সালেরনো শহরটি ইতিহাসে বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ্যা, চিকিৎসালয় ও শিক্ষা ক্ষেত্রের জন্য। এটি দক্ষিণ ইতালির একটি প্রাচীন শহর, যা দীর্ঘ সময় ধরে এক চিকিৎসা কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। নবম শতাব্দীর শুরুর দিকেও এ শহরের চিকিৎসাবিদ্যা, চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল অসম্পূর্ণ। এ অসম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র একটি গল্পের মধ্যে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। তা হলো কনস্টানটাইনের গল্প। যিনি ছিলেন একজন আফ্রিকান বণিক। বাণিজ্যের উদ্দেশে তিনি রওনা দিয়েছিলেন সালেরনো শহরে।
এগারো শতকের মাঝামাঝি উত্তর আফ্রিকার ব্যবসায়ী কনস্টানটাইন ইতালির ব্যস্ত বন্দর সালেরনোয় পণ্য পরিবহনের জন্য আসেন। তখন তিনি কোনো কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্থানীয় এক চিকিৎসককে ডাকা হয় তার চিকিৎসার জন্য। তবে চিকিৎসা চলাকালে তিনি (কনস্টানটাইন) চিকিৎসকের অদক্ষতায় এতটাই হতবাক হন যে তিনি নিজেই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠেন। চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ের জন্য এমনকি তার প্রস্রাবের নমুনাও চাননি।
অনেকের মতো কনস্টানটাইনও হয়তো এ অভিজ্ঞতা ভুলে গিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত নিজের দেশে ফিরে যেতেন। কিন্তু কনস্টানটাইন ছিলেন ভিন্নধর্মী মানুষ। তিনি চিন্তা করলেন ভিন্নভাবে। তিনি তখন ভাবলেন কীভাবে এ শহরের চিকিৎসাবিদ্যাকে উন্নত করা যায়। এসব চিন্তার মাধ্যমে ইউরোপীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছিলেন। তিনি সালেরনোয় থেকে যান এবং স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানতে চান সেখানে কী ধরনের চিকিৎসাসংক্রান্ত বই পাওয়া যায়। শহরের মানুষের অস্পষ্টতা তাকে হতবাক করে দেয় এবং তিনি উপলব্ধি করেন, স্থানীয়দের চিকিৎসাজ্ঞান অত্যন্ত সীমিত।
যদি এ ঘটনা ইউরোপের অন্য কোনো শহরে ঘটত, তবে তা হয়তো তেমন কিছু মনে করা হতো না। প্রথম সহস্রাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে পশ্চিম ইউরোপে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নিম্নস্তরের। চিকিৎসকদের সংখ্যা ছিল সীমিত এবং যাদের মধ্যে চিকিৎসা গ্রন্থ পড়া ও বোঝার যোগ্যতা ছিল, তাদের সংখ্যা ছিল আরো কম। অসুস্থ হলে অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য প্রার্থনা, অন্ধ বিশ্বাস ও স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছ থেকে পাওয়া ভেষজ পাতার ওপর ভরসা করত। কিন্তু সালেরনো শহরকে জানা হতো চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত হিসেবে।
তবে কনস্টানটাইন যে সালেরনোয় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, সেটিই ছিল তার জন্য আশীর্বাদ। কারণ সে সময় সালেরনো ইউরোপের সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসাবিদ্যার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। শহরটি সিভিটাস হিপোক্রাটিকা নামে খ্যাত ছিল। অর্থাৎ চিকিৎসকদের পিতাদের শহর। অথচ সালেরনোর চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা পেয়ে কনস্টানটাইন যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, তা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে ইউরোপীয় চিকিৎসা পদ্ধতি আর মুসলিম বিশ্বের উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মধ্যে কত বড় ব্যবধান ছিল। সে সময় মুসলিমরা চিকিৎসাবিদ্যায় রাখে বড় ভূমিকা। আরবি ভাষাভাষী বিশ্বের চিকিৎসাবিদ্যা তখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছিল। সেখানে হাসপাতাল, চিকিৎসা পদ্ধতির নির্দেশিকা, রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম ও বিশেষ চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল। কনস্টানটাইন যখন বুঝতে পারলেন, সালেরনোর চিকিৎসা পদ্ধতি তখনকার ইউরোপের যেকোনো জায়গার চেয়ে উন্নত, তখন তিনি ইউরোপের চিকিৎসাবিদ্যার উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সালেরনোয় অসুস্থ হওয়ার পর কনস্টানটাইন তার নিজ ভূমি কার্থেজে ফিরে যান, যেখানে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন ও চর্চা শুরু করেন। কয়েক বছর পর তিনি আবার সালেরনোতে যাত্রা করেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন বইয়ের একটি বিপুল সংগ্রহ, যা ইউরোপে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন ও চর্চার রূপ বদলে দেয়। সালেরনোকে চিকিৎসা শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সালেরনো শহরের আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা প্রাকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। ইতিহাসবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্লেষণ করেছেন কেন ও কীভাবে সালেরনো চিকিৎসাবিদ্যার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, সে জ্ঞান কোত্থেকে এসেছিল এবং কীভাবে এ ঐতিহ্য সেখানে বিকশিত হয়েছিল। এতে নানা উৎস ও উত্তর রয়েছে। সবচেয়ে সুস্পষ্ট কারণটি হলো সালেরনোর ভৌগোলিক অবস্থান সাগরের পাশের শহর হওয়া, বিশুদ্ধ বাতাস, সহনীয় জলবায়ু, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, স্থানীয় উষ্ণ প্রস্রবণ ও প্রচুর পরিমাণে তাজা স্থানীয় খাদ্য। গোসল ও খাদ্যাভ্যাস তখন চিকিৎসা থেরাপির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
