হাজার বছর আগে নর্ডিক যোদ্ধারা যখন অজানা সমুদ্রে নামত, পাল নামিয়ে দাঁড় টানত একসঙ্গে, এক ছন্দে। সেই দাঁড় টানার স্মৃতি ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে হঠাৎ ফিরে এল নতুন রূপে! নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারানোর পর আর্লিং হালান্ড আর মার্টিন ওডেগার্ডের নেতৃত্বে নরওয়ের পুরো দল মাঠের ঘাসে বসে পড়ল। ড্রামের তালে শুরু হলো শূন্যে দাঁড় টানা। মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক প্রাচীন ভাইকিং রণতরী উত্তাল সমুদ্রের বুক চিরে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আটলান্টিকের পাড় থেকে নিউইয়র্কের জনারণ্য, কিংবা লাতিন আমেরিকার কোনো নিভৃত পানশালা—সবখানেই আছড়ে পড়ছে এ উদ্যাপনের ঢেউ।
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে নরওয়ে। গ্রুপ আইতে ইরাককে ৪-১ গোলে হারিয়ে শুরু, তারপর সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা। কিন্তু মাঠের ফলাফলের চেয়েও বড় আলোচনা তৈরি করেছে তাদের উদযাপন। ম্যাচ শেষে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হালান্ড, ওডেগার্ড, সোরলথসহ পুরো দল সবাই মাঠের ঘাসে বসে গেলেন পাশাপাশি। মার্টিন ওডেগার্ড একটি ড্রাম বাজাতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে সবাই দুই হাত সামনে-পেছনে টানতে লাগলেন যেন অদৃশ্য কোনো দাঁড় টানছেন। গ্যালারি থেকে এ দৃশ্য দেখে সমর্থকরাও বসে পড়লেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, একই তালে হাত টানলেন। স্টেডিয়ামের হাজার হাজার মানুষ যেন মুহূর্তের মধ্যে একটিই বিশাল লংশিপে চড়ে বসল। ভাইকিং যুগের সেই কাঠের রণতরী, যা একসময় স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড পেরিয়ে আটলান্টিক পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছিল।
এ উদযাপনের শিকড় আরো গভীরে। নরওয়েজিয়ান সমর্থক ওলে ফ্রয়েস্তাদ নিজেকে এ উদযাপনের অন্যতম উদ্যোক্তা বলে দাবি করেন। তার মতে, এটা হাজার বছর পুরনো কথা। ভাইকিংরা যখন তীরে পৌঁছাত, পাল নামিয়ে দাঁড় নামাত। যুদ্ধের ঠিক আগে তারা এভাবেই বাইত। এটা দলকে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দেয়।
ভাইকিং রো শুধু স্টেডিয়ামে আটকে থাকেনি। বোস্টনের সাউথ স্টেশনে দর্শকরা এস্কেলেটরে পাশাপাশি বসে একসঙ্গে দাঁড় টানলেন। ওপর থেকে দেখতে সত্যিই মনে হচ্ছিল একটি দীর্ঘ জাহাজ চলছে। নিউইয়র্কের সাবওয়েতে লাল জার্সি পরা নরওয়েজিয়ানরা সহযাত্রীদের নিয়ে বসে পড়লেন ট্রেনের মেঝেতে। টাইমস স্কয়ারের বিশাল আলোকিত চত্বরে শতাধিক মানুষ এক কণ্ঠে ‘রো-রো-রো’ বলতে বলতে হাত টানলেন। গগনচুম্বী বিজ্ঞাপনের আলোয় সেই দৃশ্য যেন বাস্তব নয়, কোনো চলচ্চিত্রের ফ্রেম। ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি ভিউ পেরিয়ে গেল।
নরওয়ের পার্লামেন্টও বাদ গেল না। বার্ষিক অধিবেশনের শেষ দিনে পার্লামেন্টের সদস্যরা তাল ধরলেন, আর দলমত নির্বিশেষে সাংসদরা কাল্পনিক দাঁড় হাতে তুলে নিলেন। বাম থেকে ডান, বিরোধী থেকে ক্ষমতাসীন সবাই এক ছন্দে। এরপর ভাইকিং রো পেরিয়ে গেল আটলান্টিক। ব্রাজিলের মিনাস জেরাইস রাজ্যের পাসোস শহরের একটি সাধারণ বারে মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে বসল, শূন্যে দাঁড় টানা। কেউ নরওয়েজিয়ান না হয়েও। হাসপাতালের কর্মীরা ক্যামেরায় ধরলেন নিজেদের উদযাপন। নরওয়ের শিশুরা রাস্তায় বসে করল একই অনুকরণ। পাথর বিছানো একটি গলিতে অচেনা মানুষেরা পথচলতি লোকেদের টেনে নিয়ে বসালেন, আর এক মুহূর্তেই তারাও হয়ে গেলেন ওই কাল্পনিক জাহাজের নাবিক।
