একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে সালেরনো ও সিসিলি ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিল। বিশেষত যখন উভয়ই ডি হটভিল রাজবংশের অধীনে শাসিত ছিল। তারা যখন সিসিলি জয় করেন, তখন কয়েকজন মুসলিম শাসক দ্বারা শাসিত হতো অঞ্চলটি। ভূমধ্যসাগরের বৃহত্তম ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ হিসেবে সিসিলি প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিটি সাম্রাজ্যের আক্রমণের তালিকার শীর্ষে ছিল। গ্রেকো-রোমান আমলেই সিসিলি সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তী শতাব্দীতে সিসিলি বহুবার আক্রমণ করা হয় কৌশলগত অবস্থানের কারণে। সিসিলির অবস্থান দক্ষিণ ইতালির কাছাকাছি এবং সেখান থেকে উত্তর আফ্রিকা, স্পেন ও মধ্যপ্রাচ্যে সহজে প্রবেশযোগ্য ছিল। ভেন্ডাল ও গথরা দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণ করে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। বাইজেন্টাইনরা গ্রিক সংস্কৃতি ও ভাষা পুনঃপ্রবর্তন করে। নবম শতাব্দীতে আরবরা আক্রমণ করার পর তাদের পুরোপুরি সিসিলি জয় করতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল। একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দ্বীপটি স্থানীয় সামন্ত প্রভুদের নেতৃত্বে একাধিক যুদ্ধরত প্রদেশে বিভক্ত হয়ে যায়।

ডি হটভিলরা বিশ্বমঞ্চের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের প্রভাবে আরব ও বাইজেন্টাইন রাজকীয় সংস্কৃতি ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বাদশ শতাব্দীজুড়ে তিনটি নতুন ক্যাথেড্রাল প্রতিষ্ঠা করা হয় সিসিলিতে। জরাজীর্ণ শহরের প্রাচীর ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং নতুন বণিক সম্প্রদায় সিসিলির শহর ও নগরীতে স্থায়ী বসবাস শুরু করে, যা মুসলিম এবং ইহুদি বণিকদের শূন্যস্থান পূরণ করে, যারা আগের আক্রমণের সময় দ্বীপ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এতদিন আরব প্রভাব গভীরভাবে প্রোথিত ছিল, এবার সিসিলির সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি মনোযোগ বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জনগণের মধ্যে ঐক্য রক্ষার জন্য শাসক দ্বিতীয় রজার সত্যিই অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং তার মুসলিম-আরব ও গ্রিক-বাইজেন্টাইন প্রজাদের ঐতিহ্যকে উদযাপন করতেন। আরবি প্রথার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি ফাতেমীয় খলিফার উপহার দেয়া একটি গহনাখচিত ছাতার নিচে বসে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। রজারের প্রধানমন্ত্রী জর্জ অব অ্যান্টিওক ছিলেন এ সাংস্কৃতিক মিশ্রণের প্রতীক। তিনি একটি গ্রিক-নৃতাত্ত্বিক, যিনি বাইজেন্টাইন প্রশাসনে তার কর্মজীবন শুরু এবং পরে আরবীয় আদালতে কাজ করেছিলেন।

রজার পালেরমোকে রূপান্তর করেছিলেন একটি রাজধানী হিসেবে। সিসিলির রাজা হিসেবে তিনি ২৪ বছর শাসন করেছেন, ১১৩০-৫৪ পর্যন্ত। তার শাসনকালে পালেরমোর দরবারে বিদ্বানদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান ছিল আরব বিদ্বান আবু আবদাল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইদ্রিস আল-ইদ্রিসির জন্য বিখ্যাত ভৌগোলিক treatise কমিশন করা, যিনি ১১৩৮ সালে পালেরমোয় পৌঁছেছিলেন। এটি Tabula Rogeriana বা রজারের বই নামে পরিচিত হয়। এটি ছিল ভূমধ্যসাগরীয় ঐতিহ্য—গ্রিক, লাতিন ও আরবি জ্ঞানচর্চাকে সমন্বয় এবং সংযুক্ত করার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।

একই সময়ে পণ্ডিতরা গ্রিক, আরবি ও লাতিনে কাজ করতে থাকেন। The Almagest আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদ হয়। অনুবাদটি ১১৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হয়। অর্থাৎ জেরার্ডর বিখ্যাত সংস্করণের কয়েক বছর আগে। সিসিলিতে প্রায় একই সময়ে গ্রিক থেকে ইউক্লিডের Elements-এর একটি অনুবাদ হয়। আদেলার্ড মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক চমৎকার চরিত্র। তাকে ইউক্লিডের Elements-এর সঙ্গে পরিচিত করা হয়েছিল বোথিয়াসের অনুবাদের ছোট ছোট টুকরো মাধ্যমে, যা তখন গণিতের পাঠ্যক্রমের ভিত্তি ছিল। প্যারিসে প্রায় ১৪০০ সালের দিকে তৈরি তার Regule abaci-এর একটি পাণ্ডুলিপিতে তাকে আরবি সংখ্যার শিক্ষা দিতে দেখানো হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি আরবি থেকে আল-খোয়ারিজমির জিজ ও আবু মাশারের Introduction to Astrology এবং The Elements-এর অনুবাদ করেন। যখন আদেলার্ড ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন, তিনি আল-খোয়ারিজমির জিজ অনুবাদ করেন। সেক্ষেত্রে আদেলার্ড সম্ভবত বইটি এমন কারো কাছ থেকে পেয়েছিলেন, যিনি স্পেনে ছিলেন অথবা সেখানে তার যোগাযোগ ছিল। সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন পেট্রাস আলফানসো, যিনি উত্তর স্পেনের হুয়েস্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরবি, হিব্রু ও লাতিন ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, লাতিন ভাষা জানতেন এবং সন্দেহাতীতভাবে ইংল্যান্ডে তার সময় ধরে ইংরেজি শিখেছিলেন।

