উইলিয়াম কেনেডি । অনুবাদ লুনা রুশদী
[সাক্ষাৎকারটি ‘দি আটলান্টিক’ পত্রিকায় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়]
(গত সংখ্যার পর)
ভেনিজুয়েলায় থাকার সময়টায় একজন সাহিত্যিক হিসেবে গার্সিয়ার কর্মজীবন বেশ নিশ্চল থাকলেও তার সাংবাদিক জীবন অদ্ভুত মোড় নিয়েছিল। তিনি মোমেন্তোর কাজটা ছেড়ে দিয়ে ভেনিজুয়েলা গ্রাফিকা নামের একটি পত্রিকায় চাকরি নিলেন, কারাকাসে এ পত্রিকার সর্বজনীন নাম ছিল ভেনিজুয়েলা-পর্নোগ্রাফিকা। রাশভারী সাহিত্যিকরা হয়তো এ রকম কাজ থেকে দূরে থাকবেন, তবে গার্সিয়া কাজটা নিয়েছিলেন এবং এখনো এ সম্পর্কে তার কোনো দ্বিধা নেই।
‘ব্যক্তিগত জীবন আমাকে টানে’, তিনি বললেন। তারপর জানালেন, এখন বার্সেলোনায় বসে তিনি জ্যাকি কেনেডির শোফারের জীবনী পড়ছেন— ‘আমি পত্রপত্রিকার গুজবগুলো পড়ি আর সব বিশ্বাস করি।’
কিউবার বিপ্লবের সময় প্রথমবারের মতন সাংবাদিকতার গোলকধাঁধা ও মজার জীবন ছেড়ে তিনি ওকালতি শুরু করলেন। প্রেসনা-লাতিনার জন্য বোগোতায় অফিস খুললেন, পরবর্তীতে হাভানায় বদলি হয়েছিলেন এবং ১৯৬১ সালে নিউইয়র্কে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। সে বছরের মাঝামাঝির দিকে মার্ক্সবাদী শোধনের জোয়ারের সময় তার হতাশাগ্রস্ত কর্মকর্তার সঙ্গে সংহতি জানিয়ে চাকরিটা তিনি ছেড়ে দেন। তার স্ত্রী মারসেদিস বারানকিলার মেয়ে, ১৯৫৮ সালে তাদের বিয়ের আগের তিন বছর তিনি অপেক্ষা করেছিলেন গার্সিয়ার জন্য। চাকরি ছাড়ার পর স্ত্রী এবং তাদের দুই বছরের ছেলে রদরিগোকে সঙ্গে করে নিউইয়র্ক ছাড়লেন। তবে সে শহরের স্মৃতি রইল তার সঙ্গে।
‘নিউইয়র্ক ছিল একদম আলাদা’, বলেন তিনি— ‘পচে যাচ্ছিল আবার নবজন্ম হচ্ছিল, জঙ্গলের মতন। আমাকে ঘিরে ধরেছিল একদম।’
গার্সিয়া পরিবার নিয়ে গ্রে হাউন্ড বাসে চড়ে পথে ফকনার কাউন্টি পার হয়ে নিউ অরলিন্স গেলেন। একটা সাইনবোর্ড দেখলেন, তাতে বড় করে লেখা— ‘কুকুর ও মেক্সিকানদের প্রবেশ নিষেধ’। তাকে দেখে মেক্সিকান মনে হওয়ায় অনেক হোটেলেই ঢুকতে দেয়া হয়নি। তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন কলোম্বিয়াতে ফিরবেন কিন্তু চলচ্চিত্রের রাজধানী মেক্সিকো হাতছানি দিয়ে ডাকছিল, সেখানকার কিছু বন্ধুও খুব করে বলছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা বদল করে, অনেক রকম সমস্যা পার করে ধীরে ধীরে চিত্রনাট্যকার হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। মেক্সিকোয় থাকাকালে তিনি একটা ছোটগল্প লিখেই কয়েক বছরের জন্য চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।
চিত্রনাট্যকার হিসেবে তার কাজটাও নীরবতার একটা কারণ। এছাড়া তিনি নিজেকে সাহিত্যিক হিসেবে বিফল ভাবতে শুরু করেছিলেন। কিছু চিত্রনাট্য লিখেছেন মেক্সিকান ঔপন্যাসিক কার্লোস ফুয়েন্তেসের সঙ্গে যৌথভাবে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটির চলচ্চিত্রায়ণও হয়েছে, এখন সেগুলোর কথা স্মরণ করা হয় শুধু গার্সিয়ার সম্পৃক্ততার কারণেই। মাঝে মাঝে কাজ কম থাকলে সম্পাদনার কাজও করতেন। একটা সময়ে মেক্সিকো শহরে জে. ওয়াল্টার টম্পসনের জন্য কিছু প্রচারের কাজও করেছেন।
‘আমার জন্য খুব বিশ্রী সময় ছিল সেটা’, বলেন গার্সিয়া— ‘দমবন্ধ সময়। চলচ্চিত্রে কোনো কাজই একদম নিজস্ব ছিল না। সবই ছিল যৌথ কাজ, সবার ভাবনা মিলিয়ে— পরিচালকের, অভিনেতার। আমার কাজের পরিসর ছিল সীমাবদ্ধ, তখনই প্রথম উপলব্ধি করলাম শুধু উপন্যাস লেখার সময়েই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে লেখা যায়।’
তার বন্ধুরা সে সময়টার কথা স্মরণ করে বলেন, সে সময় একটা বদ্ধ সময় কেটেছে গার্সিয়ার, তীব্র আত্মসমালোচনা করতেন আর নিজের সব কাজ নিয়েও ছিল ভীষণ অসন্তোষ।
১৯৬৫-এর জানুয়ারিতে মেক্সিকো থেকে আকাপুলকো যাওয়ার পথে তার কল্পনায় আসে একশ বছরের নির্জনতা উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়। পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার এক লেখককে বলেছিলেন, সে সময় যদি তার হাতের কাছে একটা রেকর্ডার থাকত তাহলে সে মুহূর্তেই সম্পূর্ণ পরিচ্ছদটা ধারণ করে ফেলতে পারতেন। বাড়ি গিয়ে মারসেদিসকে বললেন, ‘আমাকে জ্বালাতন করো না, বিশেষ করে টাকা-পয়সার ব্যাপারে।’ তারপর মেক্সিকো শহরে কাল-দে-লা-লোমার ৬ নম্বর বাড়িতে রাখা তার টেবিলে (তার ভাষায় মাফিয়ার গুহা) বসে গেলেন লিখতে। ১৮ মাস ধরে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা করে লিখে উপন্যাসটা শেষ করলেন।
“এর মধ্যে আমার বউ কীভাবে সংসার টেনেছে, আমার কোনো ধারণাই ছিল না। কোনো প্রশ্নও করতাম না তাকে। তবে সবসময় হুইস্কি থাকত বাড়িতে। ভালো স্কচ। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আমার জীবনযাপনে খুব বেশি হেরফের হয়নি। আমাদের চলাফেরার মধ্যে গরিবি ছিল না। তবে লেখাটা যখন শেষ হলো, বউ বলল, ‘আসলেই শেষ করেছ লেখা? আমাদের ১২ হাজার ডলার দেনা হয়েছে।’ দেড় বছর ধরে সে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে সংসার চালিয়েছে।”
গার্সিয়া আরো জানালেন, পাড়ার কসাইয়ের দোকানে তার স্ত্রী বেশ ভালো খদ্দের ছিলেন। ওরা তাই প্রস্তাব করেছিল, প্রতিদিন টাকা শোধ করতে সমস্যা হলে মাসে মাসে দিতে। প্রথমে সে প্রস্তাব খারিজ করলেও পরে যখন প্রতিদিন টাকা জোগাড় করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছিল তখন ওদের কথা মেনে নিয়ে মাসিক কিস্তিতে দাম শোধ করেছেন। আবার আরেক সময় বাড়ি ভাড়া দেয়ার মতন টাকা ছিল না। বাড়িওয়ালাকে যখন বললেন ছয় মাস ভাড়া দিতে পারবেন না, বাড়িওয়ালা আপত্তি করেননি। আশপাশের মানুষ সহানুভূতিশীল থাকায় খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি তাদের।
