সিলেট জেলার ইতিহাসে গণভোট একটি স্মরণীয় ঘটনা। এটিকে সিলেটের ভাগ্যনির্ধারণী পদক্ষেপও বলা যায় নিঃসন্দেহে। ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারতবর্ষকে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত করে স্বাধীনতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলে প্রস্তাবিত দুটি রাষ্ট্রের এলাকা ও সীমানা নিয়ে বিরাট জটিলতার সৃষ্টি হয়। সিলেট জেলা ভারতে নাকি পাকিস্তানে থাকবে, এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণভোটের আয়োজন করা হয়। এটিই ‘সিলেট রেফারেন্ডাম’ বা ‘সিলেটের গণভোট’ নামে পরিচিতি পায়। নির্বাচনে কংগ্রেস ‘কুঁড়েঘর’ প্রতীক নিয়ে ভারতের পক্ষে এবং মুসলিম লীগ ‘কুড়াল’ প্রতীক নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিল।
এ গণভোটে ব্যবহৃত পোস্টার, প্রচারপত্র, কবিতা, গান, স্লোগানে জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। পাশাপাশি এসবের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তৎকালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এসব স্লোগান রাজনীতির রাজপথকে উত্তপ্ত করেছিল। কখনো পক্ষে-বিপক্ষে চরম উত্তেজনাও ছড়িয়েছিল। তবে কেমন ছিল সিলেট গণভোটের প্রচার-প্রচারণা? এ নিয়ে গান, কবিতা, স্লোগানের ধরনই বা কেমন ছিল? এসব প্রশ্নের কিছুটা উত্তর মেলে সিএম আবদুল ওয়াহেদ রচিত ‘সিলেটে গণভোট’ নামক গ্রন্থে। নবীগঞ্জ থাকাকালে লেখক সিএস আবদুল ওয়াহেদ একটি স্লোগানের সঙ্গে পরিচিত হন। স্লোগানটি হলো— ‘ও সজনী সিলেট ভেঙে গুঁড়া করতায় নি।’ সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এ স্লোগানে সিলেটকে আসামের পক্ষে রাখার দাবিই উত্থাপিত হয়েছে। গণভোটের প্রচারণাকালে লেখক একবার মিছিলের সম্মুখীন হন। দুদিক থেকে দুই পক্ষের ছাত্ররা মিছিল নিয়ে আসছে। দুই মিছিলের ব্যবধান দু-তিন ফার্লং। মুখোমুখি হলে সংঘর্ষ অনিবার্য। কিন্তু সংঘর্ষ হলে গণভোট ভেস্তে যেতে পারে। তাই যেকোনো মূল্যে সংঘর্ষ পরিহার করতে হবে। তাই উপস্থিত মুরব্বিরা এ বিষয়ে লেখককে অনুরোধ জানান, যাতে সংঘর্ষ এড়ানো যায়। অবশেষে মিছিলকারীরা লেখকের কথায় অন্য পথ ধরে।
নানা রকম স্লোগানে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস তাদের পক্ষে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। মুসলিম লীগের কর্মী-সমর্থকের স্লোগান ছিল—
‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’, ‘আসামে আর থাকব না, গুলি খেয়ে মরব না’, ‘ভোটের ঘরে কুড়াল মারো, পাকিস্তান আজাদ করো’, ‘পাকিস্তানের পেট্রলে সারা দুনিয়ার গাড়ি চলে’, আসামে আর থাকব না, মশার কামড় খাব না।’ ‘আসামে আর থাকব না, পুলিশের গুলি খেয়ে মরব না।’
অন্যদিকে কংগ্রেস কর্মীরা দিত—
‘পাটের দেশে যাব না, ভাতের মাড় খাব না, অনাহারে মরব না’, ‘ঘরের লাগা শিলং শিলচর, আপনজনও তোর হইবে পর রে’, ‘সুখে যদি থাকতে চাও ঘরের বাক্সে ভোট দাও’, পাকিস্তান ঝিঙার ঝাড়, গাইয়ে খার বদলে চার’, ‘ভেঙে দিও না সোনালি সিলেট’, ‘আসাম ছেড়ে ভঙ্গুর বাংলায় যেয়ো না’, ‘পূর্ববঙ্গে যাব না নালিশাক খাব না’, ‘পূর্ববঙ্গে যাব না ঘোড়ার ঘাস খাব না’ ইত্যাদি নানা স্লোগান। এভাবে প্রচার-পুস্তিকা ও গান-কবিতায় মুখর হয় শহর, বন্দর, গ্রাম।

১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোটে ব্যবহৃত কংগ্রেসের প্রচারপত্র ছবি: সালাউদ্দিন দোলক এর আর্কাইভ থেকে
পোস্টার-প্রচারপত্রেও ছিল চমকপ্রদতা। গবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরীর সৌজন্যে তৎকালীন গণভোটের কিছু প্রচারপত্রের নমুনা দেখার সুযোগ হয়। একটি প্রচারপত্রে বড় অক্ষরে লেখা— ‘শ্রীহট্টের বাংলায় যাওয়া মানে না খাইয়া নিশ্চিত মৃত্যু।’ প্রচারপত্রটিতে এমন লেখার পাশাপাশি একটি কঙ্কালের ছবিও দৃশ্যমান।
অন্য আরেকটি পোস্টারে কংগ্রেসের কুঁড়েঘর চিহ্নিত ছবি। পাশে মুসলিম লীগের কুড়াল চিহ্নিত ছবি এবং তাতে ক্রস দেয়া। লেখা রয়েছে সাবধান নিজের পায়ে কুড়াল মারিবেন না! ঘর চিহ্নিত বাক্সে ভোট দিয়া শ্রীহট্টকে আসামে রাখুন।
দক্ষিণ শ্রীহট্ট গণভোট প্রচার সম্পাদক মো. ফজলে মান্নান চৌধুরী ও শ্রী সত্যেন্দ্র কুমার সেন কর্তৃক প্রকাশিত প্রচারপত্রে দেখা যায়, কুঁড়েঘরের ছবি ছেপে তাতে লেখা, ‘ঘরের ছেলে ঘরে থাকো, কুড়াল পায়ে মারো নাকো।’ ‘নিজে যদি বাঁচতে চাও ঘরের বাক্সে ভোট দাও। হিন্দু-মুসলমান ভাইসব ঘরের বাক্সে ভোট দিয়া নিজের ঘর রক্ষা করুন’ ইত্যাদি।
গণভোট যে জনমনে জাগরণ সৃষ্টি করেছিল তা বোঝা যায় এ নিয়ে রচিত ভাট কবিতা বা হাটুরে কবিতা দেখে। মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ পাঠানের ‘বাংলাদেশের ভাটকবি ও কবিতা’ গ্রন্থে একটি ভাটকবিতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আশরাফ হোসেন রচিত কবিতাটি এমন—
সন উনিশ শতের সাতচল্লিশে তেসরা জুনেতে/ বড়লাট ঘোষণা জান কইলা এই মতে।/ সিলেটি মুসলমান পাকিস্তান যদি চাহে আর/ ভোট দিয়া প্রমাণ খাড়া করি দিবে তার।/ এখন জরুর বড় হইয়া দৃঢ় ভোটার মুসলমান/ কুড়াল বাকসে দিবায় হইয়া এক প্রাণ।/ যত বিরোধী দল ছলবল করবা নানা মতে/ বিন্দুমাত্র কান কেহ নাহি দিবায় তাতে।/ যদি ভুল করিবা পস্তাইবা বংশ বুনিয়াদান/ জুলুম হইতে কেহ না পাইবা তরান।/ শুন বন্ধুগণ দিয়া মন লোভের বশেতে/ উলটাপথ না ধরিবায় জীবন থাকিতে।/ জীবন পণ করি তাড়াতাড়ি কাজে লাগি যাও/ একজন শতজনরে বিনয়ে বুঝাও।/ এবার হার যদি নিরবধি কান্দি যাবে দিন/ খাদেমের কথায় ভাই করহ একিন।/ কবি শেষ হইল বাকী রইল নাম ও ঠিকানা/ আশরাফ হোসেন নাম, রহিমপুর আস্তানা।
এছাড়া হবিগঞ্জের কবি শামসুদ্দিন আহমদের রচিত ‘গফফার খানের টপকা গানে’, ‘সীমান্তে ফুটে না শতদল’ ইত্যাদি গান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমনকুমার দাশ বলেন—
গণভোটের সময় উভয় পক্ষই নিজেদের প্রচারণায় পাল্টাপাল্টি গান পরিবেশন করতেন। প্রখ্যাত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসসহ অনেকের আত্মজৈবনিক লেখা থেকে এ তথ্য জানা যায়। পরিবেশিত অনেক গানের সুর প্রচলিত লোকায়ত ধারার ছিল। মূলত গ্রামীণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্যই এমন মাটিঘেঁষা সুর বেছে নেয়া হয়েছিল।’
সুমনকুমার দাশ তার ‘দেশভাগ, সিলেটে গণভোট, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের হাহাকার’ শিরোনামের নিবন্ধে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন,
প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-১৯৮৭) তাঁর আত্মজীবনী “উজান গাঙ বাইয়া’’তে (২০১২, শতবর্ষ সংস্করণ) লিখেছেন, ‘সিলেট আসামে থাকবে, না পূর্ব পাকিস্তানে যাবে তাই নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা এক গণভোটের আয়োজন করেছিল। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ফাঁস করে দিয়ে জনগণকে বুঝিয়ে বলার বদলে পার্টি-নেতৃত্ব সিলেটের আসামভুক্তির সপক্ষে নেমে পড়লেন। ... এই সুবিধাবাদী পার্টি-নীতির অনুগামী হয়ে আমিও গান লিখলাম: “ভাঙনের স্রোতে ভাঙিতে চাও কি সোনার সুর্মা ভূমি/ স্বদেশদরদী হিন্দু-মুসলমান জাগো জাগো আজ তুমি।” এ গানের কথা বা সুর কিছুই আমার ভালো মনে নেই। তবে শ্রীচৈতন্য, শাহজালাল প্রভৃতির প্রসঙ্গ এনে সিলেটের ধর্মীয় মিলনের আহ্বান ছিল, এটুকু মনে আছে।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার অবস্থান ছিল সিলেটের আসামভুক্তির পক্ষে। কিন্তু দেশভাগের পর যখন তিনিও স্থায়ীভাবে কলকাতাবাসী হন, তখন তার গান আর সুরে ঝরে যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের আর্তনাদ। বিষাদ ও হাহাকার মাখানো পঙ্ক্তিতে লেখেন, ‘হবিগঞ্জের জালালী কইতর/ সুনামগঞ্জের কুড়া/ সুরমা নদীর গাংচিল আমি/ শূন্যে দিলাম উড়া ॥/ শূন্যে দিলাম উড়ারে ভাই, যাইতে চান্দের চর/ ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কৈল্কাত্তার উপর।/ তোমরা আমায় চিনছনি ॥/ হাওরের পানি নাইরে হেথায়, নাইরে তাজা মাছ/ বিলের বুকে ডালা মেলা, নাইরে হিজল গাছ/ বন্ধু নাইরে তাজা মাছ।/ তবু নিদহারা নগরের পথে রাইতের দুপুরে/ মরমিয়া ভাটিয়ালি আমার গলায় ঝুরে/ তোমরা আমায় চিনছনি ॥’
এ গান জন্মভূমির প্রতি স্মৃতিবিধুরতার অনুপম প্রকাশ আর দেশভাগের করুণ সত্যকেও ধারণ করেছে।
বাস্তুচ্যুত চেনা-অচেনা মানুষের চোখের জলে যেন গানটি লেখা। আত্মপরিচয়–সংকটে ভুগে অপরিচিত পরিবেশে নিজের অসহায়তার ছবি স্পষ্ট করে আঁকেন হেমাঙ্গ এবং শূন্যে প্রশ্ন ছোড়েন—‘তোমরা আমায় চিনছনি’?
[প্রথম আলো, ৬ জুলাই, ২০২১]
সিলেটবাসী বিপুল ভোটাধিক্যে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে রায় দেয়। গণভোটের ফলাফলের পর সিলেটের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে দেশত্যাগ করে ভারত চলে যান। আসাম তথা করিমগঞ্জ থেকেও অনেক মুসলিম পরিবার সিলেটে আসেন। শতমায়ার জন্মভিটা ছেড়ে এভাবেই পাড়ি জমান নিদহারা নগরের পথে। গল্প, গান, কবিতায় এখনো সে স্মৃতির জানালা খুলে বসতে চান অনেকেই; ঠায় দাঁড়াতে চান স্বভূমির স্মৃতির আঙিনায়।
শিশির কুমার নাথ: ঐতিহ্য সংগ্রাহক









