড়ে জাফরান একটা ঝলকের মতো ছিলেন। একটা কাউচে আয়েস করে বসে, পায়ের আঙুলে ঝুলছে কাঠের স্যান্ডেল, বিক্রয় ও বিপণনের জন্য প্রার্থীদের সাক্ষাত্কার নিচ্ছেন তিনি। প্রার্থীদের বাইরে অপেক্ষায় থাকা রামদেবের ভক্তদের মতোই সমান বিহ্বল ঠেকেছে। ভেতরে ঢোকার পর প্রত্যেকেই সমীহের সঙ্গে রামদেবের পা ছুঁয়ে তারপর বসছেন। পতঞ্জলির জন্য তারা কী করতে পারবেন বর্ণনা করতে বলছেন তাদের রামদেব। কাছে বসে থাকা একজন ঊর্ধ্বতন নির্বাহী নোট নিচ্ছিলেন, কিন্তু রামদেবই সিংহাসনে আসীন রাজার মতো সাক্ষাত্কার পরিচালনা করছিলেন। এমনকি খুঁটিনাটি ব্যাপারেও জড়িত থাকছেন তিনি: কর্মী নিয়োগ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত, বিজ্ঞাপন ও পণ্য উন্নয়ন।
রামদেবই ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রথম সাধুপুরুষ হবেন না। গত ২০ বছরে অন্তত আধডজন অন্যান্য শক্তিশালী গুরুকে আটক করে বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অতিসাম্প্রতিক এবং সম্ভবত সবচেয়ে জাঁকাল মানুষটি হলেন গুরমিত রহিম সিং, ভুঁড়িওয়ালা, থলথলে গালের একজন মানুষ, যিনি ‘এমএসজি: মেসেঞ্জার অব গড’-এর মতো বেশ কয়েকটি বিচিত্র স্বনির্মিত অ্যাকশন চলচ্চিত্রে সুপারহিরো হিসেবে অভিনয় করেছেন। বিশ্বজুড়ে ৬০ মিলিয়ন ভক্ত থাকার দাবিদার সিং গত আগস্টে ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন (আনুষ্ঠানিকভাবে তার ৪০০ শিষ্যকে নপুংস বানানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়েছে তাকে, তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন)। রায় ঘোষণার পর তার ভক্তরা দাঙ্গা বাধিয়ে গাড়িঘোড়া পোড়ায়, বিভিন্ন দালানকোঠায় আগুন লাগায়, পুলিশ অফিসারদের ওপর হামলা চালায়; অন্ততপক্ষে ৩৮ জন প্রাণ হারায়, আহত হয় ২৫০ জন।
কিন্তু রামদেব তার পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বড় ও সুরক্ষিত। পতঞ্জলি আয়ুর্বেদিক পণ্যের বাজার বিপুলভাবে সম্প্রসারণ করেছে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে মোদি যোগ ও আয়ুর্বেদের প্রসারের লক্ষ্যে অজানা সরকারি দপ্তরকে উন্নত করে একটি নতুন সরকারি মন্ত্রণালয় গঠন করেছেন। রামদেব নিজেকে ভারতীয় অর্থনীতির স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত করেছেন। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চায় না কেউ, এমনকি তার শত্রুরাও না। পতঞ্জলির বিরুদ্ধে মিথ্যা বিজ্ঞাপন দেয়ার অভিযোগ তোলা একজন প্রধান নির্বাহী আমাকে বলেছেন, সবাইকে উপকৃত করা নতুন কাস্টমার ভিত্তি আকৃষ্ট করার কারণে অসংখ্য পাপ সত্ত্বেও তিনি রামদেবের প্রতি কৃতজ্ঞ। ‘আমাদের পক্ষে সবচেয়ে খারাপ হবে যদি তিনি চুপসে যান— দেবপুরুষদের বেলায় কিছুই বলার জো নেই’— বলেছেন তিনি। ‘সেটা গোটা আয়ুর্বেদিক বাজারকেই প্রভাবিত করবে।’
রামদেবের একটা দ্বিতীয় স্তরের বীমা রয়েছে বলে মনে হয়। তার মাথার ওপর ভেসে বেড়ানো মেঘ তার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের মাথার ওপরও ভাসছে। তবে মে মাসের গোড়ার দিকে বহুল প্রচারিত ব্যবসায়িক এক জরিপে জানানো হয়েছে, বহুজাতিক কোম্পানিসহ এ খাতের আরো এক হাজার কোম্পানিকে পরাস্ত করে পতঞ্জলি দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড।
মোদি সরকার সামনে এগোতে পারলে রামদেবের ভাগ্য আরো খুলে যাবে। ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রাসাল স্টেডিয়ামে জনতার উদ্দেশে আমিত শাহ বলেছেন, বিজেপি চায় ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে রামদেব তাদের সঙ্গে যোগ দিন। দলের অন্যতম নতুন অগ্রাধিকার হচ্ছে হিন্দু প্রাধান্য নিশ্চিত করতে ভারতীয় স্কুলের টেক্সটবইগুলো নতুন করে লেখার উচ্চাভিলাষী প্রয়াস। ভারতীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী ও আরএসএসের কট্টর সমর্থক মহেশ শর্মা বলেছেন, তিনি বহুসংস্কৃতির নকশা হিসেবে ভারতের প্রচলিত ইতিহাস নতুন করে লেখার আশা করেন এবং প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রগুলো কিংবদন্তি নয়, বরং ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিশ্বাসকেই প্রোথিত করতে চান।
‘শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক কিছু করার বাকি রয়ে গেছে’— রামদেবের বায়োপিকের ঠিক পর পরই স্টেডিয়ামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছেন শাহ। ‘কারণ আমাদের সন্ন্যাসী আর বীরেরা— আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এদের নিয়ে আসার দরকার আছে।’
রামদেবের বক্তব্য রাখার পালা এলে মঞ্চে বসে থাকা বিজেপির নেতাদের দিকে দরাজ হেসে লেকটার্নের দিকে এগিয়ে গেছেন তিনি। ভারতকে পাল্টে দেয়ার প্রয়াসে মোদি ও শাহকে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। ‘আমার জীবনের প্রথম ৫০টি বছর সংগ্রাম হয়ে থাকলে’ বলেন তিনি, ‘আগামী ৫০ বছর আমি আমার সময় ও শক্তি দেশের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় উৎসর্গ করলাম, যাতে বেদের মহাজ্ঞান আমাদের দেশে নিয়ে আসতে পারি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এ দেশে লর্ড ম্যাকলের দেয়া শিক্ষানীতির বদলে একটি ভারতীয় শিক্ষানীতি দেখব।’ মঞ্চ থেকে নামার আগে আরো একবার ‘আমার মাতৃভূমি ভারত মহান’ স্লোগান ছেড়ে বাতাসে মুঠি ছুড়ে দিয়েছেন। জনতা হুঙ্কার দিয়ে উঠেছে।
[রবার্ট এফ ওয়ার্থ ২০১১ সালের আরব বসন্তসংক্রান্ত গ্রন্থ ‘আ রেজ ফর অর্ডার’-এর লেখক, বইটি ২০১৭ সালের লায়নেল গেলবার প্রাইজ লাভ করে।]





