১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বহিরাগত সাম্রাজ্য বিস্তারকারী সশস্ত্র বাহিনীর নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে মোগল শাসনের সূচনা। এ মোগল সাম্রাজ্যের বিকাশে ও স্থিতিশীলতা আনয়নে এমনকি ধ্বংসেও অন্তরালের নারীদের নাম কমই উচ্চারিত হয়ে থাকে।

মোগল যুগে ভারতবর্ষের নারী ঘোরতর অন্ধকারে শিক্ষাদীক্ষাহীন এমনকি যিকঞ্চিত ক্ষমতাহীন ছিল বলে যেসব প্রচলিত ধারণা ভারতবর্ষের সামাজিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ব্রাহ্মণরা ছড়িয়েছেন, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি গ্রন্থ লিখেছেন ‘মোগল যুগে স্ত্রী শিক্ষা’। এ বইতে তিনি অসামান্য অধ্যয়ন-স্পৃহাসম্পন্ন ক’জন মোগল নারী এবং অন্তরালে থেকেও বিপুল ক্ষমতার অধিকারী ক’জন নারীর জীবনী তুলে ধরেছেন। নারীর শিক্ষা বিস্তার এবং এ কালে যাকে বলা হয় নারীর ক্ষমতায়ন, তারও কিছুটা ঘটেছে সম্রাট আকবরের শাসনামলে। শুধু মোগল আমল নয়, ভারতবর্ষের সব শাসকের মধ্যে কাউকে যদি ফেমিনিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করতে হয়, তিনি হবেন আকবর।

আকবরের রাজত্বে প্রাথমিকভাবে মূলত সম্রাটের প্রশ্রয়েই যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন মাহাম আঙ্গা। এ ক্ষমতা তাকে উচ্চবিলাসী করে তুলেছিল। এতটাই উচ্চবিলাসী যে তার দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির পথে যাকে বাধা মনে করেছে, সম্রাটকে দিয়েই তাকে অপসারণ করিয়েছেন এবং এক সময় সম্রাটকেই অপসারণ করার পদক্ষেপে সম্মতি দিয়েছেন। আকবরের সিংহাসনে অভিষিক্ত হবেন তার পুত্র আদম। তিনি রাজমাতা হয়ে শাসন করবেন। যেমন কিছুটা করেছেন আকবরের কৈশোরে।

জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ আকবরের জন্ম ১৫৪২ সালে বর্তমান পাকিস্তানের অমরকোট নামক স্থানে। কেন দিল্লির রাজপ্রাসাদে নয় এ প্রশ্ন আসতেই পারে। কারণ পিতাই তো সম্রাট হুমায়ুন। বাবুরের প্রিয় পুত্র। আসলে শের শাহের কাছে চৌসা ও কৌনজের যুদ্ধে পরাজয়ের পর হুমায়ুন পলাতক জীবনযাপন এবং সাম্রাজ্য উদ্ধারের পরিকল্পনা করছিলেন। সিন্ধুতেই হুমায়ুন তার ছোট ভাই হিন্দাল মির্জার ফার্সি শিক্ষক শেখ আলী আকবর জামির চতুর্দশবর্ষীয়া কন্যা হামিদা বানু বেগমকে বিয়ে করেন। উভয়ে রাজপুতনার হিন্দু রাজার অমরকোট দুর্গে আশ্রিত থাকা অবস্থায় ১৫ অক্টোবর তাদের পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। রাজত্ব উদ্ধারের সংগ্রামে হামিদা বানু বেগম তখন স্বামীর সঙ্গে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঝুঁকিবহুল সফর করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু আকবরের লালনপালনের ভার পড়ে মায়ের দিকের আত্মীয়া তুর্কি বংশোদ্ভূত মাহাম আঙ্গার ওপর। তিনি তার নিজের সন্তানের সঙ্গে সাধ্যমতো সেবা যত্ন করে আকবরকে বড় করতে থাকেন। দুই বছর পর ১৫৪৫ সালে মা-বাবার সঙ্গে শিশুটির সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সাক্ষাৎ হয়। হুমায়ুন ১৫৫০ সালে কাবুল এবং ১৫৫৫ সালে দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। হুমায়ুনের অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর পর ১৫৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আকবর সব দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন তার বয়স ১৩ বছর। রাজকীয় মর্যাদায় মাহাম আঙ্গার তখন রাজপরিবারের সদস্য ও অভিভাবকদের অন্যতম। সিংহাসন অধিকার করলেও তার হয়ে রাজক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার পান বৈরাম খান।

কিন্তু মাহাম আঙ্গা হেরেমের প্রধান হিসেবে কিশোর সম্রাটের সার্বক্ষণিক তদারককারী হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই শাসনকর্মের মৌল বিষয়গুলো রপ্ত করে নেন এবং তা প্রয়োগ করতে থাকেন। তার ব্যক্তিত্ব এতটা প্রবল ছিল যে তার ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করা সহজ ছিল না। তাছাড়া রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ সবাই জানতেন তার ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করলে তা সম্রাটের মাধ্যমে ফরমান হিসেবে জারি হবে।