খেলোয়াড়রা নিজেরাও বিস্মিত। মিডফিল্ডার প্যাট্রিক বার্গ বলেছেন, শুরুতে সন্দেহ ছিল এটা টিকবে কিনা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা আমাদের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অংশ হয়ে গেছে। নিউইয়র্কে এটা করতে পারা সত্যিই অসাধারণ একটা মুহূর্ত।
ফরওয়ার্ড আলেকজান্ডার সোরলথ বললেন, শব্দটা যখন উঠে আসে, তখন সত্যিই একটা জাদু অনুভব হয়। সেনেগালের বিরুদ্ধে জয়ের পর হালান্ড আর ওডেগার্ড যখন দলকে একত্র করলেন, কোচ স্তোলে সোলবাকেন ড্রেসিং রুমে না গিয়ে দৌড়ে উঠে গেলেন গ্যালারিতে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর নেমে এলেন দলের মাঝে বসতে। ড্রামের তালে শুরু হলো রো-রো-রো।
উদযাপনটির পেছনে আছে নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (এনএফএফ) পরিকল্পনা। তারা ভাইকিং ঐতিহ্যকে দলের পরিচয় হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। তবে যুদ্ধের হিংস্রতা নয়, বরং যাত্রার সাহস, শক্তি এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবে। ভাইকিং প্রত্নতাত্ত্বিক হান্নে লুভিসে আনেস্তাদ বলেছেন, ফেডারেশন কেবল যোদ্ধার ভাবমূর্তি চায়নি, চেয়েছিল এগিয়ে যাওয়ার মনোভাব, সংহতি এবং পরস্পরকে এগিয়ে নেয়ার শক্তি।
তবে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন এ ভাইকিং উপস্থাপনা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক। সমালোচক ও কলামিস্ট ইয়ানে স্তিগেন দ্রাংশোল মনে করেন, তলোয়ার-শিরস্ত্রাণের এ আয়োজন একটি পুরুষতান্ত্রিক নান্দনিকতা তৈরি করে। কমেডিয়ান আমির আসগারনেজাদ উল্লেখ করেছেন, ভাইকিং চিহ্ন কখনো কখনো চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোও ব্যবহার করে, তাই উদযাপনটি সবাইকে একত্র করে কিনা সেটা ভেবে দেখার দাবি রাখে।
তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে ভাইকিং রো এখন আর শুধু নরওয়ের উদযাপন নয়; এটি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন ভাষা। হাজার বছর আগে যে ছন্দে নর্ডিক নাবিকেরা অজানা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল, সেই একই ছন্দ আজ ব্রাজিলের একটি ছোট শহরের বার থেকে শুরু করে বোস্টনের ট্রেনস্টেশন, নিউইয়র্কের জনাকীর্ণ চত্বর পর্যন্ত মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে দিচ্ছে। বিশ্বকাপ বারবারই এমন কিছু মুহূর্তের জন্ম দেয়, যেখানে কোনো দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি কিংবা পরিচয় হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে বৈশ্বিক ভাষা। নরওয়ে এবার তার ভাইকিং ঐতিহ্যকে ফুটবলের মঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। আর বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ সে যাত্রায় সঙ্গী হয়ে বসেছে একই নৌকায়—হাত তুলেছে, ছন্দ মিলিয়েছে আর একসঙ্গে দাঁড় টেনেছে।














