জ্ঞানের আদানপ্রদান পৃথিবীর নানা জাতি ও সভ্যতার মাঝে সবসময় এক বুদ্ধিবৃত্তিক সেতুর জন্ম দিয়েছে, যার শক্তিশালী স্তম্ভে ভর করে দাঁড়িয়েছে উন্নত উদ্ভাবনী সম্ভাবনা। জ্ঞানের অবারিত জোয়ারকে ধরিত্রী বক্ষে বইয়ে নিতে সর্বদা অগ্রগামী হয়েছে জ্ঞানপিপাসু জাতি।

মধ‍্যযুগের তলেদোর ইতিহাসের পাতায় এমনই এক নান্দনিক জ্ঞান বিজ্ঞানচর্চার মেলবন্ধনের নির্যাস মিলবে। উল্লেখ্য, মধ‍্যযুগে যখন ইউরোপে প্রাচীন গ্রিক বিদ্যার উপাদানগুলো বিস্মৃত হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই আরব জাতি৷ গ্রিক পণ্ডিতদের লেখাকে সংরক্ষণ এবং অনুসরণের মধ্য দিয়ে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিল নিজস্ব বুদ্ধিভিত্তিক গবেষণা ও চিন্তাচেতনার মনন।

গ্রিক পণ্ডিত প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ইউক্লিড, পিথাগোরাসের মতো জ্ঞানীদের প্রবর্তিত দর্শনমূলক ধারণার ভিতই পরবর্তী সময়ে ইউরোপ পুনর্নবীকরণে ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।৷ জ্ঞানের এ অবারিত আদানপ্রদান শুধু গ্রিক সভ্যতার অবদানে নয়, বরং তাবৎ দুনিয়ার চিন্তাভাবনা সৃজনশীলতায় বৈপ্লবিক প্রভাব ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল, যা সম্ভব হয়েছিল কেবল গ্রিক চিন্তাচেতনা নয় বরং আরবদের নিজস্ব চিন্তা বিশ্লেষণের সন্নিবেশের মাধ্যমেও।

তলেদোর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১০৮৫ সালের খ্রিস্টান রিকনকুইস্তা, যেখানে রাজা আলফোনসো ষষ্ঠ মুসলিম শাসকদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে পুনরায় খ্রিস্ট শাসন জারি করেন। এ পরিবর্তনই শহরটিকে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগতভাবে নতুন করে বিন্যস্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। রিকনকুইস্তার পূর্ববর্তী সময়ে ইসলামী শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে বিবেচিত এ তলেদোর মুসলিম শিক্ষাবিদরা আরবি ও লাতিন ভাষায় ছিল পারদর্শী। এ ভাষার ক্ষুরধার হাতিয়ারই ছিল তাদের জ্ঞানচর্চা বিকাশের অদ্ব্যর্থ অস্ত্র।

কর্ডোবা ও তলোদো একটা সময়ে মুসলিম-খ্রিস্টান বিশ্বের শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।৷তলেদো ছিল ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত। এ বৈশিষ্ট্যই তাকে জ্ঞানচর্চা ও কারিগরি আবিষ্কার এবং কৌশল চর্চার অন্যতম দাবিদার করে তোলে। ১০৮৫ সালে এটি খ্রিস্ট অধীনে এলে এখানে ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটে। তখন ইতালির ক্রেমানো থেকে জোতির্বিদ্যায় আসক্ত তরুণ জেরার্ড আলমাজেস্ট" গ্রন্থের খোঁজে এ তলেদোয় এসে হাজির হয়। যেটির প্রতি ওর আগ্রহের ভ্রূণ জন্মেছিল শিক্ষনবিশ পর্যায়ে ববি মঠের সজ্জিত টলেমি, বোহটিয়াম গ্রন্থগর্ভে। জেরার্ডের আরবি ও লাতিন ভাষায় করা অনুবাদশৈলী ইউরোপজুড়ে জ্ঞানচর্চা ও বিকাশের অভাবনীয় প্রসার ঘটায়, যা পরবর্তীকালে সেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা ও গবেষণার এক শক্ত ভিত গঠন করে। জেরার্ড, প্লেটো, গ্যালেন ও টলেমির কাজের বিশ্লেষণের সঙ্গে গ্রিক জ্ঞান ও ইসলামী চেতনার মিশেলে ইউরোপে জ্ঞানচর্চায় জন্ম নেয় এক নতুন বেগবান স্রোতধারা।

সে সময়ে তলেদো মুসলিম শাসিত হলেও সেখানে মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি গবেষকরা একত্রেই বসবাস করতেন। তারা সবাই নিজ নিজ ধর্মীয় সংস্কৃতি বিশ্বাস বজায় রাখতেন এবং স্বীয় চিন্তাচেতনা আদানপ্রদানে উদার ছিলেন, সৃষ্টিশীলতা ও জ্ঞান বিকাশের জন্য যা একটি অন্যতম প্রধান শর্ত। তারা তাদের প্রাচীন গ্রন্থগুলোর লাতিন অনুবাদ ও অধ্যয়নকে উৎসাহিত করতেন, যা সাধারণের মাঝে জ্ঞানের বিচ্ছুরণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ধর্ম শিক্ষার সঙ্গে অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থ ও জ্ঞানবিষয়ক অধ্যয়নের প্রবনতাও ছিল লক্ষণীয়। গবেষণার ক্ষেত্রে তারা গ্রিক সাহিত্য ও বিজ্ঞানের কাজগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদে তৎপর ছিলেন বেশি। জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে প্রকৌশলী শাস্ত্র, সাহিত্য থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ভূয়সী প্রমাণ বিদ্যমান।

জেরার্ড থেকে শুরু করে আল জারকালি ও মার্ক এদের সবার জ্ঞানচর্চাকে এক সুতোয় মিলিয়ে নিলে তাদের জ্ঞানচর্চা বিকাশকে মুক্তো দানা সজ্জিত মালা বলেই মনে হবে।৷তারা গ্রিক ভাষার বিভিন্ন মৌলিক দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বই আরবিতে অনুবাদের মাধ্যমে জ্ঞানের এ দুই শাখায় নবজাগরণের ধূমকেতু আনয়ন করেছিলেন। সমৃদ্ধ এসব অনুবাদ শুধুই গ্রিক যুগের ইতিহাসের অনুষঙ্গ এমন কিন্তু নয়, বরং পরবর্তী সময়ে তা ইউরোপীয় বিজ্ঞান স্তরে এক যুগান্তর পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। আদোতে জেরার্ডের করা আরবি ভাষার সব অনুবাদ বিজ্ঞান ও দর্শনে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল। আরবি ভাষান্তরে করা গ্রিক সৃজনগুলো মুসলিম সমাজে হয়ে উঠেছিল আরো ব্যাপক বিস্তৃত।৷ এসবের মাঝে গণিত, চিকিৎসা, দর্শনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

toledo

১০২৯ সালে তলেদোয় তৈরি করা অ্যাস্ট্রোল্যাব ছবি: দ্য ম্যাপ অব নলেজ

প্রসঙ্গত, শিক্ষক ও লেখক আবু সাঈদ রচিত Books of the catagories of nations-এর কথা চলে আসে, যার মূল‍্যমান বিচার করলে তা আল নাদিমের fihrist-এর সম্পূরক। সাঈদ আন্দালুসই সে ব্যক্তি, যিনি কিনা বিজ্ঞানচর্চা ও অবদানের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর মানুষের মাঝে বিভাজন সরলরেখা টেনে নিয়েছেন। সাঈদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈজ্ঞানিক যন্ত্র প্রস্তুতে পারঙ্গম আল জারকালি কর্তৃক উদ্ভাবিত জ‍্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের যন্ত্র সাফাইয়া ও মার্বেল ঘড়ি ইতিহাসে তাই চিরভাস্বর।

আরবদের জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারটা ছিল তারা গ্রিক বিদ্যাকে কেবল সংরক্ষণ করে নয়, একে আরো বিশদ বিশ্লেষণ ও উন্নতীকরণে সচেষ্ট ছিল। গ্রিক পণ্ডিতদের কাজের গভীর বিশ্লেষণসহ নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার, সেসবের সংশোধনের চেষ্টায় ছিল অগ্রগামী। দার্শনিক তত্ত্বগুলোকে উন্নতীকরণের সঙ্গে নিজেদের চিন্তাভাবনা যোগ করে এগুলোকে আরো স্পষ্ট ব্যাখা প্রদানের উপযুক্ততা দান করাই তাদের অন্যতম সাফল্য ছিল, যা পরে আরো নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণার রুদ্ধদ্বার উন্মোচন করেছে। এটি গ্রিক তত্ত্বকে দিয়েছে পরিপূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে দান করেছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবেই নানা গবেষণার ভিত্তিতে পরে জারকালি রচিত প্রবন্ধে বুধ গ্রহের কক্ষপথকে গোলাকারের বদলে উপবৃত্তাকার বলে দাবি করা হয়। আবার ষোলো শতকে এ যুক্তিতে তাল মিলিয়ে জোহানেস কেপলার মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের বেলায়ও একই দাবি উত্থাপন করেন।

আরবদের গ্রিক বিজ্ঞান ও দর্শন সমৃদ্ধ হওয়ায় পৃথিবীজুড়ে যে বৃহৎ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন এসেছিল তার প্রমাণ, তলেদো আলফানসো অব কাস্তিলের কাছে হাতবদলের পর জারকালিসহ অনেক মুসলিম তখন মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে বিশেষ করে গ্রানাডায় স্থানান্তর হন। তা সত্ত্বেও তাদের জ্ঞানচর্চা আন্দালুসিয়ার খ্রিস্টানদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনটা বলছি কারণ, হুদ পরিবারের শেষ শাসক আলফোনসোর সিংহাসন গ্রহণের পরেও খ্রিস্ট রাজার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক এমন ইঙ্গিতই বহন করে।

জ্যোতির্বিদ্যা গ্রন্থের সংগ্রাহক মাইকেল তড়োজোনার বিশপ, যিনি হুগো সাংক্টালেন্সিসকে পছন্দের তালিকায় রেখেছিলেন কেবল বানু হুদ পাঠাগার থেকে পাঠ্যবই অনুবাদের জন্য। হুগো সে সিদ্ধান্তের মান রেখেছিলেন আল খোয়ারিজমির ‘‌জিজ’-এর একটি টীকা পত্রের পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে। উল্লেখ্য, তৎকালীন সারাগোসা শহর শাসন করা বানু হুদ পরিবারে গড়ে ওঠা বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের বিশাল সমৃদ্ধ সংগ্রহশালার কথা ইতিহাসে বহুল আলোচিত বিষয়। পরে আলফোনসোর কাছে তাদের জমি ফিরিয়ে দিলেও হুদরা তলেদোর ক্যাথেড্রাল এলাকায় স্থানান্তর হওয়ার সময়ে তাদের বইগুলোকে ঠিকই বহন করেছিলেন, যেগুলো অনুবাদকারীদের হাতে সহজেই পৌঁছেছিল আর এতেই জেরার্ড অব ক্রেমানো সে গ্রন্থাগার থেকে এমন কিছু পাঠ্যবইয়ের অনুবাদ করেছিলেন, যা আল মুতামিন তার "দ্য পারফেকশন" বইয়ে ব্যবহার করেছিলেন।

তলেদোতে খ্রিস্ট শাসনাধীন হওয়ার পর ক্যাথলিক আধিপত্য চালু হলে জেরার্ড তার জ্ঞানচর্চা ও বিকাশের তাগিদে সেখানে আবারো ফেরেন এবং আরবি ভাষায় অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ সম্পন্ন করেন। আরবি থেকে লাতিন ভাষা রূপান্তরের এ প্রক্রিয়া জ্ঞানের রথযাত্রাকে এক রঙধনু পথে ছুটিয়ে নিয়েছিল। এ কাজগুলো মূলত ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের জন্য ছিল অমূল্য আকর। লাতিন ভাষায় অনূদিত গ্রন্থগুলো ইউরোপীয় রেনেসাঁ সময়ে নয়া দার্শনিক চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পথ সুগম করে তোলে। এসবকে অবলম্বন করেই ইউরোপীয়রা প্রাচীন গ্রিক ও আরবের জ্ঞানের খুঁটিকে পুনরায় গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে আধুনিক চিন্তা গবেষণার নতুন রূপ দান করে।

আরবি ভাষায় দক্ষ মার্কের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্যালেন ও চিকিৎসা শাস্ত্র। বিদেশে অধ্যয়ন শেষে তিনি নিজ শহরের বুকে যখন গ্যালেনের গ্রন্থগুলো অনুবাদ করতে শুরু করেন, তখন সে সম্পর্কে পশ্চিমারা মোটেও ওয়াকিবহাল ছিল না। তেরো শতকের দিকে গ্যালেনের কাজগুলো ব্যাপকভাবে পুনর্জীবিত হয়েছিল।

লাতিন, আরবিতে পারঙ্গম জেরার্ড অনূদিত ২১টা গ্রন্থের মাঝে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী কাজ ছিল ইবনে সিনার ক্যানন, যা গ্যালেনের চিকিৎসার সংশ্লেষণ হিসেবে বিবেচ‍্য। এটি মধ্যযুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় চিকিৎসা পাঠ্যপুস্তক। এসব অনুবাদ চিকিৎসা শাস্ত্রে এনেছিল মহাবিপ্লব। এখানে ইবনে সিনাকে স্মরণ করা আবশ‍্যক। মধ্যযুগীয় এ শ্রেষ্ঠ আরবি চিন্তাবিদ ইবনে সিনা, যাকে গ্যালেনের চিকিৎসার যৌক্তিক পুনর্গঠনের দাবি করা হয়। যার দৃষ্টান্ত তিনি তার এ পাঁচ খণ্ডের ক্যানন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। জেরার্ড কর্তৃক অনূদিত আল রাজির আরো কিছু অনুবাদকৃত বই পরে ইউরোপে সংগৃহীত করে মুদ্রিত করা হয়েছিল।

মূলত আরবরা যা-ই শিখেছিল তা-ই ইউরোপীয়রা গ্রহণ করে তাদের গবেষণার মূলধন হিসেবে ব্যবহার করেছিল, যা সমগ্র পৃথিবীর জ্ঞানচর্চা ইতিহাসের অগ্রযাত্রা ও অগ্রগতির জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদানপ্রদানের অবাধ প্রবাহ ইউরোপ ও আরব বিশ্বের জ্ঞান পরিমণ্ডলে বয়েছে সমৃদ্ধির সুবাতাস। ইসলাম ধর্মের অধীনে থেকেও মোজারেবরা তাদের নিজস্ব সমাজ গঠন ও জ্ঞান বিকাশে সচেষ্ট ছিলেন, তবে ক্যাথলিক শাসন আসার পর তাদের পরিপূর্ণ বিকাশের বিপরীত রূপটাও প্রকটিত হয়েছিল।

তলেদো খ্রিস্ট শাসনাধীন হলে ক্যাথলিকরা তাদের জ্ঞান বিস্তারের সঙ্গে ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হয়,৷ যার প্রমাণ ক্রেমন অব তলেদো। ১০০০-১১৫০-এর মাঝে তলেদোতে ঘটে যাওয়া শিক্ষাগত বিপ্লব ও প্রসার ইউরোপীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, তখন শিক্ষা বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক ছিল"তলেদো স্কুল অব ট্রান্সলেটর্স প্রতিষ্ঠা। আর্চ বিশপ রেমন্ড অব তলেদোর পৃষ্ঠপোষকতায় পণ্ডিতরা জেরার্ড, মাইকেল স্কট অঙ্কন, চিকিৎসা, গণিত, দর্শন শাস্ত্রের অনুবাদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যেগুলো গুণগত মানে অ্যারিস্টটল, গ্যালেন, টলেমি ও ইবনে সিনার মতো গ্রন্থের সমতুল‍্য। আবার এ তলেদোর পুনর্দখল খ্রিস্টান রাজাদের কৌশলগত আগ্রহের সঙ্গে ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। যারা একই সঙ্গে শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সঙ্গে তাদের শাসনক্ষমতাকেও সুসংহত এবং সমুন্নত রাখতে চেয়েছিল,৷ যা পরে প্রশাসন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে একই রেখায় জুড়ে দিতে সক্ষম ছিল।

তলেদোর জ্ঞানচর্চা বিকাশের পুরোটা সময়ে খণ্ডন করলে দেখা যাবে, গবেষণার ক্ষেত্রে তারা মূলত গ্রিক সাহিত্য ও বিজ্ঞানের কাজগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদে তৎপর ছিলেন বেশি। জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে প্রকৌশল শাস্ত্র, সাহিত্য থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ভূয়সী প্রমাণ বিদ্যমান। তারা তাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শিতায় যত্নশীল ছিলেন। তারা গ্রিক ভাষার বিভিন্ন মৌলিক দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক বই আরবিতে অনুবাদের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও দর্শনের জগতে এক নতুন জাগরণ ঘটিয়েছিলেন।

সমৃদ্ধ এসব অনুবাদ শুধু যে গ্রিক যুগের ইতিহাসের অনুষঙ্গ, এমন কিন্তু নয় বরং পরে তা ইউরোপীয় বিজ্ঞান স্তরে এক যুগান্তর পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অনুবাদ কাজ সম্পন্ন করার পর তারা সেগুলোয় নিজস্ব পণ্ডিতদের নামের লেবেল সেঁটে দিতেন, যা স্বভাবতই মুসলিমদের সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞান আদানপ্রদানের বিশ্বস্ততার পথে একটি দূরত্ব তৈরি করে নেয়। তাদের এমন নীতিতে মুসলিম শাসকরা আশঙ্কা করছিলেন, এমন করে তাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হয়তো বা উত্তর সীমান্তে ধাবিত হতে পারে। তাই হয়তো একাদশ শতাব্দীর এক উৎসে বর্ণিত আন্দালুসীয় বাজার সুপারভাইজার ইহুদি খ্রিস্টানদের বৈজ্ঞানিক কাজ বিক্রি না করার অধ্যাদেশ জারি করেছিল।

তলেদোর আঁচলে এই যে বিস্তীর্ণ কালজুড়ে শিক্ষা বিপ্লব তা শুধু আঞ্চলিক বুদ্ধিবৃত্তিকদের জন্য আবশ্যক ছিল ভাবলে ভুল হবে। বরং দূরদর্শিতায় বিচার করলে দেখা যাবে এর প্রভাব ছিল ইউরোপজুড়ে৷বিস্মৃত হয়ে যাওয়া প্রাচীন গ্রন্থগুলোর পুনঃপ্রবর্তন। সেই সঙ্গে দার্শনিক উদ্ভাবনের কৌশলী জ্ঞান বিকাশের অগ্নিস্ফূরণ ইউরোপীয়দের মাঝে তাদের তলিয়ে যাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো ফিরিয়ে আনার যে এক অত্যাবশ্যক মাধ্যম ছিল, তা বুঝে নেয়া মোটেও কঠিন নয়। এ জ্ঞান বিনিময়ের জাদুর ছড়ির ঘূর্ণন ইউরোপীয় রেনেসাঁসের সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর গাঁথার মধ্য দিয়ে তৎকালীন মানব সাংস্কৃতিক একত্রীকরণের গুরুত্বের দিকটাও যে নির্ণয় করে নিয়েছিল এ কথাও অনস্বীকার্য।

সোনিয়া তাসনিম: লেখক