মাহাম আঙ্গাকে ঘিরে যে ক্ষমতা বলয় সৃষ্টি হয়েছিল, শাসনকর্মে তার ক্ষুব্ধ প্রতিপক্ষরা বলতে শুরু করেন এটা পেটিকোট গভর্নমেন্ট। তিনি প্রতিপক্ষ বৈরাম খানকে ক্ষমতাশূন্য, প্রয়োজনে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করলেন।

গুলবদন বেগম (সম্রাট হুমায়ুনের বোন, আকবরের ফুপু) নিশ্চিত করেছেন মাহাম আঙ্গা আকবরের মা হামিদা বেগমের আত্মীয়। মাহাম আঙ্গার মায়ের নাম মুবারিকা বেগম, তার স্বামী নাদিম খান, তিনি হুমায়ুনের সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন। তাদের চার পুত্র ও এক কন্যা। তারা হচ্ছেন আদম খান, মুস্তাফ খান, শামশেদ খান ও মুনিম খান। তাদের একমাত্র কন্যা আবার হুমায়ুনের তরুণী স্ত্রী, সে হিসেবে আকবরের সৎ মা।

মাসুমা হাসানের মাহাম আঙ্গা: এ মিস্টেরিয়াস ওমেন ক্যারেক্টার ও মাহাম আঙ্গাকে নিয়ে লুবনা ইরফানের দ্য উইমেন হুজ ডাউনফল নেয়ারলি কিল্ড আকবর রচনাটি সংক্ষেপে উপস্থাপন করছি—

ষোড়শ শতকের এক সন্ধ্যায় দিল্লির আকাশে হঠাৎ আতঙ্কের চিত্কারে মুখর হয়ে ওঠে। মাহাম আঙ্গার মাদ্রাসা থেকে চিত্কার আসছে। হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়ার দরগাহ থেকে সম্রাট ফিরছিলেন। এ সময় মাদ্রাসা থেকে একজন আকবরকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়ে। তীর তার কাঁধে বিদ্ধ হয়। আশপাশের পথচারী ও দোকানদাররা নিজেদের ঝুঁকি এড়াতে মাদ্রাসার ভেতর থেকে তীরন্দাজকে খুঁজে বের করে প্রহরীদের কাছে সমর্পণ করে। এ তীরন্দাজ আকবরের বিদ্রোহী সভাসদ মীর্যা শরফুদ্দিনের ক্রীতদাস। সম্রাটের সভাসদরা দ্রুত এর তদন্ত করে আরো কারা জড়িত বের করতে চাইলে সম্রাট তা নাকচ করে দিয়ে তীরন্দাজকে হত্যার হুকুম দেন।

এ ঘটনার সূত্র ধরে কেউ কেউ মাহাম আঙ্গার দিকে ইঙ্গিত করতে চাইলেন। আকবরের হয়ে তিনিই রাজকার্য চালাচ্ছিলেন কিন্তু সম্রাটের পালক মা চাইলেন সেনাপ্রধান বৈরাম খানকে অপসারণ করা হোক। কারণ তিনি থাকলে কমসয়সী সম্রাট তার ক্ষমতা প্রয়োগে দ্বিধান্বিত থাকবেন এবং সত্যিকারের সম্রাট হয়ে উঠতে পারবেন না। মূলত, তার প্ররোচনায় সম্রাট বৈরাম খানকে অপসারণ করতে তিনটি প্রস্তাব দেন। তিনি অবসর গ্রহণ করতে পারেন কিংবা প্রাসাদে থাকতে পারেন কিংবা হজ পালনের উদ্দেশে মক্কানগরীতে চলে যেতে পারেন। তিনি তীর্থ বেছে নেন। এ সময় তার পুরনো শত্রুরা পাঞ্জাব পৌঁছার পর তাকে আক্রমণ করলে তিনি পরাস্ত হন। আকবর তখন আবার তাকে প্রস্তাব দেন। তিনি চাইলে উপদেষ্টা হিসেবে তার সঙ্গে থাকতে পারেন অথবা মক্কা চলে যেতে পারেন। এবারো তিনি তীর্থের পথ বেছে নিলেন।

পানিপথের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় যুদ্ধে বৈরাম খানের বাহিনীর আক্রমণে হিন্দু রাজা হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য ওরফে হিমু পরাজিত ও নিহত হলে প্রবল অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তীর্থপথে হিমুর সমর্থকরা গুজরাটের কাছে বৈরাম খানকে ঘিরে ফেলে এবং হত্যা করে। বৈরাম খানের অপসারণের পর মাহাম আঙ্গার হস্তক্ষেপ আরো বেড়ে যায়। রাজসভাকে ঘিরে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আলোচনায় এ নারীর অবাঞ্চিত অধিকার চর্চা আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক আবদুল কাদির বদায়ুনি মীর আবদুল হাইকে উদ্বৃত করে বলেন, যখন নারী, বালক ও খোজারা দেশ শাসন করে তা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। এখানে নারী মাহাম আঙ্গা, বালক তার পুত্র আদম খান ও খোজা হচ্ছে তাদের বিশ্বস্ত ইতিমাদ খান।

