জ্যৈষ্ঠের রোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আচারের বৈয়ামগুলো সরিয়ে নাও ছাদের ছায়াতল থেকে। হাতে একটা মলাট ছেঁড়া বই। এত দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, গল্প না উপন্যাস। নেটে ঢাকা বৈয়ামগুলোর একটা একটু সরিয়ে বেতের মোড়াটা টেনে নিয়ে বসো বইয়ের পাতায়। পাশে অবহেলায় পড়ে থাকে একটা লাঠি। এই কাঠফাটা রোদে কাকেরও যেন শক্তি নেই তোমার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার। তাই লাঠিটা পায়ের কাছে বসে শরীরে ছায়ার লালিমা মাখে।
কানের শাসন ভেঙে লাফিয়ে পড়া চুলগুলোকে এক হাতে গুঁজে নিতে নিতে অন্য হাতে পাতা ওল্টাও। কত পরিচিত এ দৃশ্যগুলো আমার কাছে। কত দিন দেখি না। শুধু রঙ মরা শাড়িটায় কেমন বেখাপ্পা লাগে তোমাকে। অসহ্য গরমে হালকা হয়ে যাওয়া আঁচলের শাসনে উঁকি মারে তোমার পিতল রঙা শরীর। আমি জানি, এখন বিন্দু বিন্দু জলকণায় তোমার সারাটা মুখ পরিপূর্ণ। লাল হয়ে উঠেছে সুডোল দুটো হনু। দূর থেকে এত কিছু দেখার কোনো উপায় নেই। শুধু উল্টো আঁচলের শাড়িতে তোমাকে পুরোদস্তুর গেরস্তবাড়ির গিন্নি লাগে।
দূর থেকে দেখি আর ভাবি। মনে মনে কথার ডালা সাজাই। এই বুঝি উঠে এসে বসো আমার সামনে। আঁচলে আঙুল জড়িয়ে লাজুক দুটো চোখ তুলে তাকাও আমার দিকে। আর প্রশ্ন করো চোখের ইশারায়। যদিও এখানে তোমার আসা সম্ভব নয় কোনোভাবেই। মধ্যে সময়ের দেয়াল আর কয়েকটি দালানের ছাদ। তার পরও অসম্ভবের বায়না ধরে বসে থাকি জানালার পাশে। খটখটে রোদে পুড়ছে চারিধার। তার মাঝেও চোরাবাতাসে উড়ছে তোমার চুল। তোমার প্রতি বাতাসের এ পক্ষপাত চিরটি কালের।
আচার পাহারা দিতে দিতে তোমার চোখ যায় আম গাছটার ডালে। তুমি ঘাড় বাঁকিয়ে সুচিত্রা সেনের মতো করে কী যেন দেখো। হয়তো কোনো পাখির বাসা বাঁধার দৃশ্য, নয়তো পাকা আমের থোড়া। তোমার নিমগ্নতায় আমি ডুব দিই। তাতেই বুঝি কাজ হয়। তুমি আনমনে এসে বসো আমার জানালার চৌকাঠে। উত্সুক দুটো চোখে প্রশ্নের বাণ আর সজল দুটো ঠোঁটে মায়ার কাঁপুনি। তুমি জানালার রডগুলোর ওপারে। মনে হয়, হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলব তোমাকে। অথচ তোমার আর আমার মাঝে কত শূন্যতার দূরত্ব, সে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। হাসছ, ভাবছ? এ কেমন হেঁয়ালি! তোমাদের গলির মুখে কাঁঠাল গাছের ছায়ায় যে টিনশেডের বাড়িটা, প্রতিদিন সাতসকালে দেখো একটা মানুষ তাড়া খাওয়া বিড়ালের মতো গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে পড়ে, ত্রিসন্ধ্যায় ক্লান্ত মুটের মতো কাঁধের ঝোলাটা টেনে কোনো প্রকারে বাড়ি ফেরে— ভাবছ আমাকে! ধুস, এ আমি হতে যাব কেন?
