চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক, বুন্দেসলিগা অভিষেকে হ্যাটট্রিক, প্রিমিয়ার লিগ অভিষেকে জোড়া গোল। এবার সে তালিকায় যুক্ত হলো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপও। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ের জার্সিতে প্রথম ম্যাচেই ইরাকের বিপক্ষে করলেন দুই গোল। যেন এতদিনের অপেক্ষার সব হিসাব এক রাতেই মিটিয়ে দিলেন। তার জোড়া গোলে গতকাল সকালে গ্রুপ আই ম্যাচে ইরাককে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে নরওয়ে।
কাতার বিশ্বকাপ যখন চলছিল তখন তিনি ছিলেন টেলিভিশনের সামনে। ইউরো ২০২৪-এও দর্শক হিসেবেই সময় কাটাতে হয়েছে। কারণ তার দেশ নরওয়ে বারবার বড় টুর্নামেন্টের যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর গোলদাতা হয়েও তাই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় আলো থেকে দূরে ছিলেন তিনি। অবশেষে চলতি বিশ্বকাপে সে অপেক্ষার অবসান হয়েছে।
ইরাকের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে নরওয়ের প্রথম দুই গোলই এসেছে তার পা থেকে। প্রথমার্ধে নরওয়ের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। ২৯ মিনিটে ডেভিড মোলার উলফের নিচু ক্রসে বক্সের ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের স্পর্শে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করেন হালান্ড। তবে নরওয়ের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আয়মান হুসেইনের দুর্দান্ত হেডে সমতায় ফেরে ইরাক। কিন্তু নরওয়ে দ্রুতই আবার এগিয়ে যায়। ইরাকের গোলরক্ষক জালাল হাসানের ভুল ব্যাকপাসের সুযোগ নিয়ে বল ছিনিয়ে ফাঁকা জালে ঠেলে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন হালান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ের আধিপত্য আরো স্পষ্ট হয়। দ্বিতীয়ার্ধে মার্টিন ওদেগার্দের কর্নার থেকে লিও অস্টিগার্ডের শক্তিশালী হেডে ব্যবধান ৩-১ হয়। ম্যাচের শেষ দিকে আবারো আক্রমণের সূচনা করেন হালান্ড। তার হেড গোলমুখে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করলে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই পাঠিয়ে দেন ইরাকের আয়মান হুসেইন। আত্মঘাতী ওই গোলেই ৪-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে নরওয়ে।
নরওয়ের জার্সিতে হালান্ডের গোল সংখ্যা এখন রীতিমতো অবিশ্বাস্য মাইলফলকে পৌঁছেছে। মাত্র ৫১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ৫৭টি গোল নামের পাশে যুক্ত করে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের অবস্থান আরো পাকাপোক্ত করেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে এমন গোল-প্রতি-ম্যাচ হার খুব কম খেলোয়াড়ের আছে। গার্ড মুলার, সান্দর কোচিশ কিংবা অন্য কিংবদন্তিদের সঙ্গে এখন তার নাম একই আলোচনায় উচ্চারিত হচ্ছে। বয়স মাত্র ২৫, অথচ এরই মধ্যে নরওয়ের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
সতীর্থ সান্ডার বের্গে হালান্ডকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ম্যাচের বাইরে তাকে দেখে বোঝাই যায় না তিনি পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকার। কিন্তু খেলা শুরু হলেই বদলে যান। তখন তার মধ্যে শুধু ক্ষুধা কাজ করে। গোলের ক্ষুধা, জয়ের ক্ষুধা, নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষুধা। বের্গের ভাষায়, ‘সে একটা জন্তু।’
ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচেও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রথমার্ধে অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বল সবচেয়ে কম (মাত্র ১১ বার) স্পর্শ করেও ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রভাবক ছিলেন তিনি।
ইরাকের কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডও ম্যাচ শেষে হালান্ডের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন।
হালান্ডকে তার দেখা অন্যতম সেরা ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, হালান্ডের মতো স্ট্রাইকার থাকলে নরওয়ে এ বিশ্বকাপে অনেক দূর যেতে পারে এবং বড় বড় দলকে চমকে দিতে পারে।
প্রথম পরীক্ষায় তিনি উতরে গেছেন অনায়াসে। কিন্তু বিশ্বকাপ মাত্র শুরু। সামনে আছে সেনেগাল, আছে ফ্রান্স, আছে আরো বড় চ্যালেঞ্জ। তবু প্রথম রাতের আলো ঝলমলে পারফরম্যান্স একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—বিশ্বকাপের মঞ্চও হালান্ডের জন্য খুব বড় নয়।














