আমাদের মধ্যে শহিদুলই প্রথম ভদ্রমহিলাকে দেখতে পায়। সাদা একটা প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে মুখ বের করে লোকজনকে কী জিজ্ঞাসা করছিল! বেশ অ্যাট্রাক্টিভ আর জলি ফেস। শহিদুল যে সে কারণেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা নয়, আসলে ওকে বুঝি কৌতূহল তাড়া করে ফিরছিল, মহিলাটা কী খুঁজছে রে! একটু আগেও দেখলাম চৌরাস্তায়!

কতজনই তো রাস্তাঘাটে কত কিছু খোঁজে। এসব নিয়ে কে ভাবে বা ভাবতে চায়। আর আজ আমরা বহুদিন পর চার বন্ধু এসেছি একটু রিল্যাক্স মুডে সময় কাটাতে। নিজেদের মধ্যে গুলতানি মারব, পুরনো বন্ধুরা কে কোথায় আছে খোঁজখবর নেব, যা সাত-আট বছর আগেও আমরা নিয়মিত করতাম। একদিন কারোর সঙ্গে কারোর দেখা না হলে অস্থির লাগত! এখন মোটেও সময় করতে পারি না। কীভাবে পারব! চাকরি আর সংসারের ঘানি টানতে টানতেই তো একেকজনের জান লবেজান অবস্থা! আজকেও হয়তো দেখাটা হতো না! যদি সবগুলোকে ঘর থেকে পাকড়াও করে না আনতাম!

         চার-পাঁচদিন টানা বৃষ্টির পর আজ সাতসকালে যখন জানলা খুলতেই দেখলাম মিঠা রোদ, আমার আর কিছুতেই ঘরে থাকতে মন চাইল না। ছুটির দিন বলে কথা! আমি কল দিলাম মনসুরকে, মনসুর দিল শহিদুলকে, শহিদুল জানাল রাফিকে— এভাবে আমরা চার চাকরিজীবী বন্ধু মিলে ঠিক করলাম, আজ সিরাজি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে নাশতা খাব। তারপর সেই আগের দিনগুলোর মতোই আড্ডা দিয়ে বেড়াব চৌরাস্তার মোড় থেকে আমবাগানের এ-মাথা সে-মাথা! পারলে সারা দিনই কাটিয়ে দেব ঘুরেফিরে! তারপর সত্যি সত্যি সিরাজিতে খাসির পায়া দিয়ে তন্দুল রুটির সত্কার সেরে আমরা যখন কেবল রাস্তায় নেমে এসেছি, ঠিক তখনই শহিদুল ভদ্রমহিলাকে দেখাল।

আমরা দাঁড়িয়ে যাই এবং ভদ্রমহিলার দিকে তাকাই। বলতে দ্বিধা নেই, ভদ্রমহিলার চেহারায় কী এক চৌম্বকীয় আকর্ষণ আছে, আমরা সহসা চোখ ফেরাতে পারি না। বয়স ৪০ ছাড়িয়েছে কি ছাড়ায়নি, লোকজনের কাছে কী জিজ্ঞাসা করছে! আমরা সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার আগেই ভদ্রমহিলার সাদা কার আমাদের সিরাজির সামনে রেখেই কোথায় মিলিয়ে যায়। আমরাও আর দাঁড়াই না, আমবাগানের দিকে পাকা সড়কঘেঁষা মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকি। এমন একটা জম্পেশ নাশতার পর মিয়াজানের খোলা দোকানের গরুর সরেস দুধের চা না খেলে কি জমে!

         ১০ মিনিটের পথ পেরিয়ে যখন কেবল দোকানটার সামনে পৌঁছে চায়ের অর্ডার দিতে যাব, তখনই আবার ভদ্রমহিলার সাদা কারটা মেইন রাস্তার এক সাইডে এসে দাঁড়াল, সম্ভবত প্রৌঢ় এক ভদ্রলোককে দেখে। স্বভাবতই আমাদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয় যে, কী খুঁজছেন ভদ্রমহিলা— কী এমন প্রয়োজন তার যে মফস্বল শহরের একটা বাস স্টেশনের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন? চায়ের অর্ডার ফেলে রেখেই আমরা কারের দিকে এগোই এবং কারে বসা ভদ্রমহিলার উদ্দেশে জানতে চাই, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?

