সমর সেন অনূদিত

১.

অন্তরে দুর্বহ বোঝা

অন্তঃবৃৃষ্টি কিন্তু স্বচ্ছ হলো

অস্পষ্ট আমার বাসনা

অবশেষে মূর্ত হলো তোমাতে।

জীবনের বন্ধুর কণ্টকিত পথে

যা পারিনি আনতে হাতের মুঠোয়

তা এল অযাচিত আমার কাছে

তোমার মদির দৃষ্টিতে

 

২.

মনের উদ্যমের মতো মহান শক্তিকে,

পৃথিবীর মতো যা অনন্ত

তাকে কী করে রূপ দেবে শুধু শব্দ,

ধোঁয়ার মতো বঙ্কিম রেখায় ভেসে চলা এই শব্দ?

 

৩.

হূদয়কে যা জাপেট ধরে কঠিন শক্তিতে

ধীরে সুস্থে তার মোকাবেলা পারব না কখনো,

অস্থির অশেষ যাত্রায়

এগিয়ে যেতে হবে দ্বন্দ্বে পথ করে।

যা কিছু অনবদ্য, যা কিছু সুন্দর

আমার জীবনে আনব

ভেদ করব বিজ্ঞানের জগৎ

শিল্প ও সংগীতের রসে হব মুখর।

 

৪.

সাধ্য সীমার পরোয়া না করে চল,

সংঘাত থেকে হটা কখনো নয়

ইচ্ছাশক্তিবর্জিত স্থবিরের মতো

বেঁচে থাকা কখনো নয়।

 

যন্ত্রণা আর খাটুনির জোয়ালে

শান্তভাবে কাঁধ গলানো? ধিক!

যা হবার হোক, আমাদের আছে

আশা, আকাঙ্ক্ষা, কর্ম ও প্রয়াস।

 

উপরোক্ত কবিতাগুলো পাওয়া গেছে Karl Marx: His Life and Work, John Spargo (New York, 1909) গ্রন্থটির মধ্যে (দ্র. পৃ ৪২-৪৪)। ইংরেজি অনুবাদের সহায়তায় এগুলো অনূদিত হয়েছে।

 

ভারতবর্ষে তেমন পরিচিত না হলেও ১৯২০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপ জানত মার্কস কবিতা লিখেছেন এবং সেই কবিতার সংখ্যা দুটি। বার্লিনে Athenaum পত্রিকায় (জানুয়ারি ২৩, ১৮৪১) কবিতা দুটি Der Spielmann (The Minstrel) ও Nachtliebe (Night Love) প্রকাশিত হয়েছিল। এবং মার্কসের জীবিতকালে সেই প্রথম ও সেই শেষ কবিতাপ্রকাশ। ১৮৪১ সালে কবিতা দুটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন মার্কসের বয়স ২৩ এবং তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন।

মার্কসের প্রায় সব জীবনীকারই তার তরুণ বয়সের সাহিত্যরুচি ও কাব্য রচনার বিশেষ উল্লেখ করেছেন। কবিতা ছাড়াও তার উপন্যাস, নাটক ও ব্যালাড রচনার কথাও পাওয়া যায়। মার্কসের শ্রেষ্ঠ জীবনীকারক ফ্রান্ত্স মেহইরং এসব নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। আর তা করার কথাও নয়। কারণ এসব কবিতার সাহিত্যমূল্য সামান্যই, কিছুটা জীবনীগত তাত্পর্যই লক্ষ করা যেতে পারে। ১৮৪৪-এ রচিত বিখ্যাত ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশের (১৯৩২, ইংরাজি অনুবাদ ১৯৫৯) সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী মার্কস তাত্ত্বিকদের দৃষ্টি তরুণ মার্কসের রচনাবলির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। শুধু তার অর্থনৈতিক, দার্শনিক বা রাজনৈতিক রচনার প্রতিই নয়, তার যাবতীয় তরুণ রচনার প্রতি। স্বভাবতই মার্কসের সাহিত্যচর্চাও অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

মার্কস সারা জীবন কাব্যপ্রেমিক, সাহিত্যরসিক ছিলেন। তার আশ্চর্য স্মৃতিশক্তিতে স্মরণ রাখতে পেরেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ অবদানগুলো। আপন পরিণত রচনাবলির অনন্য রচনাগুণ ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে যথেচ্ছ সাহিত্যগত উদাহরণ প্রয়োগের আত্মবিশ্বাসে, দান্তে-শেকসপিয়ার-গ্যেটে থেকে নিরবচ্ছিন্ন উচ্চারণের ক্ষমতায় তার প্রমাণ স্পষ্ট। এই মানসিক গঠনের নেপথ্যে আছে বালক বয়সের কবিতাপ্রেম, লুডভিক ফন ভেস্টফলেলেনর সাহচর্য, পিতা হাইনরিখের উৎসাহ ও প্রেয়সী জেনির প্রেরণা।

তার এ সময়ের যাবতীয় কবিতা দুখানি খাতায় সুন্দর হস্তাক্ষরে সংকলিত করে তিনি জেনিকে উপহার দিয়েছিলেন (গ্রীষ্মাবকাশ, ১৮৩৬)। সারা জীবন জেনি সেগুলো রক্ষা করেছিলেন সযত্নে এবং কাউকে দেখতে দেননি (দ্র. পল লাফার্গের স্মৃতিকথা)। এই কবিতাগুলো যখন জেনিকে কার্ল উপহার দেন, তখন তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র (১৮৩৫-৩৬)- অর্থাৎ তার বয়স ১৭/১৮। বন-এ একটি নিয়মিত কবিতাপাঠের আসরে (Poet’s Club) তিনি এ সময়ে ছিলেন একজন উৎসাহী সদস্য। পিতা হাইনরিখ একাধিক চিঠিতে এ ব্যাপারে মার্কসকে উৎসাহিতই করে গেছেন। কিন্তু কার্ল যখন কবিতাগুলো প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, পিতা তাকে আরো অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। একটি চিঠিতে লেখেন, ‘প্রত্যেক কবি বা লেখককে এ যুগে বিবেচনা করতে হবে যে তিনি জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার যোগ্য রচনাশক্তির অধিকারী হয়েছেন কিনা... আমি স্পষ্টই তোমায় বলতে চাই যে তোমার প্রতিভায় আমি আনন্দিত... কিন্তু একজন সাধারণ গৌণ কবির ভূমিকায় জনসমক্ষে তুমি অবতীর্ণ হবে, এ ব্যাপারটা আমার কাছে খুব যন্ত্রণাদায়ক হয়ে দেখা দেবে। কেবল একজন সত্যিকার উল্লেখযোগ্য কবিরই অধিকার আছে বর্তমান কঠিন পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার।’

কিন্তু কবিতায় মায়া সহজে কাটেনি। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রেকর্ডে’ও দেখা যায় আইনপাঠের চেয়ে নন্দনতাত্ত্বিক সমস্যায় তিনি অধিক চিন্তিত ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য, গ্রিক শিল্প ও পুরাণ সম্পর্কে এবং নিয়মিত শ্লেগেলের কাছে অধ্যয়নরত। হাইনরিখ চিন্তিত হয়ে উঠলেন ও কার্লকে বন থেকে বার্লিন যাওয়ার নির্দেশ পাঠালেন। বার্লিনে এসে তার বিষণ্ন ও অধৈর্য হূদয় থেকে আরেক গুচ্ছ কবিতার জন্ম হলো। শুধু কবিতাই নয়, এই তরুণ ছাত্র অতঃপর একটি উপন্যাস ও একটি ট্র্যাজেডি রচনায় নিজের সাহিত্যিক সম্ভাবনার পরীক্ষায় নামলেন। বার্লিন থেকে পিতাকে লেখা এক দীর্ঘ চিঠিতে (১০ নভেম্বর ১৮৩৭) মার্কস তার এ-সময়ের মনোভাব প্রকাশ করেছেন, ‘জীবনে এমন এক-একটা সময় আসে, যা একটি পর্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা ও নতুন একটি পথের নিশ্চিত নির্দেশক সীমান্ত-প্রাচীরের মতো অবস্থান করতে থাকে। এ রকম সন্ধিকালে আমরা আমাদের ভাবনার ঈগলচক্ষুতে আমাদের অতীত ও বর্তমানকে পর্যালোচনা করি এবং আমাদের সত্যিকার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হতে পারি। ...এসব সময়ের মানুষ ‘লিরিক্যাল’ হয়ে ওঠে, কারণ প্রতিটি রূপান্তরই কিছুটা যেন বিদায়ী সংগীত (swansong), কিছুটা নতুন বিরাট এক কাব্যের মুখবন্ধ (overture)... বার্লিনের পথে যখন চলেছি... আমার সব হূদয়-মন গাঢ় বেদনায় আচ্ছন্ন, যেসব পাহাড় চোখে পড়ল, তার পাথরও বেশি কঠিন মনে হলো না আমার অনুভূতির চেয়ে, বড় বড় সব শহরকে আদৌ প্রাণময় মনে হলো না আমার রক্তের চেয়ে, সরাইখানার কলগুঞ্জনমুখরিত টেবিলগুলো বেশি ভারাক্রান্তা মনে হলো না আমার নিজের কল্পনার চেয়ে এবং সব থেকে বলার কথা, কোনো শিল্পকর্মই আমার জেনির চেয়ে বেশি সুন্দর মনে হয় না। যখন বার্লিন পৌঁছলাম কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখলাম না, নিজেকে জ্ঞান ও শিল্পের মধ্যে নিমজ্জিত রাখতে চেষ্টা করলাম। আমার এ সময়ের মনোভাব থেকে একমাত্র গীতিকবিতাকেই আকর্ষণীয় মনে হয়। ...আরো দূরবর্তী আমার ভালোবাসাই হয়ে উঠল আমার স্বর্গ, আমার শিল্প। প্রতিটি বাস্তব হয়ে উঠল অস্পষ্ট ও সব অস্পষ্টতা তার সীমানা হারিয়ে বসল। ...’ (Otto Riihle-র মার্কস-জীবনী থেকে উদ্ধৃত)।

মার্কসের ছাত্রজীবন নানা মানসিক দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে এ সময়ে পার হচ্ছিল। এ অবস্থায় রচিত সাহিত্য তাই কোনো পরিপূর্ণতা লাভে বঞ্চিত। তার মনোভাবের কিছুটা প্রকাশ ঘটল ব্যঙ্গবিদ্রূপপূর্ণ ‘এপিগ্রাম’ রচনায়, অনেকটা গ্যেটে ও শিলারের Xenien (1797)-এর ঐতিহ্যে-বিশেষত, হেগেলের বিরুদ্ধে রচিত ‘এপিগ্রামে’।

মার্কস যেসব কবিতা লিখেছিলেন, তাতে সেকালের আধুনিকতার ছাপ ছিল না, বরং তার পূর্বসূরি কবিদের ভাবধারাই তাকে প্রভাবিত করেছিল, সম্ভবত ক্ল্যাসিক্যাল কাব্যপ্রীতিই তার কারণ। তার কবিতায় গ্যেটে, শিলার, বার্জার ও হোলটি প্রমুখ কবিদের প্রভাবই বেশি। সমসাময়িকদের মধ্যে একমাত্র হাইনে (১৭৯৭-১৮৫৬) ছিলেন তার প্রিয় কবি ও ব্যক্তিগত জীবনে বিশেষ বন্ধু। কবিতা থেকে মার্কস যখন বিদায় নিয়েছেন, তখনো দীর্ঘকাল পর্যন্ত তিনি হাইনে ও ফ্রেফিগ্রাথ, কে কবিতা বিষয়ে বিচক্ষণ পরামর্শ দিয়েছেন। যারা হাইনের কবিতার সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত (বিশেষত হাইনের The silesian Weauers  এবং Germany - A Winter’s tale-এর সঙ্গে), তারাই তার প্রমাণ দেখতে পেয়েছেন।

১৮৩৭ সালই মার্কসের সাহিত্যচর্চার শেষ বছর। এই বছর একটি উপন্যাস রচনায় (Skorpion and Felix) হাত দেন, কিন্তু শেষ করেন না। বহু উপন্যাস-পাঠের (বিশেষত স্টার্ন, জাঁ পল, হিপপেল ও হোফমান্-এর) অভিজ্ঞতাকে একই উপন্যাসে প্রকাশ করতে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খল কয়েকটি পরিচ্ছেদ রচনা করতে পেরেছিলেন, এর উপনাম দিয়েছিলেন ‘A Humourors Novel’। 

এরপর একটি ট্র্যাজেডি (Oulanem) রচনায় মন দিলেন একই বছরে। পিতা প্রথমে উৎসাহিত হয়ে পরামর্শ দিলেন প্রাশিয়ান সরকারকে খুশি করার মতো প্রাশিয়ান ইতিহাসকে বিষয় করে নাটকটি রচনা করতে, অন্তত নাটকে দেশপ্রেমমূলক একটি ওড্ রাখতে। মার্কস যা লিখতে শুরু করলেন, তাতে প্রাশিয়ান রাষ্ট্র সম্পর্কে কোনোই উৎসাহ প্রকাশ পায়নি। ভবিষ্যদ্বংশীয়দের জন্য সে নাটকের একটি অংকই টিকে আছে। এতে সমসাময়িক ‘গথিক থ্রিলার’-এর প্রচলিত পন্থাই তিনি অনুসরণ করেছিলেন।

ট্র্যাজেডির পরও মার্কস একটি নাট্যসমালোচনার পত্রিকা প্রকাশের কথা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু পিতা অবশেষে জোরালো চিঠি দিলেন, ‘আমি ঈশ্বরের কাছে একটাই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করি যে যেমন করেই হোক তুমি এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, তোমার সত্যিকার লক্ষ্যের দিকে চালিত হও।’ ১৮৭৩-এ মার্কস গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং এর পর থেকেই দর্শনের পথে অগ্রসর হলেন, যে হেগেলকে ব্যঙ্গ করেছিলেন কবিতায়, সেই হেগেলের পথেই। ১৮৩৮-এ পিতা হাইনরিখের মৃত্যুর পর সাহিত্য-পর্ব চূড়ান্তভাবে শেষ হয়ে গেল।

এত দিন পর্যন্ত মার্কস-তাত্ত্বিকদের ধারণা ছিল তার এসব কীর্তি লুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ঘাটটি কবিতা পাওয়া যায় ১৮৪৪-এ রচিত Economic and Philosophical manuscript-এর সঙ্গে। ১৯২৯ সালে কবিতাগুলো প্রকাশিত হয়। পিতা হাইনরিখ মার্কসের এক জন্মদিনে ১৮৩৭ সালে মার্কস একটি নোটবুকে এ লেখাগুলো উপহার হিসেবে পাঠান। নোটবুকে লিখে দিয়েছিলেন, ‘Gediohte / meinem / teueren Vater Zu seinem Geburt-stage1837 / als sohwaches Zeichen ewiger Liebe’-`Poems / for my / dear Father on his Birthday, 1837 / as a poor token of eternal love’|

কিছু কবিতায় মার্কসের তৎকালীন রাজনৈতিক বোধের ছাপ স্পষ্ট। জার্মান বিজ্ঞানবাদ ও হেগেলের বিরুদ্ধে বিদ্রূপের সঙ্গে লেখেন:

[কান্ট ও ফিকেট চেয়েছেন ঘুরবেন ইথরে/ দূরবর্তী কোনো দেশের সন্ধানে/ আর আমি চেয়েছি সম্পূর্ণ বুঝতে/ আমি যা পেয়েছি রাজপথে]। তরুণ সম্ভাব্য কবিদের ওপর হেগেলীয় বিমূর্ত ভাবনার ছাপ সম্পর্কে অন্য একটিতে লেখেন,

[এপিগ্রামের জীবদের ক্ষমা কর/ আমরা যদি অপছন্দের সুর ভাঁজি/ আমরা আমাদের শিক্ষিত করেছি হেগেলে/ আর তার নন্দনতত্ত্ব থেকে নিজেদের এখনো বিশুদ্ধ করতে পারিনি।]

আর দুটিতে হেগেলের মুখে বসান:

[যেহেতু আমি চূড়ান্তকে আবিষ্কার করেছি, চিন্তায় পেয়েছি গভীরতাকে/ ঈশ্বরের মতোই আমি অমার্জিত, আমি তারই মতো লুকাই অন্ধকারে/ দীর্ঘকাল আমি খুঁজেছি, আর চিন্তার উত্তাল সমুদ্রে ভেসেছি/ এবং যখন আমি শব্দকে পেলাম, যা পেয়েছি, তাকেই আঁকড়ে আছি।]