পালেরমো সে সময় বাণিজ্য এমন পথ খুলে দেয়, যার মাধ্যমে জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। এক্ষেত্রে প্রায়ই বণিক ও কূটনীতিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বারো শতকের প্রারম্ভে কয়েকজন পণ্ডিত পিসা ত্যাগ করেন এবং সিরিয়া সফর করেন, সেখানে তারা আরবি ভাষা শেখেন এবং আলী ইবনে আল-আব্বাসের কিতাবুল কামিলের একটি নতুন অনুবাদ করেন। এদিকে জন অব সেভিল অনুবাদ করছিলেন সাবিত ইবনে কুরার বই Book of Talisman। তিনি যে কপি থেকে কাজ করেছিলেন, তা অ্যান্টিওকের একজন পুরুষের মালিকানাধীন ছিল। আদেলার্ড নিজেও ইংল্যান্ডে ফিরে এসে Book of Talismans-এর অনুবাদ করেছিলেন।

আদেলার্ডের সিসিলি সফর এমন একটি সময়ে হয়েছিল, যখন লাতিন সংস্কৃতি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল; দ্বীপের মুসলিম জনগণ খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তর হয়ে উত্তর আফ্রিকায় অভিবাসন করেছিল। যদিও মুসলিম জনগণের সংখ্যা কমে গিয়েছিল, দ্বীপটি তখনো ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়া বিভিন্ন ধরনের মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথ ছিল। ১১৮৪ সালে আন্দালুসিয়ান তীর্থযাত্রী ইবনে জুবায়র মক্কা থেকে বাড়ি ফেরার পথে সিসিলিতে আসেন। তিনি দাবি করেছিলেন শাসক উইলিয়াম আরবি পড়তে ও লিখতে জানতেন। অর্থাৎ লাতিন আধিপত্য সত্ত্বেও সিসিলি তখনো একটি বহুভাষী সংস্কৃতি ছিল।

আদেলার্ডের এক শতাব্দী পরে মাইকেল স্কট ব্যাপকভাবে সফর করেন। মনে করা হয় তিনি ডারহাম, অক্সফোর্ড ও প্যারিসে অধ্যয়ন করেন। ১৮ আগস্ট ১২১৭ সালে তিনি তলেদোয় ছিলেন, কারণ সেই দিনে তিনি আল-বিতরুজির On the Sphere বই অনুবাদে সই ও তারিখ করেছিলেন। তারপর স্কটের মাধ্যমেই সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে ইতালি ও অন্যান্য অঞ্চলে। স্কট আরবি ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন, তিনি স্থানীয় মোজারাবদের সঙ্গে অধ্যয়ন করছিলেন। স্কট নিজেই তেরো শতকের সমৃদ্ধ স্পেন বই ও সৃষ্টিশীল ধারণাগুলোকে ইতালিতে নিয়ে আসার অন্যতম মাধ্যম।

এভাবে পালেরমো থেকে নেপলস, বোলোনিয়া থেকে পিসা, ব্রেসিয়া থেকে পাদুয়া, ভিয়েনা থেকে ভেরোনা, ফ্রাংকফুর্ট থেকে কনস্টানজ, ব্রিনডিসি থেকে জেরুজালেম জ্ঞানের এমন পথচলা দীর্ঘ। শাসক ফ্রেডেরিকের সময় জ্ঞান স্থানান্তরে সুযোগ বাড়িয়েছে। সব ধর্ম ও সংস্কৃতির বিদ্বানরা সেখানে যেতেন। সবচেয়ে প্রতিভাবান ছিলেন লিওনার্ড অব পিসা। তিনি আল-খোয়ারিজমির অ্যালজেব্রা, হিন্দু-আরবি সংখ্যা ও পজিশনাল নোটেশনের সিস্টেমকে পিসার বাণিজ্যিক চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করতে সক্ষম হন। এ সময়ে খ্রিস্টান ও মুসলিম বিদ্বানদের মধ্যে বিভিন্ন বৌদ্ধিক বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা হতো। ভ্রমণকারী বিদ্বানরা, যারা জ্ঞান ও আলোর সন্ধানে অজানায় যাত্রা করেছিলেন, তারা ছিলেন নতুন, সংযুক্ত পৃথিবীতে জ্ঞানের স্থানান্তর এবং রূপান্তরের প্রধান এজেন্ট, শিখতে, শেখাতে ও ধারণা ছড়াতে। পালেরমোর দরবারে ইউরোপে প্রথমবারের মতো ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা যাত্রা করে। বাইজেন্টাইন ও মুসলিম সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যগুলো তাদের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছেছিল, যা আদালতের সংস্কৃতি ও ক্ষমতা প্রকাশের পদ্ধতিতে গভীরভাবে পরিবর্তন আনে। পৃথিবী তখন পরিবর্তন হচ্ছিল। উত্তর ইতালিতে স্বাধীন শহর রাষ্ট্রগুলোর বৃদ্ধি একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিল রেনেসাঁ।

মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক