কিন্তু বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, আর্জেন্টিনা শিবিরে একটি প্রশ্নও তত জোরালো হচ্ছে, মেসি ছাড়া গোল করবে কে? রেকর্ড, গোল, ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স—সবকিছুতেই মেসি। কিন্তু ম্যাচটি বিশ্লেষণ করলে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে—মেসি নিখুঁত ছিলেন, কিন্তু আর্জেন্টিনা কি সত্যিই ততটা নিখুঁত ছিল?

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষের ম্যাচের শুরুটাই সহজ ছিল না। তৃতীয় মিনিটেই পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসির শট পোস্টের বাইরে চলে যায়। এরপর আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে অস্ট্রিয়া। প্রথম ১৫ মিনিট ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ বলের দখলে ছিল তাদের। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এতটা সময় ধরে খেলার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা সহজ নয়। কিন্তু রালফ রাংনিকের দল সেটাই করেছে। এ পর্যায়ে জাভের শ্লাগারের শতভাগ সফল পাসিং আর্জেন্টিনার প্রেসিং ভেঙে দেয়। একপর্যায়ে গোলমুখে মেসির একটি শটও প্রতিহত করেন।

প্রথম ৩০ মিনিটে অস্ট্রিয়া ফাইনাল থার্ডে প্রবেশ করেছে আটবার, যেখানে আর্জেন্টিনা ছয়বার। এ সময় আর্জেন্টিনার পুরো দল মিলে মাত্র একটি ড্রিবলের চেষ্টা করে, অস্ট্রিয়া করে ছয়বার। ডেভিড আলাবা ও কেভিন ডানসোর রক্ষণভাগও দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর ছিল। মেসি জায়গা পাচ্ছিলেন না, আর আর্জেন্টিনার আক্রমণও বারবার বক্সের আশপাশে আটকে যাচ্ছিল।

রাংনিকের কৌশলও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আক্রমণের সময় অস্ট্রিয়া খেলেছে ৪-২-৪ ফরম্যাটে। কিন্তু বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সেটি ৪-৪-২ ডিফেন্সে রূপ নিয়েছে। এ কৌশল এতটাই কার্যকর ছিল যে ডি পলের মতো খেলোয়াড়ও ফাইনাল থার্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে মাত্র ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ সফলতা পেয়েছেন। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডের প্রাণকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। তবে স্কালোনির দল ধীরে ধীরে তার সমাধান বের করে ফেলে। থিয়াগো আলমাদা ভেতরে ঢুকে আসায় ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ ও ডি পলের সঙ্গে মাঝমাঠে চার বনাম তিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে প্রথমার্ধের শেষ দিকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আর্জেন্টিনার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।

এ সময়ে আর্জেন্টিনাকে বাঁচিয়ে রাখেন মেসি। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফাকুন্দো মেদিনার নিচু ক্রস থেকে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন তিনি, যা ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। প্রথমার্ধের শেষ ১৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা ৭২ শতাংশ বলের দখল ধরে রাখে। মার্তিনেজকে কার্যত কোনো কাজই করতে হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা আবারো অস্ট্রিয়ার। বিরতির ২ মিনিটের মধ্যেই মার্তিনেজকে সেভ করতে হয়। এরপর মার্সেল সাবিৎজারের একটি শক্তিশালী ফ্রি কিকও ঠেকাতে হয় তাকে। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আর্জেন্টিনা। আলমাদা ও ম্যাক অ্যালিস্টার নিজেদের তিনটি ট্যাকলের মধ্যে দুটি করে জেতেন। ফার্নান্দেজ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফাইনাল থার্ডে ১২টি সফল পাস দেন। ফলে অস্ট্রিয়ার ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

আর্জেন্টাইন রক্ষণে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। মাঠ ছাড়ার আগে তিনি ফাইনাল থার্ডে প্রায় শতভাগ পাস সফল করেছেন। পাঁচটি ক্লিয়ারেন্স, দুটি ইন্টারসেপশন করেছেন ও পুরো ম্যাচে ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ পাস সম্পন্ন করেন। বদলি হিসেবে নেমে নিকো গনসালেস আর্জেন্টিনার আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেন। ম্যাচের প্রথম কর্নার থেকেই তার হেড অল্পের জন্য বাইরে যায়। পরে আরেকটি প্রচেষ্টাও কোনোমতে প্রতিহত করে অস্ট্রিয়ার রক্ষণ।

তবে পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার ধারালো, সবচেয়ে বিপজ্জনক ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য একমাত্র অস্ত্র ছিলেন মেসি। তিনি একাই নিয়েছেন সাতটি শট। পুরো অস্ট্রিয়া দল মিলেও নিতে পারেনি এত শট। তিনি ১৫ বার ওয়ান অন ওয়ান পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যা ম্যাচে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর মধ্যে নয়টিতে সফল হয়েছেন। গোল করেছেন দুটি।

কিন্তু লাউতারো, আলভারেজরা সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেননি। ম্যাচের শেষ দিকে অস্ট্রিয়া যখন সমতায় ফিরতে, তখনো আর্জেন্টিনা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ছিল না। যোগ করা সময়ে প্যাট্রিক উইমারের একটি হেড অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে যায়। সেটি গোল হলে ম্যাচের সমাপ্তি ভিন্নরকম নাটকীয়তাও পেতে পারত। অবশ্য শেষ কথা বলার দায়িত্বও নেন মেসি। যোগ করা সময়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করে সব অনিশ্চয়তা দূর করেন ৩৮ বছর বয়সী এ ফরওয়ার্ড।

ফলাফল বলছে, আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জিতেছে। কঠিন ম্যাচে ধৈর্য ধরে থাকার, চাপ সামলে ওঠার ও সুযোগ এলে ম্যাচ শেষ করে দেয়ার সামর্থ্যও দেখিয়েছে স্কালোনির দল। তবে অস্ট্রিয়ার সংগঠিত প্রেসিং, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, আর্জেন্টিনার আক্রমণে মেসিনির্ভরতা ও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দুর্বলতা—সব মিলিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের খাতায় কিছু নম্বর কাটা পড়বেই। মেসি হয়তো দশে দশ পেয়েছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে পূর্ণ নম্বর দেয়ার সময় হয়তো আসেনি।