আমার আমিটা সে অনেক দূরে পড়ে আছে। তুমি তখন বয়ঃসন্ধির মধ্যগগনে; ঠিক দুপুরের রোদের মতো ঝলমল করছ, হাবুডুবু খাচ্ছ আয়নায়— নিজের রূপে নিজেই। স্কুলে যেতে যেতে পথে কটাক্ষের বন্যা বইয়ে দাও। তাতে হাবুডুবু খেয়ে মরে পাড়ার রাস্কেলগুলো। সেই তুমিই হঠাত্ কী ভেবে পাড়ার এক বখাটে ছোড়াকে ডেকে এনে তার হাতে গুঁজে দিলে গোলাপ নয়, প্রেমপত্র নয়— জীবন্ত একটি মানুষের হূদপিণ্ড। সেই থেকে গোলমালের শুরু। ছোড়াটা ওই বাসায় থাকত। তার দস্যিপনায় তোমাদের সবার ওষ্ঠাগত প্রাণ। রাত-বিরাতে ওর খোঁজে পুলিশ এসে হানা দেয়। ভয় নেই, শঙ্কা নেই। দড়ি ছেঁড়া মোষের মতো কেবল ছোটে আর ছোটে। মাঝরাতে ঘুম না এলে জানালায় এসে দাঁড়িয়ে দেখো, কারা যেন বড় রাস্তার ফুটপাতে বসে চিকা মারছে। তুমি বেশ বোঝো, কালো লিকলিকে যে ছেলেটা স্বৈরাচারীর দীর্ঘ ঈ-কারে রঙ চাপাচ্ছে, সে আর কেউ নয়, তোমারই মনোভূমির জমিন্দার। আর আমি আমার ভালোবাসাকে ই-টাইপের তিনতলায় জমা রেখে নিশ্চিন্তে দেয়ালে কবজি নাচাই আর ভাবি, হে ঈশ্বর, ওর চোখে আজ আর ঘুম দিও না। ও দেখুক আমার দুঃসাহসের স্ফুরণ।
তত দিনে হাওয়ায় তোমার সুরভি ভাসে। ভিনদেশী বণিকেরা এসে ভেড়ে তোমাদের ঘাটে। ছেলেটা তোমাকে আগলে রাখে বুকের ভেতরে। অন্য পাড়ার ছেলেরা এলে জর্দার কৌটো মেরে উড়িয়ে দেয়। কী সাহস— তুমি মুগ্ধ হও। তুমি আরো মুগ্ধ হয়েছিলে ছেলেটার ঠোঁটে প্রথম তামাকের শলাটি দেখে। তোমাকে তন্দ্রায় ডুবিয়ে দিয়েছিল নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসা গোল গোল শুভ্র ধোঁয়ার কুণ্ডলী। তুমি অ্যাডভেঞ্চার বড় ভালো পাও। ক্লাস শেষে তুমি লুকিয়ে চলে আসো পানির ট্যাংকির আড়ালে। পুরোটা বিকাল কাটে তোমার উষ্ণতায় ভিজে ভিজে। ফিরে যাও ঠোঁটে নিয়ে ফাইভ ফিফটির গন্ধ। আর যেদিন তুমি আসো না, তৃষিত চাতকের মতো চেয়ে থাকি পুরোটা বিকাল। রাতটাও শুকনো পাতার মতো ঝুরঝুর হয়ে ঝরে পড়ে হাতের মুঠো থেকে।
প্রেম বস্তুটা কী, তা বুঝে ওঠার আগেই আবিষ্কার করে ফেলি, আমি ডুবন্ত নাবিক। তুমি ছাড়া একটা দিন যেন মৃত্যুর সমান। কৈশোরের একেবারে কুতুকুতু প্রেম আরকি। এখনো নিজের অজান্তে হেসে উঠি সেসব দিনগুলো ভেবে। কখনো মনে হয় বাড়াবাড়ি, কখনো অবাক হই নিজের দুঃসাহসে। প্রেমের ভেতরে সেঁধিয়ে যায় রাজনীতি বা রাজনীতিতে এসে পড়ে প্রেমের বন্দরে।
