সাতচল্লিশ-পূর্ব সময়টিতে যোগেন মণ্ডল একদিকে যখন বাংলায় আম্বেদকরের শিডিউল ফেডারেশনের শাখা করছেন, একই সময়ে দলিত-নমঃশূদ্রদের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার জন্য প্ররোচিত করছিলেন মুসলমানদের সঙ্গে মিলতে। আরো সরাসরি বললে তার বক্তব্য ছিল ‘ছোটলোকদের এক হওয়া প্রয়োজন।’ উচ্চবর্ণের সবাই বাংলার নিম্নবর্ণের ‘সকলকে’ তখন কার্যত ‘ছোটলোক’ই মনে করত। যেকোনো মূল্যে জাতপাতের নিগড় থেকে মুক্তির কৌশল খোঁজাই যোগেনের রাজনৈতিক অবস্থান।
এ অবস্থানের কারণেই তিনি দাঙ্গার দিনগুলোয় বাংলা ঘুরে ঘুরে নিম্নবর্ণের মানুষকে দাঙ্গা থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করছিলেন এই বলে যে এ সংঘাত হলো পুরোদস্তুর সম্ভাব্য শাসক এলিটদের শক্তি পরীক্ষার দুষ্টফল; এতে অংশ নিয়ে নিম্নবর্গের কোনো লাভ নেই। এ বক্তব্যসংবলিত দাঙ্গাবিরোধী লিফলেটও প্রচারিত হতে দেখা যায়—মুসলিম লীগের চার ও তফসিলি সম্প্রদায়ের চার নেতার স্বাক্ষরে। নিজ কাগজ জাগরণ-এও যোগেন মণ্ডল প্রতি সংখ্যায় এরূপ বার্তাই দিচ্ছিলেন তখন। তার সেদিনকার প্রচারাভিযানের মূল সুর দেবেশ রায় ব্যক্ত করেছেন এভাবে:
শূদ্রের স্বাভাবিক আত্মীয়তা মুসলমানদের সঙ্গে। শূদ্র ও মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট, আয়-ব্যয়, চাষ-আবাদ, মাছ ধরা, নৌকা চালানো, সুখ-অসুখ, চেঁচামেচি, ডাকাডাকি, অসুখ-বিসুখ, টোটকা-টুটকি—সবই একরকম। তাহলে কোথাও হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাঁধলেই শূদ্ররা গিয়ে বামুন-কায়েতদের লেঠেল হবে কেন?
যোগেন মণ্ডলের এ অবস্থানের মধ্য দিয়েই সাতচল্লিশে বাংলায় দলিত ও মুসলমানদের জোট দ্রুত রাজনীতির প্রধান বর্গ হয়ে ওঠে এবং তারই ফল পূর্ব-বাংলার পাকিস্তানের অংশ হওয়া। একই সঙ্গে যোগেনের এ ভূমিকা সেদিন নোয়াখালী ছাড়া প্রায় পুরো পূর্ববঙ্গে দলিত নমঃশূদ্রদের দাঙ্গার উত্তাপ থেকে অনেকাংশে রক্ষা করেছিল। ১৯৪৬ সালে ১৬ আগস্টের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ থেকে শুরু হওয়া সে দাঙ্গা দেশভাগের অন্যতম নির্ধারক ঘটনা ছিল। সেদিন কলকাতায় মুসলিম লীগ যে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল, তাতে যোগেন মণ্ডলের সমর্থন ছিল। তবে শিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন এ সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ছিল। মুসলিম লীগের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’-এর আগের দিন ১৫ আগস্ট তারা কলকাতায় পুনা চুক্তিবিরোধী দিবস পালন করে। কিন্তু প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের দাঙ্গার ফলে ফেডারেশনের সে আন্দোলন ইতিহাসের মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। এর ঠিক এক মাস পর গঠিত হয় পণ্ডিত নেহরুর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার, যাতে নমঃশূদ্র যোগেন মণ্ডল ছিলেন মুসলিম লীগের একজন প্রতিনিধি, যা ঘটনা হিসেবে পুরো ভারতবর্ষে চমক তৈরি করে।
এরই মধ্যে কলকাতা হত্যাযজ্ঞের পর সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে এক ভোটাভুটি আয়োজিত হলে মুখ্যত যোগেন্দ্রনাথের চেষ্টাতেই কংগ্রেসপক্ষীয় চারজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্য ও চারজন অস্পৃশ্য সদস্যের সমর্থন মুসলিম লীগের পক্ষে আসে, যা মন্ত্রিসভার পতন রোধ করে। কিন্তু সরকারকে রক্ষা করা গেলেও সমগ্র বাংলাজুড়ে কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গা আন্তঃসাম্প্রদায়িক সম্পর্কে যে ক্ষত তৈরি করে, তা সামাল দেয়া একজন যোগেন মণ্ডলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার রাজনৈতিক চিন্তা ও স্বপ্নের সামনে অভূতপূর্ব এক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয় এ সময়।