ভদ্রমহিলাও যেন আমাদের চারজনকে একসঙ্গে পেয়ে খুশি হন। তার চোখের ভাষা তা-ই বলে। তিনি কার থেকে নামলেন এবং কোনো ভূমিকা ছাড়াই প্রশ্ন করলেন, আপনারা কি কেউ হোসেন আলী সাহেবকে চেনেন? তার ঠিকানাটা বলতে পারেন আমাকে?

হোসেন আলী! কোন হোসেন আলী? আমরা কি আদৌ কোনো হোসেন আলীকে চিনি, তার নাম শুনেছি কখনো? আমরা চারজনই মনে মনে একজন হোসেন আলীকে খুঁজতে থাকি এবং পরস্পরের দিকে জিজ্ঞাসার চোখে তাকাই। কথা না বলেও নিজেদের মধ্যে নিশ্চিত হই যে, আসলে এ নামের কাউকে আমরা চিনি না। কে তিনি, কোথায় থাকেন— আমরা ভদ্রমহিলার দিকে প্রশ্ন ছুড়ি।

আমি কিছুই বলতে পারব না! ভদ্রমহিলার এক রকম আত্মসমর্পণের ভঙ্গি। শুধু তার নামটাই মনে আছে। আর মনে আছে, সিরাজগঞ্জের এখানেই তার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল।

কখন? আমাদের কৌতূহল বাড়তেই থাকে। আমরা অনুভব করি, যেন নাটক-সিনেমার মতো কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, অথবা কোনো গল্পের প্লট তৈরি হচ্ছে। আমরা কোথাও বসার তাগিদ অনুভব করি। তবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চলতে থাকে আমাদের কথা। কবে দেখা হয়েছিল— সবকিছু কি একটু খোলাসা করবেন?

তাও প্রায় ২০ বছর!

ভদ্রমহিলার কথা শুনে আমরা চমকে উঠি।

হ্যাঁ, ২০ বছর তো হবেই। বেশিও হতে পারে। এখানেই দেখা হয়েছিল। তবে ঠিক কোন জায়গাটায়, বলতে পারব না। তখন তো এত সব দোকানপাট ছিল না। রাস্তার দুই পাশে শুধু গাছপালা ছিল।

দেখাটা হলো কীভাবে?

সেটা আমার পক্ষে এক কথায় বলা সম্ভব না! থেমে যান ভদ্রমহিলা। স্তম্ভিত হয়ে কী ভাবেন! সে অনেক কথা! থেমে থেমে বলেন তিনি।

আমাদের জানানোর মতো কি?

নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই। ভদ্রমহিলা স্বতঃস্ফূর্ত হন।

আমরা আবারো কোথাও বসার তাগিদ অনুভব করি। মিয়াজানের চায়ের দোকানের সামনে রাখা টুল আমরা অধিকার করে ফেলি। শহিদুল কোত্থেকে বলে-কয়ে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারও আনে। চা খেতে খেতেই ভদ্রমহিলা হারিয়ে যান ২০ বছর আগে। এখানে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল! কীভাবে যে বেঁচে আছি, সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার! আমি তো কোমায়ই ছিলাম। তারপর চায়ের কাপে তিনি লম্বা চুমুক দেন। সেদিন হোসেন আলী সাহেব আমাদের নতুন জীবন দিয়েছিলেন!

কীভাবে সেটা?

সরাসরি উত্তর দেন না ভদ্রমহিলা। তিনি আরেকটু পেছন থেকে শুরু করেন। আসলে অ্যাকসিডেন্ট যে একটা ঘটবে, আমি যেন সেদিন সেই ভোররাত থেকেই টের পাচ্ছিলাম।

কোনদিন?