তোমার দেশের রাজা তখন একজন কবি। বড় ভালো মানুষ(!) তিনি। তাকে দেখে সবাই জয়ধ্বনি দেয়। কেবল ওই ছেলেটার মতো কয়েকটা ‘রেজিল পোলাপাইন’ তাকে নিয়ে মশকরা করে। মিছিল হয়, দেয়ালের পর দেয়াল লক্ষ লক্ষ স্লোগানে আর্তনাদ করে ওঠে, পথে পথে জলকামান, ভোর হয় পত্রিকার পাতায় রক্তাক্ত লাশের উত্সব ছড়িয়ে। সে বড় ভয়াবহ দিন। কবিরাও তো মানুষ। তাদেরও রাগ আছে, ক্ষোভ... লিপ্সা... কাম...। রাজা ক্রুদ্ধ হন। এক সকাল কিংবা ভোরে রাজার লাঠিয়াল এসে ধরে নিয়ে যায় ছেলেটিকে। এরই মধ্যে তোমার কন্যাদায়গ্রস্ত ভীরু করণিক পিতা উত্কণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। এমন রাজকন্যার মতো মেয়েকে আগলে রাখার শক্তি তার কই। একদিন তোমাদের বাসায় ক্যাসেটের সানাই বেজে উঠল। কশা করে মাংস রাঁধা হলো, সঙ্গে সরষে ইলিশ। খুব সামান্য আয়োজনে শেষ হলো অনুষ্ঠানটা। বেশি লোক ডাকা হলো না। পাছে তোমার-আমার দুটো কৈশোর হূদয়ের সেতুবন্ধ যদি জানাজানি হয়ে যায়। টুকটুকে এক কিশোরী বধূ ছোট্ট গাড়িটার উইন্ডশিল্ডে নাক ঠেকিয়ে চলে যায়। পাড়ার লোকজন কোরমা-পোলাও না খাওয়ার আফসোস নিয়ে কথা বলে। আমাদের প্রসঙ্গ আর ওদের আলোচনায় আসে না। সবাই ভুলে যায় তোমার-আমার চ্যাপ্টার।
তুমি হয়তো তত দিনে কোনো যুবকের বুকে দ্রবীভূত হয়ে গেছ। স্বপ্ন দেখছ সাজানো একটা সংসারের। নতুন টব কিনে লাগিয়েছ নয়নতারার চারা। আমি এই জেল থেকে ওই জেল। ক’দিনের জন্য ছাড়া পাই। গা ঢাকা দিই। আবার গরাদ আমায় ডাকে। এত কিছু হয়তো ভালো লাগেনি কবির। কবি শেষ ফয়সালার ছক কাটলেন। একদিন থানার গাড়ি এসে থামে ভুতুর দোকানের সামনে। দুজন সাদা পোশাকের পুলিশ দু’হাতের পাখনা ধরে একটা আধন্যাংটা ছেলেকে ছুড়ে ফেলে দেয় রাস্তার পাশে।
কী হয়েছিল তোমার? বছর না ঘুরতেই চলে এলে একদিন। আমি তখন রোজ দুপুরে দুজনের কোলে চেপে বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গাটুকুতে এসে বসি। রোদে একটু একটু করে পা-পিঠের ঘা শুকায়। তুমি ব্যালকনির গ্রিল আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি তাকিয়ে থাকি মাটির দিকে। যন্ত্রণার নদীগুলোয় ধীরে ধীরে ভাটা লাগে। শুকিয়ে আসে কবির মাংস খুঁটিয়ে তোলা বর্ণমালাগুলো। শুকিয়ে যাই আমিও। শুকাতে শুকাতে নিঃশেষ...। আমার পড়ে থাকা নিথর দেহে আরেকটি পরজীবী সত্তা এসে বাসা বাঁধে। সে এখন আমার হয়ে খাটে। আমার পরিবারের লোকের মুখে খাবার তুলে দেয়। অফিসে বসের ঝাড়িতে ভয়ে কাঁপে। সাতসকালে তাকেই তুমি দেখো তাড়া খাওয়া বিড়ালের মতো গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে পড়তে, ত্রিসন্ধ্যায় ক্লান্ত মুটের মতো কাঁধের ঝোলাটা টেনে কোনো প্রকারে বাড়ি ফিরতে। এভাবেই সে হেঁটে হেঁটে পুরো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে ফেলেছে কয়েকবার। এ বড় দীর্ঘ পথ। এত হেঁটে সে আজ বড় ক্লান্ত, বড় তৃষ্ণার্ত এখন। একফোঁটা জল হবে? তোমার ঠোঁটে আগে কত বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা লেগে থাকত। রোজ বিকালে একটা চাতক পাখি এসে চুষে চুষে খেত। আজ হবে একফোঁটা জল?