যদিও দেশভাগের ইতিহাসের মতোই ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় আহত-নিহতদের পরিচয় ও সংখ্যা সর্বত্রই ‘হিন্দু’ বা ‘মুসলমান’ হিসেবেই নথিবদ্ধ হয়েছে, কিন্তু বস্তিবাসী অনেক শ্রমজীবী দলিত—তথা ‘ছোটলোক’ও মারা গিয়েছিল কলকাতায়। এ দাঙ্গার সবচেয়ে বিধ্বংসী ফল হয়েছিল বাংলার দূরবর্তী অঞ্চলগুলোয় দাঙ্গা-পরবর্তী দিনগুলোয় মুসলমান নিম্নবিত্তদের সঙ্গে হিন্দু নিম্নবর্গের সম্পর্কের অদৃষ্টপূর্ব অবনতি। ক্রমে এ দুই জনগোষ্ঠী পরস্পরকে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করে, অতীতে যা ছিল না। উপরন্তু এ প্রথম ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির আদলে বাংলায় দলিত-নমঃশূদ্রদের সঙ্গে মুসলমান নিম্নবর্গের সম্পর্ক হিন্দু বনাম মুসলমান সমীকরণে মেরুকৃত হতে শুরু করে।
হিন্দু নেতৃত্বের অনেকেই এ সময় সরকার থেকে পুনঃপুন যোগেন্দ্রনাথের পদত্যাগের দাবি তুলে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল এবং তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলা যায় না। এর উত্তর দিতে গিয়ে জাগরণ কাগজে যোগেন মণ্ডল যে বিবৃতি দেন, তার সারকথা ছিল ‘এই দাঙ্গা কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়, এটা হলো কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যকার রাজনৈতিক যুদ্ধ। এ দাঙ্গায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দলিতদের অর্জন করার মতো কিছু নেই। আগের মতোই তারা উভয়ে একই আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে।’ বক্তব্যটি এ অর্থে সঠিক ছিল যে কলকাতায় ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ও পরবর্তী কয়েক দিনের ঘটনাবলিতে স্বতঃস্ফূর্ততার পরিবর্তে সুসংগঠিত রাজনৈতিক ক্রোধোন্মত্ততাই যে অধিক কাজ করেছিল, সে বিষয়ে এরই মধ্যে বিস্তর অনুসন্ধানী গবেষণা হয়েছে। উল্লিখিত বাস্তবতায় যোগেন মণ্ডল ও তফসিলিদের মৈত্রীর রাজনীতি সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল, মৃত্যুর বিভীষিকা ছাড়াও দাঙ্গায় পুড়েছিল মুসলমান এবং দলিতদের বিপুল সম্পত্তি ও বসতি। যোগেন্দ্রনাথের আহ্বান সত্ত্বেও কলকাতা দাঙ্গায় দলিত-নমঃশূদ্ররা অংশ নিয়েছিল এবং মুসলমানদের মতোই ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিল। এ পরিস্থিতি স্পষ্টত তখন কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার বাংলা ভাগের মতাদর্শকেই নৈতিকভাবে শক্তি জুগিয়েছিল, যোগেনের ‘বহুজনবাদ’কে নয়। তবে এ প্রসঙ্গে এও উল্লেখ করতে হয় ১৬ আগস্টের কর্মসূচি পালনকালে ঢাকার পরিস্থিতি ছিল কলকাতার পরিস্থিতির বিপরীত। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ঢাকাস্থ সদর দপ্তর ১৫০ নং মোগলটুলী ও চকবাজার এলাকা থেকে প্রধান মিছিল বেরিয়েছিল। জনসভার স্থান নির্ধারিত হয়েছিল নয়াবাজার সিরাজউদ্দৌলা পার্কে। মিছিল ও জনসভা উভয়ই শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছিল। সেদিনের স্মৃতিচারণ করে ওই মিছিল ও জনসভার অন্যতম সংগঠক মোহাম্মদ তোয়াহা লিখেছেন, ‘রাতে যখন কলকাতা থেকে রক্তপাতের খবর আসতে থাকে, তখনই কেবল ঢাকার আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে।’
