সাহিত্যমাধ্যম হিসেবে বাংলা ছোটগল্পের সাফল্য বিস্ময়কর। এ ভাষায় লেখা হয়েছে অসংখ্য শিল্পসফল ছোটগল্প। এর কোনো কোনোটি আমাদের স্মৃতিতে হানা দেয় প্রতিদিন, কখনো তাত্ক্ষণিকভাবে উঁকি দিয়ে যায় কোনো কাহিনী, কোনোটি দিনযাপনের ভাষ্যকার। তেমন কিছু ছোটগল্প নিয়ে এ ধারাবাহিক—
‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ প্রতিবার পড়ার পরেই মনে হয়, নির্দয়তার একেবারে চূড়ান্ত! সাহিত্যিক ভাষায় চোখের কোণে দরদ উত্থলে পড়া যে রাবীন্দ্রিকতা সাধারণত ‘রোমান্টিকতা’র ধুয়ো তুলে স্মরণে রাখি, তার খুব বিপরীত। যেমন এই একটি স্বাভাবিক ও স্থির বাক্য: ‘একবার ঝপ করিয়া একটি শব্দ কিন্তু বর্ষার পদ্মাতীরে এমন শব্দ কত শোনা যায়।’ ‘খোকাবাবু প্রত্যাবর্তনে’র খোকা পদ্মায় পড়ল, তখন তার চাকর রাইচরণ কদম ফুল তুলছিল!
‘হিতবাদী’ পর্ব শেষ হওয়ার পরে ‘সাধনা’য় রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্প ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’। ১২৯৮ বঙ্গাব্দে লেখা সপ্তম গল্প; এ বছর আরো চারটি গল্প লিখেছেন। মোট ১১টি। রবীন্দ্রনাথের গল্প লেখার সূচনার বছর। তাঁর বয়েস সবে তিরিশ পেরুল। শিলাইদহে এসেছেন। অগ্রহায়ণের ‘সাধনা’য় প্রকাশিত এই গল্প যদি কার্তিকে লেখা হয়ে থাকে, তা হলে এ সময়ে শিলাইদহ থেকে ভাইঝি ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতে ‘খোকাবাবু প্রত্যাবর্তনে’র প্রকৃতির বর্ণনা মিল পাওয়া যায়, আবার গল্প বর্ণনায় সেই প্রকৃতিতে অমিলও কিছু কম নেই: ‘পাড়াগাঁয়ে এলে আমি মানুষকে স্বতন্ত্র মানুষভাবে দেখি নে— যেমন নানা দেশ দিয়ে নদী চলেছে, মানুষের স্রোতও তেমনি কলরব-সহকারে গাছপালা গ্রাম নগরের মধ্য দিয়ে এঁকে বেঁকে চিরকাল ধরে চলেছে— এ আর ফুরোয় না।’ অথবা, ‘দুপুর বেলার নিস্তব্ধতার মধ্যে যখন কোনো রাখাল দূর থেকে ঊর্ধ্ব কণ্ঠে তার সঙ্গীকে ডাক দেয়, এবং একটা নৌকো ছপ্ ছপ্ শব্দ করে ঘরের দিকে ফিরে যায়, এবং মেয়েরা ঘড়া দিয়ে জল ঠেলে তারই ছল্ছল্ শব্দ ওঠে, তার সঙ্গে মধ্যাহ্নপ্রকৃতির অনির্দিষ্ট ধ্বনি—’ অথবা, ‘এই শোন্ মাঠে চাষা গান গাচ্ছে, জেলে ডিঙি ভেসে চলেছে, বেলা যাচ্ছে, রৌদ্র ক্রমেই বেড়ে উঠছে— ঘাটে কেউ স্নান করছে, কেউ জল নিয়ে যাচ্ছে— এমনি করে এই শান্তিময়ী নদীর দুই তীরে গ্রামের মধ্যে গাছের ছায়ায় শত শত বত্সর গুন গুন শব্দ করতে করতে ছুটে চলেছে— এবং সকলের মধ্যে একটা করুণ ধ্বনি জেগে উঠছে: আই গো অন ফর এভার!’ [ছিন্ন পত্রাবলী ৩৪]
