মারকিনিওস থেকে গ্যাব্রিয়েল, গ্যাব্রিয়েল থেকে ডগলাস সান্তোস, সেখান থেকে মাঝমাঠে নেমে আসা মাতেউস কুনিয়া, আবার গ্যাব্রিয়েলের কাছে, যেন কোনো তাড়াহুড়ো নেই। হঠাৎই বদলে গেল গতি। দানিলোর লাইন ভাঙা পাস, লুকাস পাকেতার এক টাচ, কাসেমিরোর নিখুঁত থ্রু, ব্রুনো গিমারাইসের শক্তিশালী দৌড়। তিন স্কটিশ ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে শেষ মুহূর্তে পাশে ছেড়ে দেয়া বল। পেছন দিক থেকে ছুটে আসা কুনিয়ার নিখুঁত প্লেসমেন্ট। মাত্র ২৫ সেকেন্ডে তৈরি হওয়া গোলটি ছিল পুরো ম্যাচের সারাংশ। এটাই তো ব্রাজিলের সেই বিখ্যাত ‘জোগো বনিতো’, যা প্রতিপক্ষকে শুধু হারায় না, মুগ্ধও করে।

স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল। কিন্তু ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে তাদের খেলার ধরন। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে সেলেসাওরা শুধু জিতছে না, খেলছে এমন ফুটবল, যা অনেক দিন ধরেই ব্রাজিল সমর্থকরা দেখতে চেয়েছিলেন।

মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে। ব্রাজিল বাম দিক দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলে। দ্রুত পাস আদান-প্রদানের পর বল আসে ভিনিসিয়ুসের কাছে। স্কটিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তিনি ডান পায়ের শটে গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গানকে পরাস্ত করেন। শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্রাজিলের হাতে চলে যায়।

গোল হজমের পর স্কটল্যান্ড কিছুটা উঁচুতে উঠে প্রেস করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতেই তাদের রক্ষণে জায়গা তৈরি হতে থাকে। ব্রাজিল মাঝমাঠে কাসেমিরো, পাকেতা ও ব্রুনো গিমারাইসের মাধ্যমে একের পর এক লাইন ভাঙা পাস খেলতে থাকে। ভিনিসিয়ুস ও উইং দিয়ে ওঠা ডগলাস সান্তোস বারবার স্কটল্যান্ডের ফুল-ব্যাকদের ব্যস্ত রাখেন। বিরতির ঠিক আগে আসে দ্বিতীয় গোল। এবারো আক্রমণের সূচনা মাঝমাঠ থেকে। দ্রুতগতির কয়েকটি পাসে স্কটল্যান্ডের প্রেস ভেঙে যায়। শেষ মুহূর্তে বল পেয়ে ভিনিসিয়ুস ঠাণ্ডা মাথায় ফিনিশ করেন। প্রথমার্ধেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ব্রাজিল, আর স্কটল্যান্ডের ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ার্ধে স্কটল্যান্ড কিছুটা আগ্রাসী হয়ে উঠলেও ব্রাজিল তাতে বিচলিত হয়নি। বরং বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে আরো ক্লান্ত করে তোলে। ম্যাচের ৬০ মিনিটের পর আসে সেই নান্দনিক মুহূর্ত। নিজেদের অর্ধে টানা কয়েকটি পাসে স্কটল্যান্ডকে একদিকে টেনে এনে হঠাৎ গতি বাড়ায় আনচেলত্তির দল। দানিলো, লুকাস পাকেতা ও কাসেমিরোর দ্রুত ওয়ান-টাচ পাসে ব্রুনো গিমারাইস বক্সে ঢুকে তিন ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে নেন। এরপর নিঃস্বার্থ এক পাসে পেছন থেকে উঠে আসা মাতেউস কুনিয়াকে বল বাড়িয়ে দেন। কুনিয়া সহজ ফিনিশে ৩-০ করেন। মাত্র ২৫ সেকেন্ডের সেই দলীয় আক্রমণই যেন বহুদিন পর ব্রাজিলের ‘জোগো বনিতো’র ফিরে আসার ঘোষণা দেয়।

ম্যাচে আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল গতির নিয়ন্ত্রণ। প্রয়োজন হলে ধীর, প্রয়োজন হলে বিস্ফোরক। দীর্ঘ সময় বল নিজেদের কাছে রেখে স্কটল্যান্ডকে ক্লান্ত করে ফেলা, তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ গতির আক্রমণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে দেয়া। ছন্দের এ পরিবর্তনই স্কটিশদের সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলেছে।

কুনিয়া নিয়মিত স্ট্রাইকারের জায়গা ছেড়ে মাঝমাঠে নেমে আসছিলেন। পাকেতা ও ব্রুনো গিমারাইস মাঝের ফাঁকা জায়গা দখল করছিলেন। কাসেমিরো শুধু রক্ষণ সামলাননি, প্রথম পাস দিয়েও আক্রমণের গতি বাড়িয়েছেন। ফলে স্কটল্যান্ডের মিডফিল্ড বুঝতেই পারেনি কাকে মার্ক করবে। কেউ সামনে এলে পেছনে জায়গা তৈরি হয়েছে, আবার কেউ জায়গা ধরে রাখলে মাঝমাঠে সংখ্যাগত সুবিধা পেয়েছে ব্রাজিল। এ কৌশলই আনচেলত্তির ব্রাজিলকে আগের কয়েকটি বিশ্বকাপের দল থেকে আলাদা করছে। যেকোনো দিক থেকে, যেকোনো খেলোয়াড়ের মাধ্যমে আক্রমণ গড়ে উঠতে পারে।

আনচেলত্তির ব্রাজিলে বলই সবচেয়ে বড় তারকা। কার পায়ে বল আছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো বল কোথায় যাবে এবং পরের পাসটি কীভাবে রক্ষণ ভাঙবে। এ দর্শনই ব্রাজিলকে আবার পুরনো পরিচয়ের দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছে। ম্যাচ শেষে আনচেলত্তির কণ্ঠেও ফুটে উঠেছে সেই তৃপ্তি। ইতালিয়ান কোচ বলেন, ‘আমরা ভালো খেলেছি। হাইতির বিপক্ষে যেমন খেলেছিলাম, সেটিই আবার করতে চেয়েছিলাম। আজ আমরা আরো পূর্ণাঙ্গ একটি ম্যাচ খেলেছি এবং তাতে আমরা সন্তুষ্ট। এটাই জোগা বনিতো।’

যে হলুদ জার্সির জাদুকররা সবুজ গালিচায় মোহময় এক ঘোর তৈরি করতেন, যে ফুটবল দেখে রাতের পর রাত নির্ঘুম কেটে যেত শৈশব-কৈশোরে, সেই সাম্বার ছন্দ যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ২৫ সেকেন্ডের মায়াবী গোলটি হয়তো সেই জমে থাকা আক্ষেপেরই সবচেয়ে কাব্যিক উত্তর। হয়তো নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। নকআউটের আরো কঠিন পরীক্ষার পাহাড় ডিঙাতে হবে তাদের। তবে এ ২৫ সেকেন্ডের ফুটবল-সিম্ফোনি দেখার পর অন্তত এটুকু বলা যায়, অনেক দিনের তৃষ্ণার্ত অপেক্ষার পর শিল্পের ক্যানভাসে সেই পুরনো ‘জোগো বনিতো’র দেখা মিলল।

কে জানে, হয়তো জাদুকরী সেই ব্রাজিল সত্যিই ফিরে এসেছে!