দেশভাগের অব্যবহিত আগে যুক্তবাংলার পক্ষে অবস্থান নিয়ে যোগেন মণ্ডল চূড়ান্তভাবে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের বিরাগভাজন হন। আবার বাংলা ভাগ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে তিনি তফসিলিদের পূর্ব বাংলায়ই থেকে যাওয়ার পক্ষে প্রচার আন্দোলনে নেমে সেসব নমঃশূদ্র নেতৃত্বেরও অসন্তুষ্টির কারণ হন, যারা ভারতে চলে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। স্পষ্টত তফসিলি সমাজের সংগঠকদের পূর্বতন মতদ্বৈধতা এ পর্যায়ে এসে বাড়তি তীব্রতা পায়। হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস বহুকাল ধরে বাংলায় তফসিলিদের মাঝে বিভক্তির যে চেষ্টা করছিল, এ পর্যায়ে এসে তারা সফল হয়।
বস্তুত ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর প্রজা পার্টি-মুসলিম লীগ সরকারে বাংলার তফসিলি সমাজের নেতাদের প্রভাবশালী একাংশের সমর্থন কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা তিক্ততার সঙ্গেই নিয়েছিল। তারা এ মৈত্রী অবসানের লক্ষ্যে এবং দলিত নমঃশূদ্রদের অপরাংশকে কাছে টানতে এরপর ধারাবাহিকভাবে অনেক পদক্ষেপ নেয়, যার মধ্যে ছিল বিভিন্ন স্থানে নিম্নবর্গের মানুষের মন্দিরে প্রবেশ সুগম করতে ‘সত্যাগ্রহ’-এ অংশগ্রহণ, তফসিলি নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন, শুমারিতে তফসিলি পরিচয়ের পরিবর্তে ‘হিন্দু’ পরিচয় উল্লেখে উৎসাহিত করা ইত্যাদি। ১৯৩১ সালে হিন্দু মহাসভা বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উচ্চশ্রেণীর নাম গ্রহণ এবং শুমারিকালে ‘ক্ষত্রিয়’ পরিচয় প্রদানের জন্য ব্যাপকভাবে প্ররোচিত করছিল। প্রায় অনুরূপ লক্ষ্যে ১৯৩২ সালের এপ্রিলে সমগ্র বাংলা প্রদেশে আয়োজিত হয় হিন্দুমেলা। এর লক্ষ্য ছিল মূলত নিম্নশ্রেণীর সদস্যদের ‘শুদ্ধ’ করে তাদের হিন্দু হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করা। সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায় না। ১৯৪১ সালের শুমারি প্রকাশিত হলে দেখা যায় তাতে আগের শুমারির (১৯৩১) চেয়ে বাংলায় তফসিলি জনসংখ্যা প্রায় আট লাখ কমে গেছে, যা ছিল অস্বাভাবিক। হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক ও সামাজিক সব প্রচারণা উদ্যোগ বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হয় প্রজা পার্টি-মুসলিম লীগ-তফসিলি জোট সরকারের অভ্যন্তরে তফসিলি নেতৃত্বের অসন্তোষ তৈরি হলে। এ পটভূমিতেই ১৯৩৭ সালের মার্চে ফরিদপুরের নমঃশূদ্র সংগঠক গুরুচাঁদ ঠাকুর মারা যাওয়ার পর যিনি এ আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, সেই প্রমথরঞ্জন ঠাকুর (গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রপৌত্র) ক্রমে ফরিদপুরকেন্দ্রিক নমঃশূদ্র আন্দোলনের ধারাকে কংগ্রেসমুখী করে তোলেন। ১৯৩৮ সালের ১৮ মার্চ কলকাতায় মোহনদাস গান্ধীর সঙ্গে দেখাও করেন প্রমথরঞ্জন। এ সময় যোগেন মণ্ডলও উপস্থিত ছিলেন। কংগ্রেসের সভাপতি তখন সুভাষ বসু। কলকাতা বৈঠকে দলিতদের স্বার্থে গান্ধীর বিভিন্ন আশ্বাসে প্রমথরঞ্জন ধীরে ধীরে অনুকূল সাড়া দিলেও যোগেন মণ্ডলের অবস্থান তদ্রূপ ছিল না। সেটা সম্ভবও ছিল না। কারণ গান্ধীর ‘হরিজন