নিজের মাতৃভূমি কার্থেজ ফিরে যাওয়ার পর কনস্টানটাইন মধ্যযুগীয় ইউরোপ ও ইসলামী বিশ্বের চিকিৎসাজ্ঞানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করেছিলেন। কার্থেজে তিনি ইসলামী বিশ্বের সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে বেড়ে ওঠেন। সে সময় ইসলামী পণ্ডিতরা গ্রিক ও রোমান চিকিৎসক হিপোক্রেটিস, গ্যালেন প্রমুখের লেখা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করেছিলেন। কাইরুয়ান নামে উত্তর আফ্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান কেন্দ্রে এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কনস্টানটাইন চিকিৎসাবিদ্যার উন্নত জ্ঞান লাভ করেন। এসব জায়গা থেকে তিনি ইবনে সিনা, আল রাজি, আল মাজুসি, হুনাইন ইবনে ইসহাকের বই পড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর পাণ্ডিত্যে অর্জন করেন। কনস্টানটাইন যখন সালেরনোতে যাত্রা করেন, তখন তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু বই অনুবাদ করেন।
কনস্টানটাইন প্রায় ২০টি গুরুত্বপূর্ণ আরবিতে লেখা চিকিৎসা গ্রন্থ লাতিনে অনুবাদ করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হুনাইন ইবনে ইশহাকের ইসাগোজ, আলী ইবনে আল আব্বাস মাজুসি’র কিতাব আল মালিকিসহ ইসহাক জুদাইউস ও অন্যান্য লেখকের চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে বই। কনস্টানটাইনের এসব অনুবাদ ইউরোপীয় পণ্ডিতদের জন্য উন্নত চিকিৎসাজ্ঞানকে সহজলভ্য করে তোলে। এ অনূদিত গ্রন্থগুলো ইউরোপের চিকিৎসাশিক্ষার মূল পাঠ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।
কনস্টানটাইনের সঙ্গে সালেরনোর আর্চবিশপ আলফানোর সম্পর্ক সালেরনোর চিকিৎসাজ্ঞান বিকাশে এবং এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসাবিদ্যার প্রতি উভয়ের আগ্রহ সালেরনোতে চিকিৎসাবিদ্যায় এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি হয়। সালেরনোর আর্চবিশপ আলফানো শুধু একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, বরং একজন শিক্ষিত পণ্ডিত ছিলেন, যিনি চিকিৎসা, ধর্মতত্ত্ব, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। উভয়েরই লক্ষ্য ছিল সালেরনোর চিকিৎসাজ্ঞানকে উন্নত করা এবং শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করা। আলফার্নো Schola Medica Salernitana-এর একজন সমর্থক ছিলেন এবং কনস্টানটাইনকে তার কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেছিলেন। কনস্টানটাইন আরবি চিকিৎসাগ্রন্থের একটি বিশাল সংগ্রহ নিয়ে সালেরনোতে আসেন এবং সেগুলো লাতিন ভাষায় অনুবাদ করা শুরু করেন।
আলফার্নো কনস্টানটাইনের অনুবাদের কাজে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করেছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আল মাজুসির কিতাব আল মালিকি (প্যানটেগনি হিসেবে অনূদিত)। আলফার্নো কনস্টানটাইনের সঙ্গে মিলিয়ে একটি নতুন লাতিন চিকিৎসা শব্দভাণ্ডার তৈরি করেছিলেন, যা আরবি চিকিৎসা বইয়ের জটিল ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করতে সক্ষম ছিল। ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা হিসেবে আলফার্নোর প্রভাব নিশ্চিত করেছিল যে কনস্টানটাইনের অনুবাদ ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা পায়। মূলত আলফানো নিজেও একজন অনুবাদক ও পণ্ডিত ছিলেন, যিনি নেমেসিয়াসের On the nature of man-এর মতো চিকিৎসা ও দার্শনিক গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন। তারা একসঙ্গে গ্রিক-আরবি চিকিৎসাজ্ঞানকে ইউরোপীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।
তাদের কাজের ভিত্তিতেই ইউরোপে চিকিৎসাবিদ্যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের একটি স্বীকৃত অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সালেরনোর চিকিৎসা ব্যবস্থা এতটাই উন্নত হয়েছিল যে আর্চবিশপ আলফার্নো আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলেছিলেন, সালেরনো তখন চিকিৎসা শাস্ত্রে এতটাই উন্নত যে কোনো রোগই সেখানে স্থায়ী হতে পারে না।
রুদ্র ইকবাল: প্রতিবেদক, বণিক বার্তা