[শব্দ শেখাই আমি দানবীয় বিভ্রমে,/ যে যা খুশি ভেবে নিতে পারে তার মানে।/ অন্তত সে আর কখনই সীমার বন্ধনে হবে না আবদ্ধ,/ কারণ যেমন এক প্রসারিত সানু হতে নেমে আসে জলধারা ঘোর গর্জনে,/ কবি তার প্রেমিকার কথা আর ভাব করে রচনা,/ দেখে যা সে ভাবে আর ভাবে যা সে অনুভব করে;/ জ্ঞানের সরল সুধা সবাই করে নিতে পারে পান;/ আসলে বলছি সবই তোমাদের কারণ কিছুই তো বলিনি।]

জনতাকে বিদ্রূপ করেন:

[তার আরাম কেদারায় তৃপ্ত বোকা/ জার্মান জনতা বসে আছে বাক্যহীন/ যখন ঝড় দাপাচ্ছে উপরে ও চারপাশে/ যখন আকাশ মেঘে ঘন আর অন্ধকার/ যখন বিদ্যুৎ পাকায় আর হিসিহশায় চারপাশে/ তখন জনতাকে চেতনায় উত্তেজিত করতে পারে না/ কিন্তু যখন সূর্য বেরিয়ে আসে/ যখন মৃদুমন্দ কথা বলে হাওয়া আর ঝড় থামে/ তখন জনতা ওঠে আর আওয়াজ ছাড়ে/ আর একটি গ্রন্থ লেখে: ‘বিপদ-সংকেত কেটে গেছে’।]

শিল্পীদের সম্পর্কে লেখেন:

[আমি কী বাজাচ্ছি, মশায়! ঢেউ কী গর্জন করে/ যখন তারা বজ নাদে ভাঙে পাহাড়ে/ যখন নয়ন অন্ধ হয়, যখন বক্ষ লাফিয়ে ওঠে/ যখন আত্মা গড়িয়ে যায় নরকের দিকে!]

প্রশ্নকর্তা তখন বলে:

[চারণ, তুমি তোমার হূদয় গুঁড়াও বিদ্রূপে/ এবং জ্বলজ্বলে দেবতা যে শিল্প তোমাকে দিয়েছে/ তুমি তাকে বহন করবে এবং শব্দের তরঙ্গে তাকে ঝলমলাবে/ যতক্ষণ না সে ফুলেফুলে উঠবে নক্ষত্রের নৃত্যে।]

কবি ক্রোধে বলছে:

[ওটা কি? আমি বিদ্ধ করব লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়ে আমার তরবারি রক্তে কালো তোমার হূদয়ে/ আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও/ তুমি কি চাও শিশুরা খেলবে তোমার ঘাড়ের চারপাশে?/ ঈশ্বর শিল্প জানে না, ওদিকে নজর দেন না তিনি/ নরকের ধোঁয়া থেকে যে-শিল্প মাথার ভেতর জাগে/ যতক্ষণ না মস্তিষ্ককে ঘাঁটানো হয়, যতক্ষণ না হূদয় রূপান্তরিত হয়/ আমি তা সরাসরি পেয়েছি এবং বাঁচাচ্ছি কৃষ্ণকায় লোকটি থেকে/ যে আমার মুহূর্ত গোনে, যে আমার লেখা লেখে/ মৃত্যুর পদযাত্রাকে বাজাবে উচ্চগ্রামে সুতীব্রভাবে/ বাজাবে অন্ধকার, বাজাবে আলোক/ যতক্ষণ না হূদয় ভাঙবে ধনুকে ও ছিলায়।]

এই আলোচনার বহু তথ্য পাওয়া গেছে পিটার ডেমেট্জ-এর গ্রন্থে (Peter Demetz, Marx, Engels and the Poets, University of Chicago Press, 1967) ও Journal of the History of Ideas, New York, ... এবং এইচপি অ্যাডামেসর গ্রন্থ (H. P. Adams, Karl Marx : In His Earlier Writings, London, 1940) থেকে। আলোচনার অভ্যন্তরে কবিতাগুলো অনুবাদ করে দিয়েছেন সুখময় দাশগুপ্ত। ]

 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও নির্মাল্য আচার্য