যেদিন আমরা পাবনা থেকে দুজন ফিরছিলাম! সেই ২০ বছর আগে!

আপনারা কি পাবনাতেই থাকতেন?

না। আমরা থাকতাম ঢাকায়। ঢাকার খিলগাঁওয়ে। আমাদের মাত্র বিয়ে হয়েছে। খিলগাঁওয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। দুজনই চাকরি করি। ও একটা অ্যাড ফার্মে আর আমি বীমা অফিসে! বিয়ে হয়েছে ১০ দিনও হয়নি। হঠাৎ আমার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া থেকে কল এল, আমার বড় চাচা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। পারভেজ জানত, আমার জীবনে বড় চাচার কতটুকু অবদান! সে আমার কী! জন্মের পর বাবাকে চোখে দেখিনি। বড় চাচাই আমাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। আমরা রাতের বেলায়ই একটা মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে চলে গেলাম কুষ্টিয়া। সারা দিন আমাদের বাড়িতে কাটালাম। পারভেজ অস্থির হয়ে উঠল ঢাকায় ফেরার জন্য। পরদিন নাকি যেকোনো মূল্যে অফিসে যেতেই হবে! কী আর করব! আমিও ওর সঙ্গে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। সন্ধ্যায় ফেরার সময় আমিই বললাম, কুষ্টিয়া থেকে পাবনা আর কত দূর! চলো মাকে দেখে যাই। পাবনা হলো পারভেজদের বাড়ি। মা তখন ওখানেই থাকতেন। এখন নেই। অনেক আগেই মারা গেছেন।

আচ্ছা আচ্ছা। আমরা এতক্ষণে পাবনার মর্মটা বুঝি।

আমার কথা শুনে খুশিই হলো পারভেজ। ওর মাথায় আসলে পাবনা যাওয়ার চিন্তা ছিল না। একদিন অফিস করতে পারবে না বলে কী ছটফটানি! খুবই ক্যারিয়ারিস্ট, খুবই। বিয়ের দুদিনের মধ্যেই আমি চিনে ফেলেছিলাম। ক্যারিয়ার ছাড়া ওর মাথায় কিচ্ছু ছিল না। এখনো নেই। ৯টা-৬টার অফিস করত ৯টা—১০টা পর্যন্ত। কোনো দিন রাত ১২টায়ও ফিরত বাসায়! বাসায় যে নতুন বউ আছে, সেটাও মাথায় থাকত না।
ভদ্রমহিলার কণ্ঠটা কেমন ভেজা হয়ে উঠল।

তারপর পাবনায় এলেন?

হ্যাঁ। পাবনায় এলাম। সেদিন পাবনায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ৯টার মতো বেজে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, পারভেজ হয়তো পরদিন সকালে আস্তে-ধীরে ঢাকায় রওনা হবে! ওমা! রাতে খেয়েদেয়েই ও ঢাকায় ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠল! আমি কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না। কীভাবে মানব? ড্রাইভার কি গতকাল থেকে সামান্য সময়ের জন্যও রেস্ট পেয়েছে? সারা রাত সারা দিন চালিয়েছে গাড়ি। পারভেজ ওসব বুঝতে রাজি নয়। ওর এক কথা! সকালে অফিস ধরতে হবে! যেন ১ ঘণ্টা দেরি করলেও ওর অফিসের বিশাল সর্বনাশ হয়ে যাবে। শেষে ঠিক হলো, আমরা খুব ভোরে রওনা হব, যাতে ১০টার মধ্যেই ধরা যায় অফিস। জানেন, সেদিন সেই ভোররাতে যখন মাইক্রোবাসটা ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেইন রোডে উঠল, তখনই আমার বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাত করে উঠেছিল। তখনো নিকষ অন্ধকার। আকাশে থম থম করছে মেঘ। ড্রাইভার গুমরো মুখে চালাচ্ছে গাড়ি। ওর রকমসকম কেমন লাগছিল। আমি বসেছিলাম পেছনের সিটের বাম দিকে, তাই ড্রাইভারকে ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছিলাম। পারভেজ ঠিক ওর পেছনে। কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ মনে হলো, ও যেন ঘুমাচ্ছে। আমি চিত্কার দিয়ে গাড়িটা থামাতে বললাম। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে অবাক চোখে আমাকে দেখছিল! আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন? ১০ বছর ধরে গাড়ি চালাই। কোনো দিন আমার গাড়িতে ফুলের টোকা পর্যন্ত লাগেনি।

তবু আমি ওকে অনুরোধ করি রাস্তায় কোথাও নেমে চা খেয়ে নিতে। ও আমার কথাকে গ্রাহ্যই করল না। এরপর আমি ওর সঙ্গে কেবল কথাই বলতে লাগলাম। বাড়ি কোথায় দেশ কোথায় বিয়ে করেছে কবে বাচ্চাকাচ্চা কজন? তারপর আর কত কথা বলা যায় একজন অনাত্মীয় মানুষের সঙ্গে? তাছাড়া ক্লান্তিও এসেছিল। গতকাল থেকে টানা জার্নি করছি। একটু যে ঘুমাব, সে সুযোগও হয়নি। কথা বলতে বলতে আমি নিজেও মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আতকা জেগে উঠতেই দেখি, স্টিয়ারিং হাতে ড্রাইভারের মাথাটা ঘুমে ডানদিকে কাত হয়ে আছে! আর আমাদের মাইক্রোবাসটা বাঁয়ের পথ ছেড়ে ডানে উল্টো দিক থেকে আসা ট্রাকের দিকে ছুটছে। আমি চিত্কার দিয়ে ড্রাইভারের ঘুম ভাঙাতে যাওয়ার আগেই শুধু শুনতে পেলাম বিকট এক শব্দ। তারপর আর কিছুই মনে নেই।

তারপর?

যখন জ্ঞান ফিরল, অন্ধকার কেটে যাচ্ছিল। আবছা আলোয় টের পেলাম, আমাকে মাইক্রোবাস থেকে বের করা হচ্ছে। লোকজন মনে করেছিল, আমি আর বেঁচে নেই। সামনে ড্রাইভারের মাথাটা থেঁতলানো। রক্ত! আশ্চর্যভাবে পারভেজও আমার মতো অক্ষত। মাইক্রোবাসটা ভচকে লেগে আছে ট্রাকটার গায়ের সঙ্গে। ধীরে ধীরে লোকজন আসছিল। হইচই চিত্কার। কী যে এক অস্থিরতা! বুকের ভেতরটা ধপাস ধপাস লাফাচ্ছিল। এর মধ্যেই আবার কোত্থেকে পুলিশ। জেরা। লোকজনেরও এটা-ওটা কত প্রশ্ন। অথচ কথা বলারই শক্তি পাচ্ছিলাম না, ইচ্ছেও করছিল না। তখনই যেন বিধাতা সেই হোসেন আলী মানুষটাকে পাঠালেন। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি, ঠোঁটে লুকানো হাসি। আমাকে আর পারভেজকে ভিড় থেকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলেন পাকা সড়ক ছেড়ে একটা কাঁচা মাটির রাস্তায়। তারপর বোধ হয় রিকশা নাকি হেঁটেই! ১০ কি ১৫ মিনিট পরই দেখলাম, আমরা দাঁড়িয়ে আছি অপূর্ব সুন্দর এক নদীর পাড়ে। হিজল ফুলের আলোয় চোখ জুড়িয়ে গেল। একটু দূরেই বটগাছ। এমন ছায়া ঢাকা সবুজ নদীর পাড় আগে কখনো দেখিনি। নিবিড় সেই ছায়ায় বাঁশ দিয়ে বানিয়ে রাখা হয়েছিল বসার বেঞ্চি। হোসেন আলী মানুষটা আমাদের সেখানে বসিয়ে দিয়ে কোত্থেকে জগ ভরে পানি নিয়ে এলেন, একটু পর বিস্কুট, কলা। বললেন, কী হয়েছে না হয়েছে কিছুই মনে করার দরকার নেই। মনে করেন, আপনাদের দুজনেরই আজ নতুন জন্ম হলো। আপনারা শুধু এখানে বসে থাকবেন। এই নদীর তীরে যতক্ষণ খুশি বসে থাকবেন, নদীর হাওয়া খাবেন। আপনাদের আজ কোনো টেনশন নেই!

আমি গ্রামের মেয়ে হলে কী হবে, নদীর পাড়ে এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কখনো বসে থাকার সুযোগ পাইনি। আমাদের গ্রাম দিয়েই বয়ে চলেছে একটা চিরল নদী। কিন্তু জন্ম থেকেই সেই যে বাবা মারা গেলেন, অভাব— অস্থির হয়ে শুধু ছোটাছুটি— স্কুল, কলেজ, তারপর এই বিয়ে-সংসার— নদীর দিকে তাকানোর সময় কোথায়!

দম নেন ভদ্রমহিলা, তারপর আবারো হারিয়ে যান! সেদিন সেই নদীর পাড়ে বসে থাকতে থাকতে মনে সত্যিই শান্তি এল। আতঙ্ক, ভয়, ড্রাইভারের থেতলে যাওয়া মুখ, রক্ত, পুলিশের জেরা— কোনো কিছুই আর মনে থাকল না। এর মধ্যে অবশ্য মাঝখানে পারভেজ অফিস অফিস করছিল। হোসেন আলী ভাই ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলেন, কিসের অফিস? জীবনই যদি না থাকে, অফিস দিয়ে কী হবে? নদী দেখেন। দেখেন নদী কত স্থির! কোনো তাড়াহুড়া নেই। দেখেন, দেখতে থাকেন।

তারপর মানুষটা কোথায় গেলেন। ফিরলেন দুপুরের ঠিক আগে আগে। জোর করে বাড়িতে নিলেন, গোসল করালেন, ভাত খাওয়ালেন। তারপর কোত্থেকে আরেকটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে এনে ঢাকায় ফেরার ব্যবস্থাও করলেন।

তাহলে তো সেই বাড়িটাই খুঁজে বের করা যায়।

আমি তো পথঘাট সব ভুলে বসে আছি।

মনে রাখেননি কেন?

তখন কি আর জানতাম, আবার আসতে হবে?

এলেন যে? আমরা কথার পিঠেই কথাটা জিজ্ঞেস করে বসি। ভদ্রমহিলাকে খুব অসহায় লাগে। আমরাও আর ঘাঁটাতে চাই না। আচ্ছা থাক। আপনার বলতে ইচ্ছে না করলে বলবেন না।

মিয়াজান চা বানাতে বানাতে আমাদের কথা শুনছিল। সেও এ এলাকার স্থায়ী নয়। চাঁদপুর থেকে বছর পাঁচেক হলো এখানে এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের নিজ থেকেই বুদ্ধি দেয়, আপনারা গফুর ব্যাপারীর দোকানে যান। হোসেন আলীকে চিনলে উনিই চিনবেন। উনি লোকাল।

ভদ্রমহিলা সামনে। ড্রাইভারের পাশে। আমরা চারজন ঠাসাঠাসি করে পেছনে। অচিরেই আমরা গফুর ব্যাপারীর দোকানে পৌঁছে যাই। ভদ্রলোক আমাদের নিরাশ করলেন না। তবে অন্ধকারেও ঠেলে দেন; বাঁইচা আছে কিনা কে জানে? এতদিনে তো বাঁইচা থাকার কথা না। তিনি আমাদের আরো একটু পেছনে যেতে বলেন, সেই কাঁচা রাস্তাটা তো আর কাঁচা নেই। অনেক আগেই পাকা হয়েছে। আপনারা কিছু দূর গেলেই দেখবেন, একটা সুপারি গাছওয়ালা বাড়ি, পুকুরও আছে।

সত্যি সত্যি আমরা সেই সুপারি গাছওয়ালা বাড়িতেই হোসেন আলীকে পেয়ে যাই। বয়সের ভারে ন্যূব্জ। সাদা চুল, মুখ ঢাকা সাদা দাড়িতে। কথা বলতেও গলা কাঁপে। ভদ্রমহিলা যখন বললেন সেই অ্যাকসিডেন্টের কথা, নদীর পাড়ে বসে থাকার কথা, বাড়িতে এনে ভাত খাওয়ানোর কথা— হোসেন আলী অভীভূত হয়ে শোনেন শুধু। মুখে ছেলেমানুষের হাসি। আবেগহীনভাবে ভদ্রমহিলার মাথায় হাত বোলান। আর তাতেই কিনা আমরা হঠাৎ শুনি ভদ্রমহিলার গলা আর্দ্র হয়ে উঠেছে, হোসেন ভাই! আমাকে আবার সেই নদীটার কাছে নিয়ে যেতে পারবেন?

হোসেন আলীকে খুব অসহায় মনে হলো। তিনি কী বলতে গিয়েও পারলেন না। ঝিম মেরে কতক্ষণ বসে থাকেন। তারপর গায়ে ফতুয়া চাপিয়ে উঠে দাঁড়ান। আমাদের সঙ্গে নীরবে গাড়িতে বসেন। আমরা চেপেচুপে বসে হোসেন আলীর নির্দেশিত পথে নদীর উদ্দেশে এগোতে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি আমাদের একটা বিশাল ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নামি। হোসেন আলী যেন কত অপরাধ করে ফেলেছেন, এমন ভঙ্গিতে ভদ্রমহিলার দিকে তাকান। তারপর হাতজোড় করে বললেন, এখানেই সেদিন আপনাদের দুজনকে বসিয়েছিলাম।

সামনে যতদূর চোখ যায়, শুধুই মিল, ইন্ডাস্ট্রি, মানুষ, কোলাহল! রিনরিন বাজে হোসেন আলীর কণ্ঠ, এটা তো আসলে নদী ছিল না, এটা ছিল কোপাকান্দির বিল। বর্ষার সময় বিল আর নদী মিলেমিশে এক হয়ে যেত। দেখলে মনে হতো সমুদ্দুর। আমি আপনাদের সেদিন সেই সমুদ্দুরের সামনেই বসিয়েছিলাম। সমুদ্দুর তো সমুদ্দুর, আজ একটু ডোবা পর্যন্ত নেই। সবাই মিলে বিলটা ভরাট করে ফেলছে! নদীটাও অভিমানে সরে গেছে!

ভদ্রমহিলার গলা ভেজা, নদীটা যে আমার খুব দরকার ছিল হোসেন ভাই।

কেন বইনে, তোমার কী হইছে?

বলতে গিয়েও থেমে যান ভদ্রমহিলা। আমাদের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকান। তারপর সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে জানান, আরেকটা অ্যাকসিডেন্ট! আমার আর কেউ নেই। কেউ নেই আমার!

তোমার সেই মানুষটা?

সে অনেক ওপরে উঠছে। এত ওপরে যে, আমারে আর চেনে না। বড়লোক এক বেটির সঙ্গে নতুন সংসার পাতছে! আমার মেয়েটা, একমাত্র মেয়েটা ড্রাগ নেয়! আউট অব কন্ট্রোল! গলা ভিজে আসে ভদ্রমহিলার। নিজেকে স্বাভাবিক করতে চান, পাবনা থেকে ফিরছিলাম। এখানে আসতেই আপনার কথা মনে পড়ল। নদীর কথাটাও...

হোসেন আলী মানুষটা দরদালানের দিকে তাকিয়ে কী বিড় বিড় করতে লাগলেন। সমস্ত শরীর থরথরিয়ে কাঁপছে তার। মনে হচ্ছে, এখনই পড়ে যাবেন! আমরা বুঝতে পারি না, মানুষটাকে ধরতে হবে, নাকি তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন!