বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্সের জার্সিতে দুটি গোল, তার একটি আবার প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেয়া বজ্রগতির শট—আর কী চাই। তাই রাতটি ছিল এমবাপ্পের। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য কখনো কখনো স্কোরশিটের বাইরেও লুকিয়ে থাকে। সুরকারের নাম হারিয়ে যায়, অথচ তার লেখা সুরেই মুগ্ধ হয় পুরো অর্কেস্ট্রা। সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের ৩-১ গোলের জয়ে সেই সুরকার ছিলেন মাইকেল অলিসে। এমবাপ্পের চোখ ধাঁধানো ঝলকানির আড়ালে নীরবে বেজেছে অলিসের নিখুঁত সিম্ফনি। একজনের গতি ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ের সঙ্গে অন্যজনের তুলনাহীন ভিশন—এ অপূর্ব যুগলবন্দি বিশ্বকাপের অন্য দলগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে অশনিসংকেত।

২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের প্রথমার্ধের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। প্রথম পঁয়তাল্লিশ মিনিটে তারা প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে বল স্পর্শ করতে পেরেছিল মাত্র তিনবার।

শুরুতে এমবাপ্পের নিষ্প্রভতা বেশি চোখে পড়ার কারণ ছিল তার অসংখ্য ভুল টাচ এবং বলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর দৃশ্য। প্রথমার্ধে অলিসের বিচরণ ছিল কেবলই ডান দিকের সাইডলাইনের কাছাকাছি একটি নির্দিষ্ট এবং কোণঠাসা এলাকায়, যেখানে তিনি ছিলেন একেবারেই বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম এ সংকটময় মুহূর্তে অলিসকে তুলে নেয়ার বদলে এক দারুণ কৌশলগত চাল চালেন। তিনি বায়ার্ন মিউনিখের এ উইঙ্গারকে ডান প্রান্ত থেকে সরিয়ে এমবাপ্পের ঠিক পেছনে, আক্রমণভাগের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থাৎ ‘নাম্বার টেন’ রোলে নিয়ে আসেন। এর পরই ম্যাচের গোটা দৃশ্যপট বদলে যায়।

দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসিরা নেয় ১০টি শট। আক্রমণের প্রায় প্রতিটি বিপজ্জনক মুহূর্তের কেন্দ্রেই ছিলেন অলিসে। পুরো ম্যাচে শেষ সেনেগালের গোলপোস্টের সামনে তিনি ২৭টি পাস দিয়েছেন, যা তার যেকোনো সতীর্থের চেয়ে ১২টি বেশি। পাসের সফলতার হার ছিল ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ। অলিসে চারটি গোলের সুযোগ তৈরি করেন, যা মাঠের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের দ্বিগুণ।

সেনেগালের সুঠাম ও শক্তিশালী ডিফেন্ডারদের মাঝখান দিয়ে তিনি যেভাবে অনায়াসে বল পায়ে গ্লাইড করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তা ছিল চোখের জন্য পরম প্রশান্তি। ম্যাচ তখনো গোলশূন্য, এমন সময় সেনেগালের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে ডি-বক্সে তার সেই দুর্দান্ত দৌড় এবং শটটি সেনেগালিজ গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডি ফিরিয়ে না দিলে সেটি ম্যাচের অন্যতম সেরা গোল হতে পারত। তবে তার আসল জাদুটি লুকিয়ে ছিল ফ্রান্সের প্রথম গোলটির নেপথ্যে। গোলটির বিল্ডআপ শুরু হয় উপামেকানোর পা থেকে। তিনি বল বাড়ান জুলস কুন্দেকে। কুন্দের কাছ থেকে বল পেয়ে অলিস ডান দিকের হাফ-স্পেস থেকে এমন একটি দূরদর্শী থ্রু-বল বাড়ান, যা সেনেগালের রক্ষণভাগের বুক চিরে সরাসরি এমবাপ্পের পায়ে গিয়ে পড়ে। সেই একটি মাত্র নিখুঁত পাস সেনেগালের গোটা দলের প্রতিরোধকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেয়। এমবাপ্পে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে নেন।

এমবাপ্পের দ্বিতীয় গোলটির ক্ষেত্রেও অলিসের ছায়া ছিল স্পষ্ট। স্কোরশিটে তার নাম অ্যাসিস্টদাতা হিসেবে নেই। কিন্তু মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে তার ড্রিবল, প্রতিপক্ষের লাইন ভেঙে এগিয়ে যাওয়া এবং আক্রমণের ভিত্তি তৈরি করাই ছিল সেই গোলের সূচনা। এমবাপ্পে আলোচনায়, কারণ বিশ্বকাপে তার গোল সংখ্যা এখন মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ডের আরো কাছে। উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো এমবাপ্পের পায়ে ধরা দিলেও সেগুলোর জন্ম হয়েছিল অলিসের সৃজনশীলতা থেকে।

সেনেগালের বিপক্ষে যে সৃজনশীলতা অলিসে দেখিয়েছেন তাতে বিশ্বকাপ যত এগোবে, অলিসেকে উপেক্ষা করা তত কঠিন। এমবাপ্পের গতির ঝলকানি আর অলিসের সৃজনশীলতার মেলবন্ধন—দুই প্রতিভার যুগলবন্দি যদি এমনই থাকে, তবে ফ্রান্সকে থামানোর সমীকরণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে প্রতিপক্ষের জন্য।