অনুকূলের, এক সময়ে তার চাকর ছিল রাইচরণ, (তাকে কোলেপিঠে করে বড় করেছে) এখন তাঁর ছেলের। এখানে নদীর তীরে বেড়াতে যায়। তার আগে যে পদ্মার বর্ণনা ‘ছিন্নপত্রাবলী’র একেবারেই বিপরীত: ‘বর্ষাকাল আসিল। ক্ষুধিত পদ্মা উদ্যান গ্রাম শস্যক্ষেত্র এক-এক গ্রাসে মুখে পুরিতে লাগিল। বালুকাচরের কাশবন এবং বনঝাউ জলে ডুবিয়া গেল। পাড়-ভাঙার অবিশ্রাম ঝুপঝাপ শব্দ এবং জলের গর্জনে দশ দিক মুখরিত হইয়া উঠিল, এবং দ্রুতবেগে ধাবমান ফেনারাশি নদীর তীব্রগতিকে প্রত্যক্ষগোচর করিয়া তুলিল।’
কিন্তু পরেই আবার বেশ মিল: ‘অপরাহ্নে মেঘ করিয়াছিল, কিন্তু বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা ছিল না। রাইচরণের খামখেয়ালি ক্ষুদ্র প্রভু কিছুতেই ঘরে থাকিতে চাইল না। গাড়ির উপর চড়িয়া বসিল। রাইচরণ ধীরে ধীরে গাড়ি ঠেলিয়া ধানক্ষেত্রের প্রান্তে নদীর তীরে আসিয়া উপস্থিত হইল।’ এরপরে প্রায় ছিন্নপত্রাবলীর গদ্যে বর্ণনা: ‘নদীতে একটিও নৌকো নাই মাঠে একটিও লোক নাই— মেঘের ছিদ্র দিয়া দেখা গেল, পরপারে জনহীন বালুকাতীরে শব্দহীন দীপ্ত সমারোহের সহিত সূর্যাস্তের আয়োজন হইতেছে। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে শিশু সহসা একদিকে অঙুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, ‘‘চন্ন, ফু।’’’
এর আগে রবীন্দ্রনাথ এই শিশুর আচরণ আর রাইচরণের কথাবার্তা নিয়ে তাঁর সহজাত রসিকতা কিছু কম করেননি। শিশুটি চৌকাঠ ডিঙ্গোলে, বা কোথাও লুকালে অনুকূলের মনে হয় ছেলেটি বড় হয়ে জজ হবে। ‘পৃথিবীতে আর কোনো মানবসন্তান যে এই বয়সে চৌকাঠ-লঙ্ঘন প্রভৃতি অসম্ভব চাতুর্যের পরিচয় দিতে পারে তাহা রাইচরণের ধ্যানের অগম্য, কেবল ভবিষ্যতের জজের পক্ষে কিছুই আশ্চর্য নহে।’
এই শিশুটিকে জলের ধারে যেতে নিষেধ করে তাকে ঠেলাগাড়িতে বসিয়ে রাইচরণ কদম গাছটার দিকে গেল। তখনই ঘটনাটি ঘটল। এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের কলম দারুণ অবিচল: ‘দুরন্ত জলরাশি অস্ফুট কলভাষায় শিশুকে বারবার আপন খেলাঘরে আহ্বান করিল।’ খানিক কাব্যিকও। কিন্তু এরপরই, ‘একবার ঝপ্ করিয়া একটি শব্দ হইল কিন্তু বর্ষার পদ্মাতীরে এমন শব্দ কত শোনা যায়।’ তখন পর্যন্ত ছোটগল্পে বাংলা কাহিনীগদ্যের যে নির্মিতি তাতে এমন বাক্য এতটা স্থিরচিত্তে কীভাবে লেখা যায়, অত অনায়াস প্রয়াসে, সে কথা খুব সহজে ভাবা সম্ভব নয়। সোয়া ছ’ পৃষ্ঠার গল্পে, সোয়া দুই পৃষ্ঠায়ই এই কাণ্ড!