আন্দোলন’কে যোগেন মণ্ডল প্রতিনিধি পরিষদে ‘আসন সমস্যা এড়াবার কৌশল’ ও তফসিলিদের জন্য অপমানকর মনে করতেন। যোগেনের এ মনোভাব ছিল প্রকাশ্য। ফলে তফসিলি রাজনীতিতে কংগ্রেস ও ফেডারেশনপন্থী নামে দুটি ধারা তৈরি হয়েছিল। এটা ব্যাপকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন প্রমথরঞ্জন ঠাকুর দেশভাগের ঠিক আগ মুহূর্তে সোহরাওয়ার্দী ও যোগেন মণ্ডলের ‘স্বাধীন সংযুক্ত বাংলা’র প্রস্তাবের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে ভিন্ন প্রস্তাব দেন।
১৯৩৯ সালের ২৯ মে নিখিলবঙ্গ নমশূদ্র সম্মেলনে প্রমথরঞ্জন ঠাকুর সভাপতির ভাষণে তার সম্প্রদায়কে জাতীয় কংগ্রেসে যোগদানের আহ্বান জানান। কিন্তু যোগেন মণ্ডল স্পষ্টতই স্বতন্ত্র পথ অনুসরণ করছিলেন এবং ১৯৪৩ সালে ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পর গঠিত মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দিনের কেবিনেটে যোগ দিতে দ্বিধা করেননি। ১৯৪৬ সালের সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায়ও তিনি সদস্য হন। এ মন্ত্রিসভাই ছিল অবিভক্ত বাংলার শেষ মন্ত্রিসভা। যোগেন মণ্ডলের সঙ্গে প্রমথরঞ্জন ঠাকুরদের এ পৃথক পথচলার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৪৭-পরবর্তী দশকগুলোয় পশ্চিমবঙ্গে। ততদিনে দেশভাগ ও বাংলাভাগ অনিবার্য হয়ে গেছে।
বাংলা ভাগ অনিবার্য হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যোগেন মণ্ডলের বহুজনবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের একটা পর্যায় শেষ হয়। বস্তুত এটা ছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক ব্যর্থতাই। যে ব্যর্থতার কুশীলব ছিলেন তখন ভারতবর্ষের প্রধান দলগুলোর পাশাপাশি তফসিলি নেতৃত্বের একাংশও। ইতিহাসের নবতর পর্যায়ে যোগেন মণ্ডল পাকিস্তানের পরিসরে তার রাজনৈতিক অবস্থানের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে নামেন। এর প্রথম পরীক্ষা হিসেবে সিলেটের গণভোট প্রচারণায় অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের নবপর্যায়ের শুরু বলা যায়। বর্তমান সিলেট যে প্রথমে পাকিস্তানে এবং পরে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হলো, তার কৃতিত্বের বড় এক ভাগীদার যোগেন মণ্ডলও। যদিও তা কমই উল্লেখিত হয়। অনেকে এটা সচেতনভাবেই এড়িয়ে যান। আবার করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি যে আসামে পড়ে গেল তার দায় যে তখনকার মুসলমান নেতৃত্বের একাংশের সেটাও আজ আর আলোচিত হয় না।
তখনকার সময়ে অমুসলিমপ্রধান প্রদেশ আসামে মোট জনসংখ্যার (১ কোটি ২ লাখ ৪ হাজার ৭৩৩) মধ্যে মুসলমানরা ছিলেন ৩৪ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯। প্রদেশের সিলেট অঞ্চলই স্বল্পমাত্রায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। কংগ্রেস সরকারের অধীনে থাকা অবস্থায় ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই গণভোটে সিলেট যে আসাম প্রদেশ ছেড়ে পাকিস্তানভুক্ত হয়, তাতে যোগেন মণ্ডলের প্রচারণা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল বলে দাবি করেছেন ওই নির্বাচনী প্রচারণার সরাসরি কর্মী আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রসূন কান্তি-বরুণ রায়, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী প্রমুখ। সোহরাওয়ার্দীও এ প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। তার