বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে হ্যালহেডের পরিচয় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা হিসেবে। যদিও এই প্রচেষ্টায় তাঁর অন্তত একজন পূর্বসূরি ছিলেন। তিনি মানোএল দ্য আসসুম্পসাঁও। প্রথম দিকের মুদ্রিত বাংলা পুস্তক হিসেবে পর্তুগিজ পাদ্রি মানোএল দ্য আসসুম্পসাঁও রচিত কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ-এর নাম আমরা জানি। তবে সে বই ছাপা হয়েছিল রোমান হরফে। আর পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে ১৭৪৩ সালে তা প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ বই ছাড়াও মানোএল একটি বাংলা শব্দকোষ ও ব্যাকরণও রচনা করেছিলেন। একই বছরে Vocabulario em Idioma Bengalla e Portuguez নামে যা প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাতে বাংলা ব্যাকরণের কিছু সূত্র লিপিবদ্ধ থাকলেও মোটামুটি ব্যাকরণ বলতে যা বোঝায়, এ বইটি তা ছিল না। প্রায় ৩৫ বছর পর প্রকাশিত হ্যালহেডের A Grammar of the Bengali Language-কে সেদিক থেকে অনেকটা পূর্ণাঙ্গ বলা যেতে পারে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী এবং ব্যবসা ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে আসা ইংরেজদের এদেশীয় ভাষার সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর প্রয়োজন থেকেই গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের নির্দেশে হ্যালহেড ব্যাকরণটি লিখেছিলেন। সুম্পসাঁওয়ের ভোকাবুলারির সঙ্গে হ্যালহেডের ব্যাকরণের একটি মৌলিক অমিলও আছে। প্রথমোক্ত বইটি রচিত হয় এ দেশে ধর্মপ্রচারের কাজে পাদ্রিদের সহায়তার জন্য। পক্ষান্তরে হ্যালহেডের গ্রামারের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য ছিল ভাষা শিক্ষা। যদিও মূলত কোম্পানির ইংরেজ রাজকর্মচারীদের জন্যই এটা লেখা হয়। দুই শতাধিক পৃষ্ঠার বইটির দাম ছিল তখনকার হিসাবে ৩০ টাকা। ছাপা হয়েছিল এক হাজার কপি, যার সবটাই সরকার কিনে নেয়।

  হ্যালহেডের বাংলা গ্রামার প্রকাশিত হয় ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে, হুগলি থেকে। ছেপেছিলেন চার্লস উইলকিনস। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী উইলকিনস ভালো বাংলা জানতেন, পরে সংস্কৃত ও ফারসিও শিখেছিলেন। মূল সংস্কৃত থেকে তিনি ভগবদ্গীতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ১৮৮৫ সালে লন্ডন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। ১৭৮৪ সালে উইলিয়াম জোন্স যখন কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন, তখন উইলকিনস সে কাজেও তাঁর সহযোগী ছিলেন। বিশেষ করে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ব্যাপারে উইলকিনসের কাছে তাঁর ঋণের কথা জোন্স সকৃতজ্ঞ স্বীকার করেছেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের নির্দেশে ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় হ্যালহেডের ব্যাকরণ বইটি ছাপার জন্যই উইলকিনস হুগলিতে একটি প্রেস স্থাপন করেন কিংবা প্রেসটি আগেই স্থাপিত হয়েছিল, তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। যেমন বিতর্ক আছে বাংলায় প্রথম ছাপাখানা স্থাপনের কৃতিত্ব উইলকিনস নাকি বেঙ্গল গেজেটখ্যাত জেমস অগাস্টাস হিকির, তা নিয়েও। তবে হ্যালহেডের ব্যাকরণের জন্য বাংলা টাইপ তৈরির কাজটি যে উইলকিনসের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হ্যালহেড তাঁর ব্যাকরণের ভূমিকায় উইলকিনসের অবদানের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে একই সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে ‘metallurist’ (অর্থাত্ ধাতুবিদ), ‘engraver’, ‘founder’ ও ‘printer’ এ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন।

   হ্যালহেডের বইটি বাংলা ব্যাকরণের হলেও নাম থেকেই বোঝা যায়, তা ইংরেজিতে লিখিত। তবে উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজনে তাতে কিছু বাংলা উদ্ধৃতি ব্যবহূত হয়েছে। উদ্ধৃতিগুলো দেওয়া হয়েছে তখনকার সর্বাধিক পঠিত কয়েকটি গ্রন্থ কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাসিদাসী মহাভারত ও ভারতচন্দ্র রচিত বিদ্যাসুন্দর থেকে। আর এই উদ্ধৃতিগুলো দিতেই হ্যালহেডের দরকার হয়েছিল বাংলা টাইপের। সেই টাইপ তাঁদের তৈরি করে নিতে হয়েছিল। যদিও বাঙলা দেশে ছাপা কোনো বইয়ে বাংলা হরফের ব্যবহারের দিক থেকে হ্যালহেডের গ্রামারই যে প্রথম তা নয়। হ্যালহেডের গ্রামার প্রকাশের পূর্ববর্তী এক দশকে প্রকাশিত এমন অন্তত আটটি বইয়ের কথা বর্তমানে জানা যায়, যাতে কমবেশি বাংলা হরফ ব্যবহূত হয়। তবে সেগুলোর সবই হাতে লিখে ব্লক করে ছাপা হয়েছিল। এমনকি হ্যালহেডেরই দু-বছর আগে প্রকাশিত A Code of Gentoo Laws বইটিতে বাংলা অক্ষরের নমুনা আছে। সেগুলোও এই পদ্ধতিতে অর্থাত্ ব্লক করে মুদ্রিত। মুভেবল টাইপ বলতে যা বোঝায়, তেমন বাংলা অক্ষর হ্যালহেডের ব্যাকরণের জন্যই প্রথম তৈরি করা হয়। আর সে কাজটি করেন চার্লস উইলকিনস। ছেনিকাটা ছাঁচে ধাতু ঢালাই করে অক্ষরগুলো তৈরি করা হয়। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন পঞ্চানন কর্মকার। এই পঞ্চানন কর্মকার ও তাঁর জামাতা মনোহর কর্মকার পরে উইলিয়াম কেরির প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের জন্য বাংলাসহ অনেকগুলো ভারতীয় ভাষার হরফ তৈরি করেন।

  হ্যালহেডের পুরো নাম ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড। জন্ম ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে অক্সফোর্ডশায়ারের ওয়েস্টমিনস্টারে। মা-বাবা দুই তরফেই তিনি ছিলেন মর্যাদা ও প্রতিপত্তির অধিকারী। বাবা উইলিয়াম হ্যালহেড ছিলেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ডিরেক্টর। মা ফ্রান্সেসও ছিলেন সাংসদ-কন্যা। সেকালের অভিজাত ইংরেজ পরিবারের রীতি অনুযায়ী ন্যাথানিয়েল হ্যালহেডের লেখাপড়াও হয় নামিদামি স্কুল ও কলেজে। প্রথমেই তিনি ভর্তি হন এলাকার বিখ্যাত হ্যারো স্কুলে। সাত থেকে সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত এই স্কুলেই তিনি লেখাপড়া করেন। সে সময় স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন সামনার। গ্রিক ও লাতিন ভাষায় তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত, ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত ড. স্যামুয়েল জনসনের বন্ধুও। এমনিতেই ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুলগুলোতে তখন ক্লাসিক ভাষা অর্থাত্ গ্রিক ও লাতিন শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। উপরন্তু হেডমাস্টার সামনারের প্রণোদনা ও তত্ত্বাবধানে এ দুটি ভাষা হ্যালহেড ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন। হ্যারোতে পড়াকালে রিচার্ড শেরিডানকে তিনি তাঁর সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে শেরিডান নাট্যকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিশেষ করে প্রহসনধর্মী রচনায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। ছাত্রজীবনেই হ্যালহেড সহপাঠী শেরিডানের সঙ্গে মিলে ষোড়শ শতাব্দীর গ্রিক লেখক এরিস্তেনেতুসের রচিত পত্রসাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ করেন। ১৭৭১ সালে The Love Epistle of Aristaenetus নামে যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বলা যায় এটিই হ্যালহেডের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। যদিও প্রকাশের সময় বইটিতে কারো নাম ছিল না। ভূমিকায় দুজনের নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে শুধু ‘এইচ এস’ কথাটা লেখা ছিল। প্রকাশের পর চার বছরে বইটির মোট তিনটি সংস্করণ হয়। এছাড়া শেরিডন ও হ্যালহেড যৌথভাবে আরও কিছু কাজ করেছিলেন। হ্যালহেডের ভারতে আসার পেছনে একমাত্র বা প্রধান না হলেও অন্যতম কারণ ছিল যে প্রণয়ঘটিত হতাশা, সে আখ্যানেও শেরিডনকে দেখা যায় তাঁর সফল প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায়। অনিন্দ্যসুন্দরী ও সুকণ্ঠী এলিজাবেথ অ্যান লিনলিকে বিয়ে করে শেরিডন পাড়ি জমান প্যারিসে। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাইটারের চাকরি নিয়ে হ্যালহেড ভারতগামী জাহাজে চড়ে বসেন। পিতার সঙ্গে দ্বন্দ্বকেও হ্যালহেডের দেশত্যাগের কারণ বলে অনুমান করা হয়। এমনও ধারণা করা হয়, পুত্রের মতিগতি দেখে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন উইলিয়াম হ্যালহেডই তাঁকে ভারতে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন। তবে সে কিছু পরের ঘটনা।

  এর আগে অক্সফোর্ডের ক্রাইস্টচার্চ কলেজের ছাত্রাবস্থায় হ্যালহেড তাঁর চেয়ে কয়েক বছরের জ্যেষ্ঠ উইলিয়াম জোন্সের সান্নিধ্য লাভ করেন। জোন্সও এক সময় হ্যারো স্কুলের ছাত্র ছিলেন। হ্যালহেডকে জোন্সই আরবি শিখতে উত্সাহিত করেন। সেকালের ইংল্যান্ডে গ্রিক, লাতিন বা অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষা শেখার যেমন সুযোগ ছিল, আরবির ক্ষেত্রে বলা বাহুল্য তা ছিল না। জোন্স আরবি শিখেছিলেন সৈয়দ নামক একজন আরব পণ্ডিতের কাছে। হ্যালহেডের আরবি শেখার সূত্রপাতও হয়তো তাঁর কাছেই হয়। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। হ্যালহেডের পরবর্তী জীবনের গতিপথ নির্ধারণে অক্সফোর্ড বাসকালীন তাঁর এই আরবি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খুব সম্ভব উইলিয়াম জোন্সই তাঁকে ফারসি ভাষা শিখতেও উত্সাহিত করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে ভারতবর্ষে আসার সময় জাহাজে আরও কয়েকটি ভাষার সঙ্গে হ্যালহেড ফারসিও শিখেছিলেন। তবে ভারতে চাকরির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে ভেবে ফারসি শেখার ওপরই তিনি বেশি জোর দিয়েছিলেন বলে মনে হয়। জাহাজে জোন্সের রচিত ফারসি ব্যাকরণটি তাঁর সঙ্গী ছিল। ভারতে আসার পর হ্যালহেড যে হেস্টিংসের অনুরোধে হিন্দু আইনবিধি অনুবাদ ও সংকলন করেছিলেন, তা মূল সংস্কৃত উত্স থেকে নয়, করেছিলেন তার ফারসি অনুবাদ থেকে। এখানে বলা প্রয়োজন, ইতিপূর্বে হেস্টিংস গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হবার পরই তিনি কিংবা কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরসরা একটা সিদ্ধান্ত নেন। তা হলো, এদেশীয় হিন্দু ও মুসলমানদের বিয়ে, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, পারিবারিক বিরোধ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বিষয়ের নিষ্পত্তি ওই দুই সম্প্রদায়ের নিজস্ব আইন অনুসারেই হবে। যে-আইন বিধৃত রয়েছে তাদের ধর্মশাস্ত্রে। আর তার জন্য উক্ত ধর্মীয় আইন বা বিধিবিধানগুলোর সঙ্গে রাজকর্মচারীদের সম্যক পরিচয় থাকা দরকার। শুধু দোভাষীর ওপর নির্ভর করে বিচার বা শাসনকাজ পরিচালনা করা যাবে না। মোটকথা, এদেশে কোম্পানির শাসনকাজের সুবিধার্থে হেস্টিংস চেয়েছিলেন হিন্দু ও মুসলিম আইনের দুটি কোষগ্রন্থ তৈরি করতে। প্রথম পর্যায়ে ১১ জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে হিন্দু আইন সংকলনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে তাঁরা এ কাজটি করেন। পুরনো নানা শাস্ত্র ঘেঁটে তাঁরা ‘বিবাদ-ভঙ্গার্নব’ নামে হিন্দু আইনের একটি সংকলন তৈরি করে দেন। সমস্যা দেখা দেয় এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করা নিয়ে। ইংরেজরা দেশ শাসন করলেও, তখন পর্যন্ত ফারসিই ছিল রাজভাষা। হিন্দুদের মধ্যেও অনেকে ভালো ফারসি জানতেন। এ অবস্থায় একজন মুন্সির সহায়তা নিয়ে সংস্কৃত থেকে বইটি প্রথমে ফারসিতে অনুবাদ করা হয়। অতঃপর ফারসি থেকে হ্যালহেড বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তাঁর নিজস্ব কিছু টীকা-টিপ্পনিসহ ১৭৭৬ সালে বইটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। ইংরেজিতে বইটির পুরো নাম ছিল A Code of Gentoo Laws, or Ordinations of the Pundits, from a Persian Translation. প্রথমে বইটি বিক্রির জন্য ছিল না, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এটি বিতরণ করে। কয়েক বছরের মধ্যে বইটির অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এমনকি ফরাসি ও জার্মান ভাষায়ও বইটি অনূদিত হয়।

&dquote;&dquote;  হ্যালহেড সম্পর্কে জানা যায় যে, তিনি স্বচ্ছন্দে বাংলা বলতে পারতেন। আর দেশী পোশাক পরে তিনি অনায়াসে দেশীয়দের মধ্যে মিশে যেতে পারতেন। খুব সম্ভব ১৭৭৪ সাল থেকে হ্যালহেড বাংলা শিখতে শুরু করেন। অন্যান্য ইংরেজের মতো প্রথমদিকে নিজ মুন্সির কাছেই তাঁর এদেশীয় ভাষা শিক্ষার সূত্রপাত হলেও, পরে তিনি এ ব্যাপারে কয়েকজন পণ্ডিতের  সাহায্য নেন। আর এভাবে বাংলা শিখতে গিয়েই একটি বাংলা ব্যাকরণ পুস্তকের প্রয়োজন অনুভব করেন হ্যালহেড। তিনি নিজেই যে তেমন একটি বই রচনার কথা ভাবছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় উইলিয়াম বোল্টস নামক একজন জার্মান ভদ্রলোককে বাংলা হরফ তৈরির জন্য পাঠানো তাঁর অনুরোধপত্র থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাবেক কর্মকর্তা বোল্টস ভারত থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। ছাপাখানা ও টাইপ তৈরির ব্যাপারে বোল্টস ভীষণ রকম উত্সাহী হলেও, বাংলা টাইপ তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এ প্রসঙ্গে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য: ‘উইলিয়াম বোল্টস বিলাতে এক প্রস্থ (ফাউন্ট) বাংলা অক্ষর তৈরি করাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু উহা একেবারে বিফল হয়।’

   বাংলা ব্যাকরণ রচনায় তাঁর পথিকৃত্ ভূমিকা এবং প্রথম বাংলা বিচলনযোগ্য টাইপ ব্যবহারের কৃতিত্বের কথা বাদ দিলেও, এদেশীয় ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে হ্যালহেডের অবদান আরও কয়েকটি কারণে স্মরণীয়। সংক্ষেপে যার উল্লেখ এভাবে করা যায়: ১. বাংলা কবিতার ছন্দ নিয়ে হ্যালহেডই প্রথম আলোচনা করেন। তাঁর ব্যাকরণ পুস্তকের অষ্টম অধ্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ২. পদ্যে ছন্দ অনুযায়ী পঙিক্ত বিন্যাসের রীতিটাও প্রথম হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণেই দেখা যায়। পাশ্চাত্য রীতিতে ছন্দ বিশ্লেষণও তিনিই প্রথম করেন। ৩. ফারসি, আরবি, গ্রিক ও লাতিনের সঙ্গে সংস্কৃত ভাষার শব্দগুলোর ধ্বনিতাত্ত্বিক সাদৃশ্য বা সম্পর্কের কথা হ্যালহেডই প্রথম বলেন। সেদিক থেকে বলা যেতে পারে, স্যার উইলিয়াম জোন্স নয়, হ্যালহেডের হাতেই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব চর্চার সূত্রপাত। কারণ জোন্স গ্রিক ও লাতিন ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতের মিল বিষয়ে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি দেওয়ার (১৭৮৬) কয়েক বছর আগেই হ্যালহেড এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর ব্যাকরণ বইয়ের ভূমিকায় তিনি লেখেন: ‘I have been astonished to find the similitude of Shanscrit words with those of Persian and Arabic even Latin and Greek.’ হ্যালহেডের এই পর্যবেক্ষণকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী আবিষ্কারের পথে প্রথম পদক্ষেপও বলা যেতে পারে। ৪. ইংরেজ রাজত্বে হ্যালহেডই প্রথম বাংলা ভাষা শিক্ষা ও চর্চার প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্বের কথা যথেষ্ট যুক্তিসহকারে ও বিশদভাবে তুলে ধরেন। তাঁর ব্যাকরণ বইয়ের ভূমিকায় এ-সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনা আছে। এই ভূমিকাটি সম্পর্কে অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউমের মন্তব্য: ‘তিনি [হ্যালহেড] যদি ব্যাকরণ না লিখে শুধু ভূমিকার বক্তব্য লিখতেন, তাহলেও আমরা তাঁকে স্মরণ করতাম। বাংলা ভাষা চর্চার সপক্ষে এই ভূমিকাটি একটি মূল্যবান সুপরিশনামা।’ ফারসির (ইংরেজ রাজত্ব চালু হলেও, তখন পর্যন্ত যা সরকারি ভাষা) সঙ্গে তুলনায় বাংলা ভাষার সরলতা ও ব্যবহারোপযোগিতার উল্লেখ করে হ্যালহেড লেখেন: ‘It is much better calculated both for public and private affairs by its plainness, its precision and regularity of construction, than the flowery sentences and modulated period of Persian.’

&dquote;১৭৭৮ব্যাকরণের কাজ শেষ করার পর হ্যালহেড ইংল্যান্ডে ফিরে যান। যদিও কিছুদিন পর তিনি আবার সস্ত্রীক কলকাতায় ফিরে আসেন। ইতিমধ্যে হেস্টিংস গভর্নর জেনারেলের পদ থেকে অপসারিত হয়েছেন। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ও কলকাতায় পছন্দমতো চাকরি না পেয়ে এক বছরের মাথায় হ্যালহেড যাকে বলে পাকাপাকিভাবে স্বদেশে ফিরে যান (১৭৮৫)। সেখানে তিনি হাউস অব কমন্সের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। হেস্টিংস যখন ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন তখন হ্যালহেড আইনসভায় তাঁর সপক্ষে অবস্থান নেন এবং এ ব্যাপারে সফলতা দেখান। কিন্তু এরপর রাইট ব্রাদার্স নামক একজন আধ্যাত্মিক গুরুর (হ্যালহেড ওই সময়ে যাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন) সমর্থনে বক্তব্য রেখে তাঁকে পার্লামেন্ট সদস্যদের বিরোধিতা ও অবজ্ঞার পাত্র হতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি সাংসদ পদে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। হ্যালহেড এ সময় যোগসাধনা ও সুফিবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন। আসলে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে প্রাচ্য ধর্মতত্ত্বের একটা সমন্বয় ঘটানোর আগ্রহ তাঁর মধ্যে কাজ করেছিল। জীবনের এ পর্যায়েই হ্যালহেড উপনিষদের ইংরেজি অনুবাদ করেন। আর অনুবাদটি তিনি করেছিলেন মূল সংস্কৃত থেকে নয়, দারাশিকোর করা ফারসি ভাষান্তর অবলম্বনে। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব ঘটলে এই বিপ্লবের প্রতিও হ্যালহেডের সহানুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়। স্বভাবতই ইংরেজ অভিজাততন্ত্র এ ব্যাপারটিকে ভালো চোখে দেখেনি। অতি উত্সাহী হয়ে হ্যালহেডও এ সময় একটি ভুল কাজ করে বসেন। তিনি তাঁর সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ফ্রান্সে স্থানান্তর করেন। বলা বাহুল্য, যা তাঁর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। ১৮৩০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দরিদ্র অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। শেষ জীবনে তিনি পুরোপুরি বধির হয়ে গিয়েছিলেন। হেস্টিংসের সুপারিশে লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিসে তিনি অবশ্য একটি চাকরি পান। জীবনের এ পর্যায়ে হ্যালহেড কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করেন। মর্নিং ক্রনিকল পত্রিকায় সেসব কবিতা ছাপা হয়।

  বাঙলায় অবস্থানকালে হ্যালহেড ভাষাচর্চার প্রয়োজনে কিংবা নিজস্ব আগ্রহ থেকে বেশকিছু মূল্যবান পুঁথি সংগ্রহ করেন। ব্রিটিশ মিউজিয়াম পরে তাঁর কাছ থেকে সেগুলো কিনে নেয়। ১২টি বাংলা পুঁথিসহ তাঁর সংগৃহীত মোট পুঁথির সংখ্যা ছিল ৯৩। বাংলা পুঁথিগুলোর মধ্যে রামায়ণ, মহাভারত, চণ্ডীমঙ্গল ও কালিকামঙ্গলের পুঁথি ছিল। তাঁর ব্যাকরণ বইয়ে তিনি এসব পুঁথি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মহাভারতের ইংরেজি অনুবাদও শুরু করেছিলেন হ্যালহেড। যদিও কাজটা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। তাঁর অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটি কলকাতা এসিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত আছে।

   হ্যালহেড যখন তাঁর ব্যাকরণ পুস্তকটি রচনা করেন, তখনও বাংলা ভাষা তাঁর পুরোপুরি আয়ত্তে আসেনি। তার ফলে এবং আরও নানা কারণে বইটিতে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি বা সীমাবদ্ধতা রয়ে যায়। এই খামতি সম্পর্কে হ্যালহেড মনে হয় সচেতন ছিলেন। লন্ডনে ফিরে যাওয়ার পরও তিনি কিছু ভুল সংশোধন করে শুদ্ধিপত্র পাঠিয়েছেন। আর বইয়ের পরবর্তী সংস্করণে তা সংযুক্ত হয়েছে।

  বাংলা ব্যাকরণ রচনায় তাঁর পথিকৃত্ ভূমিকার কথা বাদ দিলেও, বাংলা মুদ্রাক্ষর ব্যবহারের কৃতিত্বের দিক থেকেও হ্যালহেডের নাম আমাদের মুদ্রণ, প্রকাশনা তথা সামগ্রিকভাবে বিদ্যাচর্চার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলা টাইপ ব্যবহারের প্রয়োজন বা তাত্পর্য উল্লেখ করে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে তিনি তাঁর ব্যাকরণ বইয়ের ভূমিকায় যা লিখেছিলেন, তা তাঁর প্রবল দূরদর্শিতা ও প্রখর বাস্তবতাবোধের পরিচয় দেয়। তিনি বলেছিলেন: ১. বাংলা মুদ্রণের প্রসারের ফলে ভাবের আদান-প্রদান সহজতর হবে। ২. মুদ্রণ ব্যবস্থা দলিল-দস্তাবেজের জালিয়াতি রোধ করবে এবং ৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি, বাংলা ভাষায় বই মুদ্রিত হলে জনসাধারণ সহজে সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতে পারবে।

  বাংলা গদ্যের ইতিহাস লিখতে গিয়ে সজনীকান্ত দাস হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশের সালটিকেই ‘বাংলা গদ্যের ঐতিহাসিক যুগের আরম্ভ বত্সর’ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও গোপাল হালদার এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, হ্যালহেডের ব্যাকরণ প্রকাশ (১৭৭৮) থেকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮০০) পর্যন্ত সময়-পর্বটিকে ‘আরম্ভ’ না বলে বরং ‘আয়োজন কাল’ বলাই শ্রেয়। এ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য: “১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হ্যালহেডের গ্রামারে বাংলা গদ্য-রচনার আরম্ভ হয়নি; তবে বাংলা মুদ্রণে গদ্যের সেই দীর্ঘ ‘অন্ধকার-যুগ’ শেষ হলো, তাতে সন্দেহ নেই।”

  হ্যালহেড তাঁর অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি তাঁর জীবনকালে তো নয়ই, এমনকি পরেও বহুদিন অবধি পাননি। এর সম্ভাব্য কারণ অনুমান করতে গিয়ে মোহাম্মদ আবদুল কাইউম যা লিখেছেন তা উদ্ধৃত করেই আমরা আমাদের আলোচনা শেষ করব: “অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে বাংলা ভাষার বিশেষ কোনো মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইউরোপের পণ্ডিতবর্গ তখন নবাবিষ্কৃত সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের রস-সন্ধানে মশগুল। সংস্কৃত, ফারসি, হিন্দুস্থানি ব্যাকরণ বা অভিধান যাঁরা রচনা করেছেন, তাঁরা ‘প্রাচ্যতত্ত্ববিদ’ বা Orientalist নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। তাছাড়া সরকারি নীতিতেও বৈষম্য ছিল। একটি উদাহরণ দিলেই কথাটি স্পষ্ট হয়। জোনাথান ডানকান ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে একটি আইন পুস্তক বাংলায় অনুবাদ করে পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন মাত্র পনের হাজার টাকা। কিন্তু একই গ্রন্থ ফারসিতে অনুবাদ করে চেম্বার্স সাহেব বত্রিশ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজেও এই বৈষম্যনীতি সক্রিয় ছিল।”

 

সহায়ক রচনা ও পুস্তক

১. পবিত্র সরকার, ‘হলহেড: জীবন কথা’, চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পা.), দুই শতকের বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশন, কলকাতা: ১৯৯১।

২. মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, ‘হলহেডের বাংলা চর্চা’, ঐ।

৩. নিখিল সরকার, ‘আদিযুগের পাঠ্যপুস্তক’, ঐ।

৪. গোলাম মুরশিদ, বঙ্গদেশে মুদ্রণ ও প্রকাশনার আদিপর্ব, ঢাকা: ১৯৮৫।

৫.        গোপাল হালদার, বাঙ্লা সাহিত্যের রূপরেখা (দ্বিতীয় খণ্ড), ঢাকা : ১৯৭৪।