‘কেবল পদ্মা পূর্ববত্ ছল্ছল্ খল্খল্ করিয়া ছুটিয়া চলিতে লাগিল, যেন সে কিছুই জানে না এবং পৃথিবীর এই-সকল সামান্য ঘটনায় মনোযাগ দিতে তাহার যেন এক মুহূর্ত সময় নাই।’
রবীন্দ্রনাথের পরিচিত বর্ণনার পরিচয় দিতে গিয়ে যেন মূল প্রসঙ্গ একটু যেন পাশে সরে সরে গেল। অথবা আলোচনায় এই গল্পটির প্রতি স্বাভাবিক পক্ষপাতও যে তাতে দূরে যায়। যদিও ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ কেন যেকোনো পাঠকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকে। গল্পেরা ভেতরকার কাহিনীর সেইটুকুও।
রাইচরণ আর খোকাবাবুকে খুঁজে পেল না। এর পর রবীন্দ্রনাথও বর্ণনায় কৌতুকী-ভাব একটু দূরে সরিয়ে রাখছেন। গ্রামের মানুষের মনে হলো, এ পদ্মারই কাজ। তবে দূরে বেদেরা এসেছে তাদের প্রতিও সন্দেহ। যদিও অনুকূলের স্ত্রীর সন্দেহ রাইচরণের প্রতি। কারণ খোকার গায়ে গহনা ছিল। তারা রাইচরণকে তাড়িয়ে দিল।
এর পরের কাহিনী খুব দ্রুত। রাইচরণ যশোর জেলার নিজ বাড়িতে ফিরল। সেখানে তার স্ত্রী একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেয়। রাইচরণের বিদ্বেষ নবজাতকের প্রতি। কারণ তার মনে হয়, খোকাবাবু তার ঘরে এসে জন্মেছে। তার নাম রাখল ফেলনা। এর পর রাইচরণ কলকাতায় কাজ নিয়ে গেল। এই ফেলনাকে ভর্তি করাল সেখানকার স্কুলে। তাকে এমনভাবে বড় করে তুলল যেন রাইচরণ তার চাকর:
এমনি করিয়া বারো বত্সর কাটিয়া গেল। ছেলে পড়ে-শোনে ভালো এবং দেখিতে শুনিতেও বেশ হূষ্টপুষ্ট উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ— কেশবেশবিন্যাসের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি, মেজাজ কিছু সুখী ও শৌখিন। বাপকে ঠিক বাপের মতো মনে করিতে পারিত না। কারণ, রাইচরণ স্নেহে বাপ এবং সেবায় ভৃত্য ছিল, এবং তাহার আর-একটি দোষ ছিল— সে যে ফেলনার বাপ এ কথা সকলের কাছে গোপন রাখিয়াছিল।
এর পর রাইচরণ একদিন ফেলনাকে নিয়ে বারাসাতে উপস্থিত হলো। অনুকূল এখন সেখানকার মুন্সেফ। তার স্ত্রী তখন সন্ন্যাসীর কাছে সন্তান প্রার্থনা করছিলেন। রাইচরণ তার পা জড়িয়ে ধরে জানাল, সেই তাদের ছেলেকে নিয়ে পালিয়েছিল। এই তাদের খোকাবাবু। তারা ছেলেকে পরীক্ষা করল। তার কৃতকর্মের জন্য মাফ চায়। কিন্তু ‘ন্যায়পরায়ণ অনুকূল কহিলেন, “যে কাজ করিয়াছে উহাকে মাফ করা যায় না।”’
তাকে এখান থেকে চলে যেতে বলে। ‘রাইচরণ বলিল, “পৃথিবীতে আমার আর কেহ নাই।”
এর পর:
ফেলনা যখন দেখিল, সে মুন্সেফের সন্তান, রাইচরণ তাহাকে চুরি করিয়া নিজের ছেলে বলিয়া অপমানিত করিয়াছে, তখন তাহার মনে মনে কিছু রাগ হইল। কিন্তু তথাপি উদারভাবে পিতাকে বলিল, “বাবা, উহাকে মাপ করো। বাড়িতে থাকিতে না দাও, উহার মাসিক কিছু টাকার বরাদ্দ কারিয়া দাও।”
ইহার পর রাইচরণ কোনো কথা না বলিয়া একবার পুত্রের মুখ নিরীক্ষণ করিল, সকলকে প্রমাণ করিল; তাহার পর দ্বারের বাহির হইয়া পৃথিবীর অগণ্য লোকের মধ্যে মিশিয়া গেল। মাসান্তে অনুকূল যখন তাহার দেশের ঠিকানায় কিঞ্চিত্ বৃত্তি পাঠাইলেন তখন সে টাকা ফিরিয়া আসিল। সেখানে কোনো লোক নাই।
রাইচরণ নিজের ছেলেকে মুন্সেফ বাবুর ছেলে হিসেবে দিতে পেরে নিশ্চিত। তার পর পৃথিবীর পথে নিজেকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছে? জানা নেই।
এই গল্পে, রবীন্দ্রনাথের আরো বহুগল্পের মতো সমাপ্তি চিহ্নিত। একেবারে শেষ। ‘সেখানে কোথাও লোক নাই।’ লেখার পরে আর কিছু ভাবনারও থাকে না। শুধু অনুকূল যখন বলেছিল রাইচরণ এত বড় বিশ্বাসঘাতকতার কাজ কীভাবে করল। রাইচরণ তো এক হাহাকারের সঙ্গে জানিয়েছিল, ‘ঈশ্বর করিয়াছেন’, অথবা, সে-ই তবে বিশ্বাসঘাত, ‘সে আমি নয়, প্রভু।’ তাহলে ‘কে।’ এর উত্তরে রাইচরণ ‘আমার অদৃষ্ট।’
তাহলে এক অদৃষ্টের লেখনে নিজের ছেলেকে প্রভুর ছেলে হিসেবে দিয়ে দেয়া যায়। একমাত্র রাইচরণের মতো ভৃত্যই তা পারে। সেইদিনের পদ্মাপাড়ে এমন কোনো ঘটনা কি সত্যি ঘটেছিল? নাকি তরুণ রবীন্দ্রনাথ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে ধ্বস্ত বাংলার জলময় প্রকৃতিতে প্রভু-ভৃত্যের এই স্তরবিন্যাস বুঝে নিয়েছিলেন যে, ভৃত্য চাইলে নিজের সন্তানকে প্রভুর সন্তান হিসেবে দিয়ে দিতে পারে। এর পরের মাসে লেখা গল্প ‘সম্পত্তি-সমর্পণ’-এ নির্দয়তা আরো নিষ্ঠুর। তাও নিশ্চিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফল। সেখানে সম্পত্তির পাহারাদার হিসেবে অজ্ঞাতে নিজের পৌত্রকে মন্দিরের কুঠুরিতে বন্দি করে মারা হয়। সম্পত্তি-রক্ষায় মানুষ সব পারে। আর এখানে, রাইচরণ যেন তার চেয়ে নিষ্ঠুর। জেনে-শুনে আত্মোত্সর্গ। ব্রিটিশ উপনিবেশিক রাজশক্তির এক বড় বাবুর পায়ে নিজের সন্তানকে নিশ্চিত বলিদানে সকল পাপ মোচন! তার পর নিরুদ্দেশ যাত্রা। পদ্মার মতন নদী এই কাজ করেছিল কি না, তা জানা নেই রাইচরণের। বেদেদের বহর কি নিয়েছে খোকাবাবুকে, তাও সে জানে না। কিন্তু ভৃত্য হিসেবে প্রভুর যে ক্ষতি সে করেছিল, সেই ক্ষতিপূরণের জন্য নিজের ছেলেকে বড় বাবুর ছেলের মতন বড় করে তুলে, তার পর দিয়ে দেয়ার ঘটনা খুব স্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাইচরণকে দিয়ে তাই করিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
স্বাভাবিক জনজীবনের যে চিত্র ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে দেখা যায়, প্রকৃতির প্রতি আপাত প্রচ্ছন্ন মুগ্ধতা রবীন্দ্রনাথের, এর ভেতরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে জড়িয়ে থাকা এমন নিষ্ঠুরতা ‘গল্পগুচ্ছে’র পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় লেপটে আছে। রাইচরণ যেন রবীন্দ্রনাথের ওই ‘আপাত মুগ্ধতা’র বিপরীতে এক প্রকার ক্ষত লেপে দিয়ে যায়, তারই অজ্ঞাতে। খোকাবাবুর এই প্রত্যাবর্তনের ফলে রাইচরণকে নিরুদ্দিষ্টই হতে হবে! ‘পৃথিবীর অগণ্য লোকের মধ্যে মিশিয়া’ যাওয়ার এই নির্মম নিরুদ্দিষ্টতা ভোলা যায় না কোনোভাবে!