পিতৃশাসিত সমাজ নারীর শাসন এ আধুনিক কালেও প্রত্যাখান করতে চায়, সে সময় প্রতিরোধ ছিল আরো তীব্র। ইতিহাস ক্ষমতাধর নারীকে ভিন্নভাবে দেখেছে এবং যদিও মোগল নারীদের বসন শাড়ি ছিল না, তবু মাহাম আঙ্গার ক্ষমতা বলয়ের ‘সেক্সিস্ট’ বর্ণনা দিয়ে বলেছে পেটিকোট গভর্নমেন্ট।

হালকা অভিযানে নেতৃত্ব দিতে মাহাম আঙ্গার পুত্র আদম খানকে পাঠানো হলে তিনি সেখানে লুটের রাজত্ব কায়েম করেন। তার অপহরণ করা দুজন নারীর বিষয় সম্রাটের কানে আসে। নারীসহ ধরা পড়া এড়াতে আদম তাদের হত্য করে, এতে তার মায়ের সায় ছিল বলে মনে করা হয়।

অন্য একটি বর্ণনায় আদম সম্রাটকে হত্যা করার জন্য তার শয়নকক্ষে প্রবেশ করেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। আকবরের দরবারের অন্যতম উকিল (মন্ত্রী) শামসুদ্দিন মুহাম্মদ আতাগা খানের ওপর মাহাম আঙ্গা ক্ষুব্ধ ছিলেন। আদম সুযোগ বুঝে দেওয়ান-ই-আম-এ কর্মরত গুণী মানুষটিকে হত্যা করে। সম্রাট আকবর ততদিনে মা ও ছেলের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আর সহ্য করতে রাজি নন। সৈন্যদের আদেশ দিলেন তার উপস্থিতিতে আদমকে দুর্গের ওপর থেকে ভূ-পৃষ্ঠে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হউক। প্রথম নিক্ষেপের পর তার হাত-পা ভাঙলেও মৃত্যু না হওয়ায় সম্রাট তাকে পুনরায় তুলে এনে দুর্গের ওপর থেকে নিক্ষেপ করার আদেশ দিলেন। এবার তার মৃত্যু হলো। তিনি নিজে এ ঘটনার বর্ণনা মাহাম আঙ্গাকে দেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে প্রদান করা সব সুবিধাও প্রত্যাহার করে নেয়ার আদেশ দেন। পুত্রের নির্মম মৃত্যুর ৪০তম দিনে আকবরের একদা সবচেয়ে প্রিয় নারী—যার পুত্রবৎ স্নেহে তিনি বেড়ে উঠেছেন—সম্রাটের কাছে খবর পৌঁছল মাহাম আঙ্গার মৃত্যু ঘটেছে।

মাহাম আঙ্গার সঙ্গে কুচক্রী হিসেবে পরিচিত মীর্যা শরফুদ্দিন আজমিরও নাগপুর দখল করে সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। কিন্তু যেহেতু মীর্যা শরফুদ্দিন সম্রাট আকবরের তিন বছরের বড় বোন বকশী বানুর স্বামী এবং বকশী বেগমের প্রথম স্বামী ইব্রাহিম মীর্যার মৃত্যুর পর নিজে পছন্দ করে বড় বোনকে শরফুদ্দিনের কাছে বিয়ে দিয়েছেন, তার ব্যাপারে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারলেন না। কিন্তু তিনিও আকবরকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে এলেন না। কিন্তু আকবরের পুত্র সেলিম, পরবর্তী সম্রাট জাহাঙ্গীর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবেন জেনে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাজা টোডরমলের নামে পাঠানো লাড্ডুর সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ালেন। রাজকুমার সেলিমের অজ্ঞান হওয়ার খবরে রণাঙ্গন থেকে আকবর ছুটে আসেন, চিকিৎসায় তার জীবন রক্ষা পায়। তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজা টোডরমল রাজকুমারের জন্য লাড্ডু পাঠান। পথের কাটা সরাতে মীর্যা শরফুদ্দিন নিজেই লাড্ডুতে বিষ মাখিয়ে পাঠিয়েছিলেন।

আকবর তার বোন বকশী বানুকে জিজ্ঞেস করলেন, এক্ষেত্রে কী শাস্তি হওয়া উচিত? মোগল কন্যা বকশী বানু নিজেই স্বামীর বিরুদ্ধে রায় দিলেন—মৃত্যুদণ্ড।

১৬০০ সালে মীর্যা শরফুদ্দিনকে হাতির পায়ের দলনে নির্মমভাবে জনসমক্ষে মৃত্যুবরণ করতে হয়। মাহাম আঙ্গার উচ্চভিলাস ও ক্রোধের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল মীর্যা শরফুদ্দিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা সমাহিত হলো।

 

ইবনে মোতালিব: লেখক