অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব
মার্কসকে নিয়ে এক অজ্ঞাতনামা জার্মান গোয়েন্দার প্রতিবেদন। ১৮৫২ সালের শরতে বার্লিনের প্রুশীয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। সে সময় প্রুশীয় সরকার কমিউনিস্টদের ক্যাঙ্গারু কোর্টে (কোলন কমিউনিস্ট ট্রায়াল) বিচার করছিল। এ কমিউনিস্টদের অনেকেই ছিলেন মার্কসের ঘনিষ্ঠ।
দলের (কমিউনিস্ট লীগ) নেতা হচ্ছেন কার্ল মার্কস। তার সিপাহশালার হচ্ছেন ম্যানচেস্টারের এঙ্গেলস। দলে আরো আছে কয়েক হাজার জার্মান শ্রমিক; লন্ডনের ফ্রেইলিগ্রুথ ও ভোল্ফ (লুপুস নামে পরিচিত), প্যারিসের হাইনে, আমেরিকার ভাইডেমায়ার ও ক্লুস, কোলনের বুরগারস ও দানিয়েল এবং হামবুর্গের ভির্থ— এরাও মার্কসের সহযোগী। অন্যরা নিছক পার্টির সদস্য। পার্টির মূল আত্মা হচ্ছেন মার্কস; তিনিই এর নীতিনির্ধারণ করেন। এ কারণে আমি তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। মার্কসের উচ্চতা মাঝারি, বয়স ৩৪ বছর। তবে এ অল্প বয়সেই তার চুলের রঙ ধূসর হয়ে গেছে। তাকে দেখলে বোঝা যায়, তিনি শক্তিশালী মানুষ আর তার শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো আপনাকে ঝেমেয়ারের (হাঙ্গেরির কবি, জাতীয়তাবাদী) কথা মনে করিয়ে দেবে, পার্থক্য শুধু গায়ের রঙে, মার্কস গাত্রবর্ণ গাঢ় এবং চুল ও দাড়ি একটু কালো বর্ণের। মার্কস কখনো দাড়ি কাটতেন না। তার বড় বড় চোখ দুটো অন্তর্ভেদী, আগুন ঝরানো। তাকে প্রথমবার দেখার পর যে কারো অনুভব হবে যে, তিনি একজন প্রতিভাবান এবং প্রাণশক্তিতে ভরপুর। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে মার্কসের শ্রেষ্ঠত্ব তার আশপাশে থাকা মানুষের ওপর এক ধরনের প্রভাব ফেলত, যা কেউ চাইলেই এড়াতে পারত না।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পুরোপুরি অগোছালো, রূঢ় প্রকৃতির। তিনি সত্যিকার একজন বোহেমিয়ান বুদ্ধিজীবীর জীবনযাপন করেন। গোসল করা, দাড়ি কাটা ও কাপড় বদলানোর কাজ তিনি করেন কালেভাদ্রে। তিনি মদ পান করতে ভালোবাসেন। মাঝে মাঝে তিনি বেকার সময় কাটান, কিন্তু কাজ থাকলে দিন-রাত অক্লান্তভাবে পাগলের মতো কাজ করেন। ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে জেগে ওঠার জন্য তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। মাঝে মাঝে তিনি সারা রাত জেগে থাকেন এবং সকালে সব কাপড় পরেই সোফায় ঘুমিয়ে যান, সারা দিন ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় উঠেন। দুনিয়ার মানুষের শত কর্মব্যস্ততায় তার এভাবে দিনের ঘুমে কোনো সমস্যা হয় না। তার স্ত্রী ছিলেন প্রুশিয়ার মন্ত্রী ফন ভেস্টফালেনের বোন; একজন সংস্কৃতিমনা ও আকর্ষণীয় নারী। স্বামীর প্রতি প্রেমের কারণে তিনি মার্কসের বোহেমিয়ান আচরণের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। ঘরে দারুণ দারিদ্র্যের সঙ্গেও তিনি মানিয়ে নিয়েছেন। তার দুই কন্যা ও এক পুত্র এবং এ সন্তানদের সবাই দারুণ সুদর্শন।
ছন্নছাড়া ও অস্থির প্রকৃতি সত্ত্বেও স্বামী ও পিতা হিসেবে মার্কস ছিলেন একেবারে নম্র-ভদ্র মানুষ। মার্কস বাস করেন লন্ডনের সবচেয়ে সস্তা ও বিশ্রী কোয়ার্টারে। মার্কস থাকেন দুই রুমে। রাস্তাঘেঁষা কক্ষটি লিভিং রুম আর তার ভেতরেরটা শয়নকক্ষ। পুরো অ্যাপার্টমেন্টে পরিচ্ছন্ন একটা আস্ত আসবাব বলে কিছু নেই। ঘরের সবকিছুই ভাঙাচোরা আর সবকিছুর ওপর অন্তত আধ ইঞ্চি ধুলার আস্তরণ। সবখানেই চরম অগোছালো ভাব। লিভিং রুমের মাঝখানে পুরনো ধাঁচের একটা বড় টেবিল রাখা। এই টেবিলের ওপর একটা টেবিলক্লথ আছে। টেবিলের ওপর তার পাণ্ডুলিপি, বই ও সংবাদপত্র ছড়ানো থাকে। এ টেবিলের ওপরই সন্তানদের খেলনা, কাপড় ও তার স্ত্রীর সেলাইয়ের টুকরো কাপড়ও থাকে; আরো থাকে হাতলভাঙা কতগুলো কাপ, ছুরি, ফর্ক, বাতি, কালির দানি, গ্লাস, ওলন্দাজ পাইপ, সিগারের ছাই— এ সবকিছুই দেখা যাবে ওই টেবিলে। পুরনো জিনিসে পূর্ণ কোনো বাড়ির সেলারও মার্কসের ঘরের এ ভাঙাচোরা টুকিটাকি জিনিস দেখলে লজ্জা পেয়ে যাবে।
মার্কসের কক্ষে প্রবেশ করলেই কয়লা ও তামাকের ধোঁয়ায় চোখে পানি চলে আসবে, মনে হবে কোনো গুহায় প্রবেশ করেছেন। এরপর ধীরে ধীরে চোখ সয়ে এলে ধোঁয়ার বাইরে ঘরের জিনিসপত্রে নজর পড়তে শুরু করবে। সবকিছুই নোংরা ও ধোঁয়ায় ঢাকা। তাই কোথাও বসে পড়াটা হবে ভয়ানক ব্যাপার। একটা চেয়ারের আছে তিন পা, আরেকটায় চার পা আছে, যেটাতে মার্কসের সন্তানরা রান্না করার খেলাধুলা করে। অতিথি এলে এ চেয়ারটিই দেয়া হতো। তবে এতে বসতে হলে আপনাকে প্যান্টের মায়া ত্যাগ করতে হবে। কারণ চেয়ার থেকে তখনো খেলাধুলার নোংরা সরানো হয়নি। কিন্তু এসব কোনো কিছুই মার্কস বা তার স্ত্রীকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করে না। আপনাকে মার্কসের ঘরে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা হবে এবং তামাক ও পাইপ সাধা হবে। এরপর খুবই প্রাণবন্ত আলোচনা শুরু হবে, যা ঘরের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার ক্ষতিপূরণের মতো। তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলে তাদের ঘরের বিভিন্ন অসুবিধার বিষয়টি সয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর তাদের সঙ্গে আপনি অভ্যস্ত হয়ে যাবেন এবং সেটাকে ভালো লাগতে শুরু করবে। এটা কমিউনিস্টদের প্রধান মার্কসের পারিবারিক জীবনের সত্যিকার চিত্র। এবার আমি তাকে রাজনৈতিক ও ষড়যন্ত্রকারীদের নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।
কোনো একটি ঘটনার প্রধান ও নেতা হিসেবে মার্কস নিঃসন্দেহে মাজ্জিনির পরে সবচেয়ে যোগ্য ও সঠিক মানুষ। কিন্তু চক্রান্তের ব্যাপার এলে সেক্ষেত্রে মার্কস ছোট রোমানদের মতো। মার্কস অতিশয় ধূর্ত, নিপুণ ও স্বল্পভাষী মানুষ। তার মনের নাগাল পাওয়াটা কঠিন। অন্যদিকে তিনি কাউকে একবার বিশ্বাস করলে তার জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়ে যাবেন, তার সমর্থনে সবকিছু করবেন। কোনো মানুষকে ভালোভাবে চেনার পর তার মধ্যে মার্কস কোনো দোষ দেখতে প্রস্তুত নন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মার্কস প্রতিশোধপরায়ণ ও নির্দয়। প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার আগ পর্যন্ত তিনি শান্তি পান না। তার মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সীমাহীন লক্ষ্য ও ক্ষমতার ক্ষুধা। তার কমিউনিস্ট সমতার কর্মসূচি থাকলেও নিজের দলে তিনি একনায়ক। এটা ঠিক যে, পার্টির সব কাজ নিজে একা করেন, কিন্তু এরপর সব নির্দেশও তিনি একাই দিয়ে থাকেন। এখানে তিনি কোনো প্রতিপক্ষ সহ্য করেন না। তবে মার্কসের এ আচরণ পার্টির গোপন অংশের কাজের ক্ষেত্রে; বিপরীতক্রমে পার্টির প্রকাশ্য সভাগুলোয় তিনি সবচেয়ে উদার মানুষ ও জনপ্রিয়।
সূত্র: প্রুশিয়ান স্পাই, ডেভিড ম্যাকলিলান সম্পাদিত কার্ল মার্কস: ইন্টারভিউজ অ্যান্ড রিকালেকশন গ্রন্থ থেকে