অনুরোধে টাঙ্গাইলের আরপি সাহা কয়েকটি লঞ্চ দিয়ে এ নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রচারণাকে সহায়তা করেন। গণভোটে প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছিল ভারতভুক্তির পক্ষে কুঁড়েঘর এবং পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে কুড়াল। কংগ্রেস ও জমিয়েতে উলামায়ে হিন্দ কুঁড়েঘরের পক্ষে কাজ করেছিল, জমিয়তের নেতা ছিলেন মাওলানা মাদানি। চা-শ্রমিকদের ‘ভাসমান জনগোষ্ঠী’ অভিহিত করে নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তবে স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের অবস্থানের প্রতি মৌন সমর্থন দিয়েছিল। যদিও মাত্র তিন বছর আগেই কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পিসি যোশী ও পিপলস ওয়ার পত্রিকার সম্পাদক ডা. গঙ্গাধর অধিকারী পাকিস্তান অ্যান্ড ন্যাশনাল ইউনিটি নামক এক পুস্তিকায় পাকিস্তান দাবিকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেছিলেন এবং এটাই ছিল তখনকার পার্টির ‘রাজনৈতিক লাইন’। মুসলিম লীগের বাইরে কমিউনিস্ট পার্টিই ছিল একমাত্র দল, যারা পাকিস্তান দাবি সমর্থন করেছিল। তবে তিন বছর পর ‘যোশী-অধিকারী থিসিস’ ‘সংশোধন’ করতে গিয়ে দলটিকে সিলেট গণভোটকালে বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়।
জিন্নাহর অনুরোধে এ সময় যোগেন মণ্ডল সিলেট গণভোটের নির্বাচনী প্রচারণায় দীর্ঘ সময়জুড়ে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেখানকার নমশূদ্র ও অন্য দলিতদের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে প্রভাবিত করেন। তফসিলি ও হিন্দু প্রতিপক্ষদের কাছে যোগেন মণ্ডল তখন ‘যোগেন মোল্লা’ নামে উল্লেখিত হচ্ছিলেন। ইতিহাসের ওই মূহূর্তে নিজের শূদ্রত্বকে যোগেন মণ্ডল অসাধারণ এক রাজনৈতিক মাহাত্ম্যে স্থাপন করতে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ইতিহাসের বড় কৌতুক এই যে যোগেন মণ্ডল যখন সিলেটের পূর্ব-পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন, তখন প্রভাবশালী মাওলানা হোসেন আহমদ মাদানী (জমিয়তে উলামায়ে হিন্দর নেতা) সিলেটের আসামভুক্তি তথা ভারতে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কুড়ালের পক্ষে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ ভোট পড়ে এবং কুঁড়েঘরের পক্ষে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট। কুড়াল ৫৫ হাজার ৫৭৮ ভোটে জয়লাভ করে। কুড়ালের পক্ষের অমুসলিম ভোটারদের বিরাট অংশই ছিল স্থানীয় তফসিলিরা। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো গণভোট শেষে সিলেটে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হয়নি। পরবর্তী সময়ে যদিও অনেক হিন্দু পরিবার সিলেট ছেড়েছিল, কিন্তু এমন উদাহরণও বিপুল যে প্রগতিশীল হিন্দু ধর্মাবলম্বী অনেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও মাতৃভূমিতে থেকে যাওয়ার প্রশ্নে দৃঢ় ছিলেন এবং এ বিষয়ে সিলেটজুড়ে প্রচার আন্দোলন চালিয়েছিলেন। তাছাড়া এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সিলেট গণভোটকালে মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই মূলত মুসলমানদের ভোট প্রার্থনা করলেও যোগেন মণ্ডল যেমন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন, তেমনই ব্যতিক্রম ছিলেন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী। তিনি বিবৃতি দিয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের ভোট চেয়েছিলেন। ভোটের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হন। তার ওই সময়কার একটি বিবৃতির অংশবিশেষ ছিল এ রকম:
পাকিস্তানে প্রত্যেক মজলুম শোষণের হাত হইতে রক্ষা পাইবে।... গণভোটের সময় সিলেটকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য হিন্দু-মুসলমান উভয়ের নিকট আমি আবেদন জানাইতেছি। অনেকেই পাকিস্তান সম্পর্কে সংখ্যালঘুদের মনে ভুল ধারণা জন্মাইবার অপচেষ্টা করিতেছে। আমি প্রত্যেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে এই প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, তাহারা পাকিস্তানে সর্বপ্রকার সুবিধা ভোট করিতে পারিবেন।
মওলানার এ প্রতিশ্রুতি কতটা তার বাংলায় রক্ষিত হয়েছিল সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটা ছিল কার্যত অনেকটাই জিন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিধ্বনি। তবে ইতিহাসের বড় কৌতুক হলো জিন্নাহর মৃত্যুর পর এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে যাওয়ায় পূর্ব বাংলায় যাদের সঙ্গে মুসলিম লীগের প্রথম মতভিন্নতা তৈরি হয়, তার মধ্যে সর্বাগ্রে ছিলেন ভাসানী ও যোগেন মণ্ডল। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর স্বল্পকালের মধ্যে ভাসানী প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। সরকার এ সময় ১৯৫০ পর্যন্ত ভাসানীর যেকোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১৯৫০ সালে যোগেন মণ্ডলও পাকিস্তান ছাড়েন।
সিলেট গণভোট ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বিপুল অবদান রাখা সত্ত্বেও জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের একদল দক্ষিণপন্থী আমলা যোগেন মণ্ডলসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন নমঃশূদ্রদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাদের পাকিস্তানবাস অসম্ভব করে তুলেছিলেন এবং বিশেষভাবে এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রভাবশালী আমলা চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের এ কর্মকর্তা ১৯৪৭-পরবর্তী দিনগুলোয় পাকিস্তানের আমলাতন্ত্রের প্রধান নির্মাতা হয়ে ওঠেন। মন্ত্রিপরিষদের সচিব হিসেবে তিনি অনেক প্রয়োজনীয় নথি আইনমন্ত্রী যোগেন মণ্ডলের কাছে গোপন রাখতেন। তার কাছে যোগেন মণ্ডলের দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাভাবিকভাবেই এটা ছিল যোগেন মণ্ডলের জন্য চরম হতাশাজনক ও বেদনাময়। যে দেশ প্রতিষ্ঠায় তিনি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছেন, সেখানে ধর্মগত কারণে তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাকে যোগেন মণ্ডলের রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের পরাজয় হিসেবে অভিহিত করা যায়। সম্ভবত সে কারণেই তিনি পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আবেগতাড়িত হয়ে পদত্যাগপত্রে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে পাকিস্তানে হিন্দুদের বসবাস দুরূহ হয়ে উঠছে। অনেকে তখন যোগেনের এ মন্তব্যের প্রতিবাদ করেন। তবে কালক্রমে জনমিতিক তথ্য-উপাত্তে সেটা অনেকটা সত্য হয়ে গিয়েছিল।
আলতাফ পারভেজ: যোগেন মণ্ডলের বহুজনবাদ ও দেশভাগ গ্রন্থের লেখক









