[একগুচ্ছ কবিতার সঙ্গে কেন কবিতাগুলো নির্বাচন করা হলো তার একটি বয়ান যখন কেউ দিতে বলেন, তা এক পরীক্ষা বটে। কবি যেমন দেবদূত আর শয়তানের যমজ ভাই, পাঠকও তাদের নিকট-আত্মীয়। পাঠকেরও একটি দায় থাকে মুদ্রিত কবিতাগুলোর মধ্যে কী কী আর্টিস্ট্রি (শব্দ, চিত্রকল্প, উপমা, ছন্দ, বিষয়, শিল্পরস ইত্যাদির পরিমিত রসায়ন) বিদ্যমান, তা বোঝার বা দেখার। কবি যদি তাঁর কবিতার মধ্যে ওই বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝাতে না পারেন, বুঝে নিতে হবে অনাবশ্যক শব্দের গুল্টি ফোলানো ব্যায়ামই শুধু করা হয়েছে, কবিতা নেই।

এই পাঁচটি কবিতা পড়বার পর আশা করি, দীক্ষিত পাঠক বুঝতে পারবেন, আমার শ্রমিকতা কোথায়, কীভাবে কাজ করেছে। এবং কর্মের যথার্থ ফল কী। আমি চেষ্টা করেছি, যথাবিনয়মাত্রা রেখে পাঁচ রকম স্বাদের শব্দ-অন্ন, কবিতা-অন্ন ও বিষয়-অন্ন পাঠকের সামনে দিতে।]

রন্ধনশিল্প

 

কিছু শিল্প ভালোবাসে নিঃশব্দের দেশ।

কিছু গলির ভেতর বেড়ালের স্বরে কাঁদে।

 

হে নমস্য শিল্প

তুমি আছ ধীরে জেগে ওঠা মেঘের মায়াবী স্তনে,

কবিতায়, রঙের প্রহরে, মৃত বীজে।

 

আমার মাকে কখনো কেউ বলেনি রন্ধনশিল্পী।

মার হাতে সামান্য কচু রান্নাও ছিল পদ্মার ইলিশ?  

 

একটি পুরুষ মাছ নিয়ে

এক রন্ধনশিল্পী, ঠোঁটে মোমের আলো, বলছেন:

অনেক টুকরো করুন

তবে মাথাটা সামান্য হলুদ আর পিঁয়াজ বাটা দিয়ে

যত্নে মাখিয়ে আলাদা রাখবেন।

মানুষও একরকমের লবণ, ঠিকমতো দিতে হবে,

মাত্রা এদিক-ওদিক হলেই

আমিষের সম্পর্ক তেতো হয়ে যায়।

অল্প আঁচে দশ মিনিট রাখলেই চলবে।

পরিবেশনের পাত্রটির রং হবে মেরুন

তার মাঝখানে মাথাটা রাখলে

চোখ দুটি দেখে মনে হবে

মৃত চোখের স্বপ্নেও সারাক্ষণ ছিলে তুমি।

 

এক রন্ধনশিল্পী বলছেন:

এটা একটা ডিম দেওয়া মাছ। আস্ত রাখতে হবে।

 সোনালি আঁশগুলো কাটার সময় ভুলবেন না

সুন্দর ক’রে কাটাও কিন্তু শিল্প।

বুকের অংশ ভেজাতে হবে সর্ষেফুলের মধু দিয়ে।

অন্য অংশগুলো খুব নরম পনিরে।

নিঃশ্বাসে যতটুকু উষ্ণতা ততটুকুই দেবেন।

এই রান্না অল্প ভাপেও হতে পারে। স্বাদ বদলে যাবে।

স্বাদের বৈচিত্র্য আছে বলেই জীবন ভালো লাগে।

একটা লাল মরিচের বেশি প্রয়োজন নেই।

দিতে হবে চা চামচের কম পরিমাণ লবণ।

পরিবেশনে নিবিড় যত্ন চাই।

মনে রাখবেন, অস্থিরতায় শিল্পও বিরক্ত হয়,  

সব কাজে দেখাতে হয় ভালোবাসার পরাণ।

 

দুই রন্ধনশিল্পী রান্নার স্বাদ চাকছেন।

স্বাদের মোহিনী শব্দ হচ্ছে।

 

ঘরের নীল আলো শুনছে

যুগল কণ্ঠের গান : ‘এই রাত তোমার আমার।’

 

প্রিয় দর্শক, রান্নার রেসিপি ঠিকমতো ব্যবহার করবেন।

 

 

চণ্ডিদাসের প্রার্থনা

 

একটা জয়

শুধু একটা  জয়

তোমার জন্যে আমার চাই।

 

বন্ধক রেখে

শেষের শ্বাস,

আমার মতো

যারা শুকনো ঘাটে

সবুজ ঢেউ খোঁজে

কিছু আশায়।

 

একটা মাছ

শুধু একটা  টান

চণ্ডিদাস পোড়ে রৌদ্রতে।

 

নদীও  চায় না

মেঘের ছায়ায়

ঢেউয়ে ভেসে যাক

তোমার পা। 

 

একটা ভয়

শুধু একটা ক্ষয়

সরাবো দেখ তুমি,

আমার ঋণ

যাবো না রেখে আমি

তোমার দায়। 

 

একটা  জয়

শুধু একটা  হাত

দেবে না তোমার সঙ্গবোধ?

০২.১০.২০১৬

 

 

যাপন-৩

 

গতকাল, আমরা পড়েছি আমাদের দিন।

তুমি ছিলে, সংবাদ ছিলে কিছুক্ষণ।

 

আমরা দেখেছি

অন্যায়ের ছড়ানো বৃত্ত।

হেঁটেছি, বসেছি কেন্দ্রে, পরিধিতে গতকাল।

 

আজকে সকালে আয়নায়

চোখেমুখে হাসে, হঠাত্ হাসে না গতকাল।

 

তুমি কি আসবে আজ?

তুমি কি এখনো গতকাল?

 

আঘাত ও ভাবনার দিন

 

বলা হয়,

ভাবনার মূলে আঘাত করার সময় এসেছে।

বলছে না কেউ, 

আমাদের ভাবনা চিকিত্সা নিচ্ছে উন্মাদ-আশ্রমে। 

 

ভাবনার কালো আর অচেনা রঙের আঘাতে

ঢেকে যাচ্ছে মুখ, নদী, শিশুর যাপন।

 

নতুন ভাবনা, নতুন আঘাত, কাপড় পরেও নগ্ন।

হাসছে স্থবিরতার আয়না। 

 

কখন আঘাত দেবে তুমি?

শক্ত হাতে নাকি পাথরে পাপড়ি ছড়িয়ে?

 

কেউ বলছে না

সময়কে থেতলে দিয়েছি।

আঘাত ভাবছে,

এই জন্মে আর কত আঘাত হ’লে

হয়ে যাবো আঘাতের হীরে।

মনে করা যাক,

তোমার হাতে স্বপ্ন দেখার দাবি লেখা পোস্টার

কারো হাতে কষ্টে পাওয়া ফুল

আর পড়শির হাতে রক্তের উষ্ণতা খোঁজা ছুরি।

কেন?

উত্তর জানে সবাই।

 

কবে ছিল না ভাবনা আর আঘাতের দিন?

জেগে উঠেছিল কে? 

একা মানুষ, নাকি শত শত মানুষ?

 

আঘাতের ক্ষত নিয়ে

মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে ঋতুর ভেতর।

অথবা কারো ভাবনায় আঘাত দেবার খোঁজে

একা চলে যায়।

 

আঘাতের বাইরে আছে যে মুখ

একবার আমি তার সাথে দেখা করতে চাই।

 

তোমার ভাবনাদেশে আসেনি ঘোড়সওয়ার?

 

ক্রমাগত

‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ এই যাপনখাঁচায়

শেফালী সেদিন একটি শীতল মাংসজটিলতা।

এই নৈঃশব্দ্যজালে গতকাল, মনে পড়ছে না সময়,

একটি চোখমুখস্তনহূদয়হাতপা কর্তব্য-শীতল।

 

না, কিছুক্ষণ আগেও শেফালী হয়েছিল বিমূঢ় রূপান্তর।

না, এইমাত্র শেফালী আবার

আমার চেনা একটি মানুষ হাঁটছে আবার...

২৫.১২.২০১৫