জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব
(ষড়বিংশ কিস্তি)
(তৃতীয় অধ্যায়)
‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় সাহিত্যসমূহের উদ্ভব’ (সপ্তম পর্ব)
পক্ষ পরিবর্তন: আয়ারল্যান্ডের ঘটনা (শেষার্ধ)
Caint na ndaoine বা ‘জনসাধারণের মুখের ভাষা’র এ উদযাপনের আসলে দুটো উদ্দেশ্য ছিল: সুনির্দিষ্টতা প্রকাশ করা ও কণ্ঠহীন, প্রান্তিক, আইরিশ গ্রামীণ দরিদ্র মানুষদের কণ্ঠ দেয়া। বিশ শতকের গোড়ার দিকে জন মিলিংটন সিঞ্জ তার অনুবাদ প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যে প্রকল্প কেবল আইরিশ ভাষাতেই সাহিত্য সৃষ্টি করতে চায়নি, চেয়েছিল ইংরেজিতেও সাহিত্য রচনা করতে, কিন্তু তার পরও তা অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অঞ্চলে ব্যবহূত আইরিশ ভাষার বিশিষ্ট ছন্দ ও মৌখিক উদ্ভাবনশীলতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। ও লাগাইর এবং সিঞ্জ, এ দুজনের জন্যই নন্দনতাত্ত্বিক প্রকল্পটি ছিল রাজনৈতিক পুনরুদ্ধারেরও একটি প্রকল্প।
আইরিশের ক্ষেত্রে, উপনিবেশোত্তর ক্ষমতায়ন অনুবাদে লক্ষ্য ভাষাভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব বা ‘বশ্য বা ‘অস্বচ্ছ’ অনুবাদের আকস্মিক উদ্ভবের দিকে এগোয়নি। সত্যি বলতে কী, ভাষা হিসেবে আইরিশের র্যাডিক্যাল অপরতা (otherness) প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুবাদকদের অনুবাদের প্রধান উৎস ভাষা ইংরেজি থেকে তাদের অনুবাদে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ইংরেজিয়ানা পরিহার করার দিকে নিয়ে গেছে। আইরিশ অভিজ্ঞতাটি উপনিবেশোত্তর অনুবাদের পৌনঃপুনিক দ্বিমুখী বন্ধনের একেবারে মোক্ষম একটি উদাহরণ। একদিকে একটি ভাষা উপনিবেশ স্থাপনকারীর ভাষা থেকে তার ফারাকের ওপর ভিত্তি করে নিজের বাঁচার অধিকার দাবি করছে। অন্যদিকে অনুবাদের বেলায় তার অর্থ হলো, উপনিবেশ স্থাপনকারীর উৎস ভাষার র্যাডিক্যাল বৈসাদৃশ্য উপনিবেশায়িতের লক্ষ্য ভাষার সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত প্রথার নামে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। কাজেই ভেনুটির বক্তব্যের বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে হয়, ‘স্বচ্ছন্দ কৌশলগুলো’ (fluent strategies) একচ্ছত্র সংস্কৃতিগুলোর একমাত্র বিশেষাধিকার (prerogative) নয়।
সত্যি বলতে কি, ইচ্ছে করলে এর বিপক্ষেও যুক্তি দেখানো সম্ভব। লক্ষ্য ভাষার প্রতি পক্ষপাতিত্বসম্পন্ন অনুবাদ এমন একটি বিলাসিতা, যা উপভোগ করার সঙ্গতি কেবল প্রধান ঔপনিবেশিক বা প্রাক্তন ঔপনিবেশিক ভাষাগুলোরই রয়েছে। সে যা-ই হোক, সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর অতি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে (আয়ারল্যান্ডে আইরিশ, উত্তর আমেরিকায় ফরাসি), অনুবাদে উৎস ভাষার শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষ্য ভাষার সুনির্দিষ্টতা আরো হ্রাস করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সেটার বাড়বাড়ন্ত বা বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
An Gúm-এর জন্য কর্মরত অনুবাদকরা ১৯৩৭ সালের মধ্যে ২৩৭টি রচনা আইরিশ ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে ২৮টি ফরাসি, আটটি লাতিন ও গ্রিক, একটি প্রোভেসাঁল, একটি রুশ ও ১৭০টি ইংরেজি থেকে অনূদিত হয়েছিল। অর্থাৎ অন্য সব ভাষা থেকে একত্রে যতগুলো বই অনূদিত হয়েছিল, তার চেয়ে চার গুণ বই ইংরেজি থেকে অনূদিত হয়েছিল। ইংরেজি থেকে অনুবাদের এ বিপুল সংখ্যাধিক্য বেশকিছু মজার প্রশ্নের জন্ম দেয়, যেটাকে প্রভাব ও সামর্থ্যের উভয়সংকট হিসেবে বুঝে নেয়া যেতে পারে। উনিশ শতকে আয়রল্যান্ডে ইংরেজিই ছিল বিদ্যাচর্চার প্রধান মাধ্যম এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতির ভাষা। আইরিশভাষী অনুবাদক ও লেখকরা যে সাহিত্যের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন, তা হলো ইংরেজি। কাজেই ওয়াল্টার স্কট, চার্লস ডিকেন্স, জেরোম কে জেরোম, মার্ক টোয়াইন প্রমুখ লেখকের রচনা অনুবাদের দিকেই বেশি ঝোঁক ছিল তাদের, আর এগুলোই ছিল ভিক্টরীয় মধ্যবিত্তের অপেক্ষাকৃত প্রিয় পাঠ-উপকরণ। সদ্য ভোটাধিকারপ্রাপ্ত উত্তর-ঔপনিবেশিক এলিটদের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রভাবের পৌনঃপুনিকতা মোটেই তেমন অবাক করা কোনো বিষয় নয়। সামর্থ্যের বা যোগ্যতার প্রশ্নটি সমাজ অর্থনীতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে আইরিশ নেটিভ স্পিকাররা বিদেশী ভাষা অধ্যয়নের সুযোগ পেতেন না বললেই চলে। বিদেশ ভ্রমণের অর্থ ছিল, সাধারণত স্থায়ী অভিবাসন এবং সেক্ষেত্রেও গন্তব্যগুলো ছিল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইংরেজিভাষী। কাজেই সবচেয়ে সহজ ও সবচেয়ে জনপ্রিয়, যদিও সবচেয়ে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ উপায় বা বিকল্প ছিল ইংরেজি ভাষায় রচিত সাহিত্য থেকে সরাসরি অনুবাদ করা।
আইরিশ অনুবাদ সংঘটিত হয়েছিল দ্বিবাচন (diglossia) বা দ্বিভাষিকতার (bilingualism) পটভূমিতে। ১৯২০-এর দশকে কেবলই আইরিশভাষী মানুষ খুব অল্পই ছিল: যারা আইরিশ পড়তে পারতেন, তারা ইংরেজিও পড়তে সক্ষম ছিলেন। কাজেই উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৩৪ সালে আইরিশে অনূদিত Lorna Doone পড়ার জন্য তাদের তেমন কোনো প্রণোদনা ছিল না। ঠিক যে সাংস্কৃতিক প্রভাব অনুবাদের নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণ বা নির্ধারণ করত, তা সেই অনুবাদগুলোকে একটি পাঠকগোষ্ঠী থেকে কিছুটা হলেও বঞ্চিত করেছিল। ইংরেজি অনুবাদ বিষয়ে An Gúm-এর নীতির ব্যাপারে বারবার ওঠা সমালোচনা এবং পাঠকসংখ্যার স্বল্পতা ও নিরপেক্ষ আয়ারল্যান্ডে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সুভাষিত যে নামে পরিচিত ছিল সেই ‘জরুরি অবস্থাকালীন’ অর্থনৈতিক সংকোচনের কারণে ১৯৪০-এর দশকে প্রকল্পটিতে একটা নাটকীয় কাটছাঁট ঘটে এবং কেবল স্কুলের পাঠ্যবই অনুবাদে মনোযোগী হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
অনুবাদ প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশকিছু লেখক, যেমন Máirtín Ó Cadhain ও Seosamh Mac Grianna-এর লিখিত মন্তব্যের ফলে নব্য রাষ্ট্রটির গোড়ার দিকের অনুবাদ কর্মকাণ্ডটিকে এই বলে পরবর্তীতে উপহাস করা হয় যে, সেটি ছিল স্রেফ নৈরাশ্যব্যঞ্জক গত্বাঁধা বাজে কাজ, যা আইরিশ ভাষায় নতুন সাহিত্য প্রসারে তেমন কিছুই করতে পারেনি। অবশ্য আইরিশ ভাষায় লিখিত উপন্যাস নিয়ে রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে অ্যালান টিটলে এ মূল্যায়ন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন যে, অনুবাদ প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত অনেক লেখক ‘মৌলিক’ রচনাও সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া তিনি যুক্তি দেখান যে, “একই সময়ের দিকে যেসব ‘মৌলিক’ রচনা প্রকাশিত হচ্ছিল, তার চেয়ে কিছু কিছু অনুবাদের মান বেশি উন্নত ও বেশি কাজের ছিল।”
An Gúm প্রকল্পে যেসব অনুবাদককে নিয়োগ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে আইরিশ ভাষায় রচিত আধুনিক সাহিত্যের গোড়াপত্তনকারী অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যেমন, Máirtín Ó Cadhain, Séamus Ó Grianna, Seosamh Mac Grianna, Seán Ó Ruadháin, Nicolás Tóibín, Seán Mac Maoláin, Tadgh Ó Rabhartaigh, Andrias Ó Baoighill ও Mícheál Ó Gríobtha। শেষ পর্যন্ত তাদের অনুবাদকর্মের ফলে এমন একটি সাহিত্যিক ভাষার আবির্ভাব ঘটে স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরবর্তী সময়ে, যে ভাষার সুতীব্র প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। অনুবাদ কর্মকাণ্ডটির কেন্দ্রাভিমুখী বৈশিষ্ট্যটি ছিল বানান ও ব্যাকরণের প্রমিতকরণের ওপর একটি ক্রমবর্ধমান ঝোঁক, যার ফলে ১৯৫৪ সালে আইরিশ ভাষার একটি সরলীকৃত ও প্রমিত বানান পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিবর্তন বা পালাবদলটি ছিল ‘জনসাধারণের ভাষা’ বা caint na ndaoine-এর বানানতত্ত্ব বা বানান পদ্ধতি ও পদান্বয়িক (syntactic) বৈচিত্র্য থেকে কিছু রীতি-নীতির স্বীকৃতি বা মান্যতার দিকে, যা পূর্বেকার ধ্রুপদী আইরিশ শতাব্দীগুলোকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছিল। আর কেন্দ্রাতিগ বা বহির্মুখী বৈশিষ্ট্যটি ছিল এই বিশেষ প্রমিতকরণের বিরুদ্ধতা, যার কারণে লেখকরা আইরিশ ভাষার নিজস্ব বৈচিত্র্যের সংস্থান ও প্রকাশযোগ্য সম্ভাবনাগুলোর সন্ধানে নিয়োজিত হন। এ দুই প্রবণতার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তার ফলে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের আইরিশভাষী লেখকরা এমন একটি ভাষা ও সাহিত্য লাভ করেন, যা অনুবাদের ক্ষেত্রে উত্কর্ষলাভের জন্য আরো আগে যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তার ফলে যথেষ্ট সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ১৯২০ ও ১৯৩৯-এর দশকে আয়ারল্যান্ডের অনুবাদসংক্রান্ত অভিজ্ঞতাটি সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর প্রভাব সামর্থ্য, ভাষাতাত্ত্বিক পরিচয়, ক্ষমতায়ন ও গ্রহণীয়তা এসব প্রসঙ্গকেন্দ্রিক ঠিক সেসব সুনির্দিষ্ট সমস্যার কথা তুলে ধরে যেগুলোকে জাতীয় সাহিত্যগুলোর উদ্ভবের কালানুক্রমিক ইতিহাসে অবশ্যই বিবেচনার মধ্যে আনতে হবে।
(পরবর্তী পর্ব: অনুবাদের মধ্যে দিয়ে স্কটিশ আত্মার সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথোপকথন)





