বার্সেলোনা, ২০২১ সাল। তৎকালীন কোচ জাভি হার্নান্দেজ বলেছিলেন, ‘তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হতে পারে।‘

ফরাসি তারকা উসমান দেম্বেলের জন্য কথাটি নতুন ছিল না। ২০১৭ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ১৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল চুক্তিতে বার্সেলোনায় যোগ দেয়ার পর অনেকেই তাকে বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যয়বহুল খেলোয়াড় হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তার ফুটবল ক্যারিয়ারের যাত্রা ছিল চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। ইনজুরি, অনিয়মিত পারফরম্যান্স এবং আচরণ নিয়ে ওঠা নানা প্রশ্নের সঙ্গে লড়াই করতে করতে অবশেষে তার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে, তিনি জিতেছেন ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কার 'ব্যালন ডি'অর'।

tear

কান্নাভেজা কণ্ঠে দেম্বেলে। ছবি- উয়েফা

প্যারিসের মঞ্চে পুরস্কার গ্রহণের সময় দেম্বেলে যখন তার পরিবারের আত্মত্যাগের কথা বলছিলেন, তখন তার চোখে ছিল অশ্রু। এই অশ্রু তার উত্থান-পতনের দীর্ঘ যাত্রার সাক্ষী।

২০২৪-২৫ এ অসাধারণ এক মৌসুম কাটিয়েছেন দেম্বেলে। পিএসজিকে জিতিয়েছেন লিগ ওয়ান, ক্যু দে ফ্রান্স এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রেবল। ক্লাব বিশ্বকাপ ফাইনালেও পৌঁছায় তারা। সেখানে অনেকটাই অপ্রত্যাশিতভাবে শিরোপা হাতছাড়া হলেও পুরো মৌসুমে ৩৫ গোল এবং ১৪টি অ্যাসিস্ট করেন দেম্বেলে। বছরের শুরু থেকে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের সেরা ফরোয়ার্ড ছিলেন ডান ও বাঁ— দুই পায়েই সমান দক্ষ দেম্বেলে।

তার এই অর্জনকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা যাবে না। তিনি পেছনে ফেলেছেন লিভারপুলের মোহাম্মদ সালাহ, রিয়াল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং বার্সেলোনার লামিনে ইয়ামালের মতো তারকাদের। শেষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গিয়ে লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে ঠেকলেও বাজিমাত করেন ট্রেবলজয়ী দেম্বেলে।

এমবাপ্পের রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়াটা দেম্বেলের জন্য ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই পরিবর্তনের পর কোচ লুইস এনরিকে তাকে বলেন, ‘আমরা এখন তোমার কাছ থেকে গোল চাই এবং আমরা চাই তুমি আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হও।‘ কোচিং স্টাফরা তাকে বারবার 'ব্যালন ডি'অর, ব্যালন ডি'অর, ব্যালন ডি'অর' বলে অনুপ্রাণিত করতেন।

২০২৩ সালের আগস্টে মাত্র ৪৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ডে পিএসজি দেম্বেলেকে কিনে নেয়। সেই মৌসুমে তিনি ৬ গোল এবং ১৪টি অ্যাসিস্ট করেন। তখনো তিনি দলের প্রধান তারকা ছিলেন না। এমবাপ্পে চলে যাওয়ার পর পিএসজির নতুন লিডার ও ভরসার দরকার ছিল। সেই স্থানটি পূরণ করলেন দেম্বেলে।

আর সেটাও করলেন ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে। গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সংখ্যাটা ৫১— যা তার আগের যেকোনো মৌসুমের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

দেম্বেলের এই রূপান্তর কেবল এমবাপ্পের চলে যাওয়ার জন্যই হয়নি। এর পেছনে আরো অনেক কারণ ছিল। বার্সেলোনায় থাকাকালে তিনি ১৪ বার পেশির ইনজুরিতে ভুগেছেন, মাঠের বাইরে ছিলেন ৭৮৪ দিন। শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ক্লাব তাকে ব্যক্তিগত শেফও দিয়েছিল। ভিডিও গেমসের কারণে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকায় তিনি প্রায়ই অনুশীলনে দেরি করতেন।

dembu

গেমস খেলছেন দেম্বেলে। ছবি- ডেইলি মেইল

দেম্বেলের এই রূপান্তর কেবল এমবাপ্পের চলে যাওয়ার জন্যই হয়নি। এর পেছনে আরো অনেক কারণ ছিল। বার্সেলোনায় থাকাকালে তিনি ১৪ বার পেশির ইনজুরিতে ভুগেছেন, মাঠের বাইরে ছিলেন ৭৮৪ দিন। শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ক্লাব তাকে ব্যক্তিগত শেফও দিয়েছিল। ভিডিও গেমসের কারণে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকায় তিনি প্রায়ই অনুশীলনে দেরি করতেন।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে মরক্কোয় হঠাৎ করে বিয়ে করেন রিমাকে, এরপর কন্যাসন্তানের জন্ম। দায়িত্বশীলতা বেড়ে যায়, জীবনযাত্রায় আসে শৃঙ্খলা। পুষ্টিবিদ, ব্যক্তিগত ফিজিওথেরাপিস্ট আর স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে দেম্বেলে তৈরি করেন নতুন নিজেকে।

অনেকে ভেবেছিলেন, পিএসজির প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ আসবে ফরাসি তারকা এমবাপ্পের হাত ধরেই। তারা ভুল করেননি—শুধু নামটাই ভুল ছিল। কারণ পিএসজির গৌরবের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছেন উসমান দেম্বেলে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার কণ্ঠ যেন সবার অন্তরে গেঁথে যায়—

‘আমরা একসঙ্গে প্রায় সবকিছু জিতেছি। এই ব্যালন ডি’অর শুধু আমার নয়, আমাদের।‘