ভাষান্তর: মঈনুস সুলতান

[আমেরিকার কবি জেমস মের্যোলের (১৯২৬—১৯৯৫) জন্ম নিউইয়র্কে। তার পরিবারে অর্থবিত্ত ছিল প্রচুর। শৈশব কেটেছে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাউথহ্যাম্পটনে। বেড়ে ওঠেন ‘দি অরচার্ড’ নামে খ্যাত তিরিশ একরের খামারবাড়িতে। পরিশীলিত বাগান ও নাচঘরে সমৃদ্ধ বিশাল ম্যানশনে বসবাসের সময় গভর্নেসের কাছে শেখেন জার্মান ও ফরাসি ভাষা। রুপার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো এ কবির মা-বাবার ভেতর বিচ্ছেদ হয়, যখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর। তার সমসাময়িক কবি, যেমন সিলভিলা প্লাথ (১৯৩২-১৯৬৩) বা অ্যালেন গিন্সবার্গ (১৯২৬-১৯৯৭) প্রমুখের জীবনযাপনে ছিল তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংকট, সামাজিক অস্থিতিশীলতা। তারা ড্রাগসে বিদীর্ণ হয়েছেন, অবগাহন করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্কৃতিতে। আত্মহননের প্রয়াসের সঙ্গে অন্তত সিলভিলা প্লাথের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। অ্যালেন গিন্সবার্গ বৌদ্ধ ধর্মীয় সাধনায় নিমগ্ন হয়েছেন, যোগ দিয়েছেন ভায়োলেন্সবিরোধী শান্তি আন্দোলনে। সে তুলনায় বলা চলে, কবি জেমস মের্যোল কাটিয়েছেন আর্থসামাজিকভাবে সুসংহত, সম্পদের সয়লাবে ভাসমান, তথাকথিত বিত্তবান আমেরিকানের আপাত উদ্বেগহীন নিস্তরঙ্গ জীবন। শৈশবে মর্যাদাবান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রিন্সটনের লরেন্সভিল স্কুলে অধ্যয়নের সময় প্রতিদিন নাকি একটি করে কবিতা রচনা করতেন তিনি। তারুণ্যে পড়াশোনা করেন ম্যাসাচুসেটসের নামজাদা আমহার্স্ট কলেজে। একাডেমিকভাবে গবেষণা করেন মার্সেল প্রুস্ত-এর ওপর। পেশাগত জীবনে অল্পদিনের জন্য সৈনিক ছিলেন, শিক্ষকতাও করেছেন বছর কয়েক। ভ্রমণ ছিল তার প্রিয় অবকাশ। বলা হয়ে থাকে, কম্পোজার হিসেবে মোৎসার্ট ধ্রুপদী সংগীতে যে ধরনের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, সে রকম জেমস মের্যোলও কবি হিসেবে শব্দ চয়ন, বাক্যবন্ধ ও ছন্দ-মাত্রায় স্বাক্ষর রেখেছেন তার অনুপম নির্মাণশৈলীর। তার বিখ্যাত বইগুলোর অন্যতম হচ্ছে ‘দ্য চেঞ্জিং লাইট অ্যাট সেন্ডঅভার’, ‘আ ডিফরেন্ট পার্সোন: আ মেমোয়ার’ ইত্যাদি। ১৯৭৭ সালে কবি পুলিত্জার পুরস্কার পান।]

দগ্ধ হচ্ছে চার্লস

আরেকটি সন্ধ্যা কাটল আমাদের

আলোচ্য বিষয় মানুষের চেহারা,

আলাপে বারেবার ফিরে আসে মানুষের অবয়ব

কথা বলে বলে বাকচাতুরীর নানা ছলে

                                 আমরা খানিক দিশেহারা।

সুদর্শন যারা

ব্যতিক্রমী যাদের দেহসৌষ্ঠব

হলোই-বা তাদের চরিত্রের খানিকটা কপট কুয়াশায় ভরপুর,

জীবনের জোয়ারে হাল ধরবে তারা নাবিকের দক্ষতায়

জলসায় ছড়াবে সুর মূর্ছনা, বাজাবে নিপুণ পায়ে নুপূর।

 

কিন্তু মৃদুস্বরে স্বগোতোক্তি করে আমাদের-ই একজন

প্রয়োজন আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের বিকাশ,

বুদ্ধিবৃত্তির জমিনে না করলে সারে-জলে চাষ

আদতে মানুষ হবে ঘোলা পানিতে কাদামাখা

                                     হলেও বা সুদর্শন।

 

আর আজকের আসরে আমাদের সুহূদ চার্লস

দরিদ্র সে দেহের সম্পদে,

অনেকদিন হলো ভুগছে যন্ত্রণায়

অগ্রগতি রুদ্ধ হচ্ছে তার প্রতিপদে।

 

রান্নাবান্না খাবারের জোগাড়যন্ত্র সে-ই করেছে আজ

আলমিরা থেকে বের করে পানপাত্র

             কাচের গায়ে তাদের রঙতুলির কারুকাজ,

সকলের হাতে সে ধরিয়ে দেয় পানীয়

                      সোনালিতে ছলকাচ্ছে মধুর বরণ

আসরের আরেক তরুণ, বলে সে—

প্যারিসে কিন্তু এ রকম না, পানাপানে সেখানে ভিন্ন আচরণ;

ঠুকে সে মেজবানের পাত্রে ম্যাচের শলাকা

শান্ত সুন্দর নীল শিখা ছুঁয়ে যায় তরলের উপরিতল

পানীয়তে নিখুঁতভাবে আগুন হয় আঁকা।

 

মৌন হই আমরা

অতঃপর স্তব্ধ হয় আমাদের কথাবার্তা কোলাহল,

নীরবতায় ভরে ওঠে ধমনি— রক্ত চলাচলের শিরা উপশিরা,

ফেটে যায় পানপাত্র, চুইয়ে পড়ে সোনাঝরা মদিরা।

 

আর তখনই হাঁকিয়ে স্ফটিকের ঘোড়াজোড়া ফিটন

সমৃদ্ধ আত্মার শুভ্র লেবাসে নেমে আসে চার্লস

পরিবেশে বাজে যেন কল্যাণ ঠাটে ইমন।

 

আতঙ্কের দস্তানা পরা তার ঝলমলে হাত

কেটে যায় আমাদের মুহূর্ত পল অনুপল

কামরায় থমকে দাঁড়ায় আলোকের সম্পাত।

 

হাত নাড়ে সে— উজ্জ্বলতা ছড়ায় তার মুখে

বলে— ‘যায় আসে না তেমন কিছু’ নেই তো বাধা সমুখে;

তাকায় সে আরশিতে— অসচেতন দৃষ্টিতে হতবিহ্বল,

বদলায়নি তো তেমন, আছে আগের মতো অবিকল

                                   তাবৎ কিছু অসূয়া প্রবল।

 

পানপাত্রে আবার মদিরা ঢালে চার্লস

আমাদের আলাপের হরেক ছলে,

সমাধান হয়নি কিছু

নিমজ্জিত হয় সে আবার নিখাদ অতলে।

 

পাগল করা দৃশ্যপট

গেল রাতে আমি যে স্বপ্ন দেখি

তার নাম ‘লন্ড্রি’ দেয়া যেতে পারে

জড়িয়ে আছে তোয়ালে বিছানার চাদর

                ময়লায় ফেনা তোলা সাবান ক্ষারে।

আমরা কিন্তু এসব কাপড়চোপড়

                           ব্যবহার করতে যাচ্ছি যৌথভাবে,

বাচ্চার বিবে শুকিয়ে আছে দুধ,

                              চাদরে রক্তের ছিটা,

                                          কুঁচকানো তাবৎ কিছু,

এলোমেলো করেছে কে যেন দৃষ্টি অভাবে।

 

মস্ত এক লন্ড্রি বাস্কেট বেলকনি থেকে ফেলেছে ছুড়ে

শ্বেতপাথরের ওয়াশবোর্ডে

                ঝলকাচ্ছে জোত্স্নায় তা আঁধার ফুঁড়ে।

 

কেবলমাত্র আমাদের হয়েছে দেখা,

বাইরের অন্ধকার থেকে পর্যবেক্ষণ করছি আমি

                                      একদম একা।

পরে আছি আনকোরা পোশাক

বোনা তা মনোজ্ঞ সুতায়

তাতে পড়ে না কোনো দাগ

কুঁচকায়ও না কোনো ছুতায়

নেই ময়লা হওয়ারও ভয়

এমনই টেকসই— ব্যবহারে ছিঁড়েটিড়েও যায় না

                               হয় না কোনো ক্ষয়।

 