‘মারসেদিস সত্যিই বিস্ময়কর এক মানুষ’, গার্সিয়া বলে ওঠেন।
রাম্বলাসের সেই বারে বসে প্রায় ২ ঘণ্টা আলাপ করার পর গার্সিয়াকে উঠতে হলো অন্য আরেকটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট রক্ষার জন্য। তবে বলে গেলেন, আমরা ৫টার দিকে তার বাড়িতে গেলে বাকি কথা সেখানেই হতে পারে। তা-ই করলাম আমরা।
গার্সিয়া আর মারসেদিস দুজনেই অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের। মারসেদিস তন্বী, সুন্দরী, তাকে দেখলে শান্তি লাগে, কাঁধ পর্যন্ত নেমে যাওয়া কালো চুলের মাঝখানে সিঁথি আর চেহারার ইন্ডিয়ান বৈশিষ্ট্য পল গঁগ্যার আঁকা তাহিতির নারীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। খুব নরম স্বরে কথা বলেন তিনি, জানালেন স্পেনের লোকেরা বলে তার স্প্যানিশ বলার ধরণটা মিষ্টি, কাস্তিলিয়ানদের ভাষার মতন বেসুরো নয় মোটেই। এখন তার ঘরের কাজ করে দেয়ার জন্য একজন পরিচারিকা আছেন, ব্যাপারটা লক্ষণীয়ভাবে গার্সিয়ার একশ বছরের নির্জনতা লেখার সময় থেকে একদম আলাদা। বললেন, তখন তিনি যতটা সম্ভব তাদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার কথা না ভেবে থাকতে চাইতেন, কারণ এ নিয়ে চিন্তা করতে গেলেই খুব দিশাহারা হয়ে পড়তেন।
‘সে রকম সময় আর কোনো দিন দেখতে চাই না’— বলেন মারসেদিস।
সে রকম আবার হওয়ার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ।
গার্সিয়াদের বাড়িটার আসবাব আধুনিক, সারা ঘরে কার্পেট, জানালায় পর্দা, দেয়ালের রঙ ধূসর, খয়েরি আর কমলা। হাই-ফাই সিস্টেমটা ঘরের দর্শনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ আসবাবের মধ্যে একটা, গার্সিয়ারও খুব শখের জিনিস, তিনি ছাড়া আর কেউ সেটা চালায় না। দেখলাম প্রতিটা রেকর্ডের প্রতি তার আলতো যত্ন, একটা রেকর্ড বাজানোর পরেই কাপড় দিয়ে মুছে রাখছেন। তার দুই ছেলে, ১২ বছরের রদরিগো আর ১০ বছরের গনজালো। দুজনেরই নিজস্ব গ্রামোফোন রয়েছে, যাতে বাবাকে বিরক্ত করতে না হয়।
সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত লেখেন গার্সিয়া। দিনে এক পৃষ্ঠা লেখা হয় সাধারণত, ২৪ লাইনে এক পৃষ্ঠা, সবচেয়ে বেশি লেখার রেকর্ড হচ্ছে একদিনে পাঁচ পৃষ্ঠা। দিনের দ্বিতীয় ভাগে গান শুনতে শুনতে পড়তে পছন্দ করেন। এসব রেকর্ড ছাড়াও উত্তর আমেরিকার মেহমানদের জন্য আছে লিওনার্ড কোহেন, সোফার পাশের তাকটায় বেশ বড় গোছালো সংগ্রহ রয়েছে ক্ল্যাসিকাল সংগীতের।
গার্সিয়া বললেন, ‘আমি যেখানে বড় হয়েছি সেখানে রেকর্ড পাওয়া যেত না, আর এখন এত কিছু পাওয়া যায় ক্যাসেটে, অবিশ্বাস্য!’
বসার ঘরের বইয়ের তাকে রাখা বেশকিছু বই দেখতে দেখতে তার সাহিত্যিক পছন্দের প্রসঙ্গ এল।
মারসেদিস বললেন, ‘ওর বেশির ভাগ বই তো বার্সেলোনায় চলে আসার সময় কলোম্বিয়াতেই ফেলে এসেছে। তবে কনরাড, প্লুতার্ক আর কাফকা সবসময় সঙ্গেই থাকে। আর নতুন জায়গায় যাওয়ার পরে ভার্জিনিয়া উলফ কেনে যদি খুঁজে পায়।’
বইয়ের তাকে এসবই ছিল। এছাড়া ছিল স্তেফান জুয়িগ আর এ. জে. ক্রনিনের সমগ্র, ১৪ খণ্ড বোর্হেস। অবাক হলাম ফ্রেডরিখ ফরসাইথের লেখা ‘এ ডে অব দ্য জ্যাকেল’ দেখে। বাহ! তাহলে বেস্ট সেলারের দেখাও মিলল এখানে!
‘সাহিত্যিক বিচারে’, বইটা সম্পর্কে বলেন গার্সিয়া, ‘এর কোনো দাম নেই। তবে অনেক রকম ঘটনা ঘটতে থাকে। সাজানো সাংবাদিকতা হিসেবে ভালো।’
আচমকা জানতে চাইলেন, ‘গ্রাহাম গ্রিন সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?’ এমনভাবে করলেন প্রশ্নটা যে বুঝতে পারলাম আমার জবাবের ওপর নির্ভর করছে আমার সম্পর্কে তার ধারণা কী হবে। বললাম, গ্রিনকে আমার খুব উঁচুদরের লেখক মনে হয়।
‘তার লেখা থেকে লিখতে শেখা যায়’— মন্তব্য করেন গার্সিয়া। ‘বর্ণনাশৈলী অনবদ্য। গরম দেশগুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছি আমরা তার বই দ্য পাওয়ার অ্যান্ড দ্য গ্লোরি, দ্য কমেডিয়ানস, এ বার্ন্ট আউট কেস ইত্যাদি থেকে। সব বইয়ের পটভূমিতেই আফ্রিকা অথচ লাতিন আমেরিকার সঙ্গে মিল পাই। মানুষ ভাবে গরমের দেশে জীবন হয় উচ্ছ্বসিত, হাসিখুশি, সমৃদ্ধ। কিন্তু গ্রিন দেখান এর উপাদান— গরম, গাছপালা, বৃষ্টি, পশুপাখি আর সমুদ্র। আর দেখান জীবন হলো গরিব এবং দুঃখী। আর সেখানে এ রকমই তো সত্যি।’
গ্রিনের কথা বলতে বলতে গার্সিয়া নিজের একটা পর্যবেক্ষণের কথাও জানান, ‘বুদ্ধিজীবীরা গ্রিনকে পছন্দ করতে চান, অথচ মনে করেন সেটা উচিত কাজ হবে না। তিনি এ শর্ট অব লাইফের মতো ভালো একটা বই লেখার পরপরই তাদের বিভ্রান্ত করে ট্রাভেলস উইথ মাই আন্টের মতো বই লিখে ফেলেন। দুনিয়ায় বুদ্ধিজীবীর মতো খারাপ কিছু নেই। তিনি নিজেই একেকটা ধারণা বানান, তারপর সেই বানোয়াট জিনিসে বিশ্বাস করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন উপন্যাসের মৃত্যু হয়েছে, তারপর একটা উপন্যাস খুঁজে পেয়ে বলেন, সেই বই তার উদ্ঘাটিত। আপনি যদি বলেন, উপন্যাসের মৃত্যু হয়েছে, তাহলে আসলে মৃত্যুটা তো হয়েছে আপনার।’
রে ব্র্যাডবিউরিকেও তার পছন্দ, ‘রে ব্র্যাডবিউরির মধ্যে দুজন রয়েছেন। একজন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখেন, আরেকজন মানুষ। কল্পকাহিনীর লেখককে আমার পছন্দ না।’
তিনি বললেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘হারানো প্রজন্ম’ অর্থাৎ ফকনার, ডস-পাসোস, আরস্কিন কাল্ডওয়েল ও হেমিংওয়ের ছোটগল্পগুলো বাদে সে রকম অসাধারণ কোনো লেখকের লেখা পড়েননি। হেমিংওয়ের উপন্যাসগুলো গার্সিয়ার পছন্দ নয়। ‘দ্য সান অলসো রাইসেস আসলে একটা প্রলম্বিত ছোটগল্প।’ ফকনারের কাজের মধ্যে আবসালোম, আবসালোম! তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। তারপর কিছুটা মজা করার ভঙ্গিতে বললেন, তার মতে দ্য হ্যামলেট হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ভালো উপন্যাস।
‘কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত বাছবিচার ছাড়াই পড়ে লোকে, পড়ার আনন্দেই। পড়ছি বলেই ভালো লাগে। তারপর ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বেছে বেছে পড়ে, সে সময়টাতেই ভালো বই, ক্ল্যাসিকগুলো খুঁজে খুঁজে পড়া হয়। তারপর বসে অপেক্ষা করতে হয় কবে ভালো গল্পগুলো লেখা হবে, তবে এটা বোঝা যায় যে সবচেয়ে কম পরিচিত, কম খ্যাতনামা লেখকের কাছ থেকেই ভালো লেখাগুলো আসবে।’
সমকালীন লাতিন আমেরিকার লেখকদের মধ্যে দুজন একশ বছরের নির্জনতা উপন্যাসের শুরুর দিনগুলোয় সমর্থন দিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এরা দুজনেই পরিচিত নাম। একজন কার্লোস ফুয়েন্তেস, আরেকজন আর্জেন্টিনার হুলিয়ো কর্তাসার। গার্সিয়া তার উপন্যাসের প্রথম তিন পরিচ্ছদ ফুয়েন্তেসকে পাঠিয়েছিলেন। ফুয়েন্তেস লেখা পড়ে এত প্রভাবিত হয়েছিলেন যে মেক্সিকোর এক পত্রিকায় লিখেছিলেন—
আমি একশ বছরের নির্জনতার প্রথম ৭৫ পৃষ্ঠা মাত্র পড়ে শেষ করেছি। একদম রাজসিক...যেকোনো কল্পিত ইতিহাস আর বাস্তব ইতিহাস যুগপৎ অবস্থান করে, স্বপ্নে যা দেখা হয় এবং দলিলে যা রাখা হয়, তার সঙ্গে মেশে কিংবদন্তি, মিথ্যা, অতিরঞ্জন আর পৌরাণিক গল্প ইত্যাদি...মাকোন্দো এক সর্বজনীন অঞ্চল, গল্পের বুনিয়াদ প্রায় ধর্মগ্রন্থের মতন, এর উত্থান এবং পতন, উদ্ভব এবং তার নিয়তি, মানুষের সময় আর তার স্বপ্ন ও কামনাগুলো যাদের কারণে হয়, সে রক্ষা পায় নয়তো বিলীন হয়ে যায়— এ সবকিছুই বলা হয়েছে গল্পের মধ্যে।
উপন্যাসটা লেখা শেষ হওয়ার পরে প্রথম পাঠকদের একজন ছিলেন কর্তাসার। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন বইটা সম্পর্কে। তিনি বলেছিলেন, গার্সিয়ার কল্পনাশক্তি দক্ষিণ আমেরিকান উপন্যাসগুলোকে একঘেয়েমির হাত থেকে উদ্ধার করেছে। কর্তাসারের বই হপস্কচের ইংরেজি অনুবাদ করে বইটার অনুবাদক গ্রেগরি রাবাসা ১৯৬৭ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। গার্সিয়া তার কর্নেলের কাছে কেউ লেখে না উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে নিরাশ ছিলেন। রাবাসার অনূদিত হপস্কচ পড়ার পর নিজের প্রকাশকের কাছে অনুবাদক হিসেবে তাকেই চেয়েছিলেন একশ বছরের নির্জনতার অনুবাদের জন্য। রাবাসা সে সময়ে নিউইয়র্কের কুইন্স কলেজে অধ্যাপনা করতেন। প্রকাশক খোঁজ নিয়ে জানলেন, এক বছরের জন্য অন্য কাজে ব্যস্ত থাকবেন তিনি।
গার্সিয়া বলেছিলেন, ‘আমি অপেক্ষা করব।’ যে পাঠকরা ইংরেজি অনুবাদের সুর ধরতে পারেন, তারা নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞ হবেন তার এ সিদ্ধান্তের জন্য।