আর বসে আছি অপেরা হাউজে— চলছে থিয়েটার

সাজানো তা সারি সারি চোখে— থরে বিথরে

                       অজস্র চোখের দৃষ্টি অপার।

তবে আমার চোখ দুটিতে লেগেছে

                       বেলেনডোনা পাতার বিষাক্ত ছোঁয়া

ফুলেছে পল্লব

         বড় হয়েছে চোখের পুতলি

                           দৃশ্যপট হয়েছে আঁধারে ধোয়া।

 

আর যখনই তাকাই আমার অভ্যন্তরে

দেখি— জমাট বেঁধেছে মেঘ স্তরে স্তরে,

নিশ্চল হয়ে আছে ঝড় তুফান

                    নানা ধরনের আকার

                 বিজরীর আলোকিত বাণ,

উড়ছে ঝড়ো হাওয়ায় কাক

          উন্মাদ অশ্বের ছড়াচ্ছে কেশর

                  হ্রেসা, হাঁকডাক।

 

আঙুলগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে বাঁশরীর নয়টি ঘাট

অবচেতনে তীব্র আতঙ্ক,

আমার এত নার্ভাস লাগছে কেন

ভুলে যাচ্ছি জীবনের সমস্ত মানসাঙ্ক।

আমি তো তোমাকে ভালোবাসি

হাসির উচ্চরোলে ঘুচে যাচ্ছে হেরফের— আমাদের ভেদাভেদ,

ধোয়া পাকলা হব আমরা এবার— হব শুভ্র সফেদ।

বলিরেখা আমাদের ভালে একসাথে আঁকবে বয়সের ছাপ

উইসটেরিয়া পুষ্পের তীব্র মূর্ছনায় পুড়বে মনস্তাপ,

উন্মাদ দৃশ্যপটে সিঁড়ি ভেঙে পড়ে যাচ্ছি খাদে

একহারা গাছটি যেন বিস্ফোরিত হচ্ছে তীব্র বিষাদে।

 

ভালোবাসার তরু

তোমার সম্বিতে নাড়া দিতে

সকল চাতুরী মেধা ও মনন করেছি ব্যবহার,

বলেছি মিথ্যা— ক্লান্ত হয়েছি— তৈরি করতে চেয়েছি

পারস্পরিক স্পর্শের স্পৃহা আবার।

 

সাড়া তুমি দাওনি— আমাকে কাছেও চাওনি

এখন সম্পর্কচ্ছেদ-ই হচ্ছে আমাদের যৌথ গল্প,

আর তো দেখি না বিশেষ কোনো বিকল্প।

 

মাথা পেতে নিয়েছি অপরাধের অভিযোগ

অটামের লিলুয়া বাতাসে ঝরেছে পাতা

তোমার ভেতর তৈরি হয়নি কোনো উদ্যোগ,

জমে জমে গড়ে উঠেছে হরিৎ পাতার সোপান

তোমার নিরাসক্তির তুষে পুড়েছে আমার অভিমান।

 

কথা বলতে চেয়েছি— ঝুঁকে বাড়িয়েছি দুহাত

ভালোবাসার তরুতে কেটে বসেছে নির্লিপ্ততার করাত।

 

রহস্যময় শিলালিপি

দিনগুলো তোমারই মতো— ভরপুর শূন্যতায়

তাবৎ স্মৃতি স্রোতে পলি হয়ে ভেসে যায়,

উৎসাহী শিকড় করে নিরন্তর অনুসন্ধান

আবর্জনার গভীরে খুঁজে কি অনুপান?

 

পোড়া গাছের গুঁড়ি

পোড়ে পোড়ে নীলচে শিখা তৈরি করছে

সড়কের মতো একটি অবয়ব,

হুমড়ি খেয়ে পড়ি, ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ

আমার অনুভব।

ঘনত্ব কমে গিয়ে উড়ছে স্ফুলিঙ্গ

ছড়াচ্ছে ছাই অনিমিখে,

তোমার নির্মিতিতেও আছে আলো

বাকি সব শিখাহীন অন্ধকার— কুচকুচে কালো।