বন্ধুত্ব আর বন্ধুবিচ্ছেদ নিয়ে বহু গল্প আছে। বলিউডের সিনেমায়ও গল্পটা পরিচিত। অনেকগুলো সিনেমা হয়েছে এ থিমের ওপর ভিত্তি করে। আর বন্ধুত্ব যেখানে, সেখানে থাকে বিচ্ছেদও। কিশোর কুমারের গলায় আমরা শুনেছি, ‘জাব জিস ওয়াক্ত কিসি ইয়ার কা, ইয়ার জুদা হোতা হ্যায়/ কুছ না পুছো ইয়ারো দিল কা হাল বুরা হোতা হ্যায়/ দিল পে ইয়াদো কে জ্যায়সে তীর চালতা হ্যায়।’ খুব উঁচু দরের লিরিক না হলেও আরডি বর্মণের সুর ও কিশোর কুমারের গলায় গানটি যে কাউকে স্মৃতিকাতর করে তোলে। গানটি ১৯৭৩ সালের ‘নামাক হারাম’ সিনেমায় রাখা হয়েছিল। রাজেশ খান্না ও অমিতাভ বচ্চন অভিনীত সিনেমাটি ১৯৭৩ সালে বলিউডে জনপ্রিয় ও আর্থিকভাবে সফল হয়েছিল। অমিতাভ-রাজেশ জুটির এটি ছিল দ্বিতীয় সিনেমা। এর আগে তারা ঋষিকেশ মুখার্জির আনন্দে অভিনয় করেছিলেন।

ঋষিকেশের ‘আনন্দ’কে আজ অবধি বলিউডের অন্যতম সেরা সিনেমা ধরা হয়। রাজেশ ও অমিতাভের সম্পর্ক এ সিনেমায় প্রচলিত বন্ধুত্বের সংজ্ঞা মেনে চলে না। এক তরুণ ডাক্তার (অমিতাভ) ও মরণাপন্ন রোগীর (রাজেশ) মধ্যকার রসায়নের চমত্কার উপস্থাপন ছিল ‘আনন্দ’। এরপর নামাক হারামে তাদের রসায়ন আরো গভীর হয়। অনস্ক্রিন রসায়নের ক্ষেত্রে অবশ্য আজ অবধি সবচেয়ে জনপ্রিয় বন্ধু জুটি জয়-বীরু। অমিতাভ-ধর্মেন্দ্রর একত্র অ্যাডভেঞ্চার, খুনসুটি, প্রেম সবকিছু এ সিনেমাকে বিশেষ করে তুলেছিল। এখনো শোলের ‘ইয়ে দোস্তি’ গাইতে গাইতে পথে হাঁটতে হাঁটতে গুলতানি মারে বহু তরুণ।

তবে বন্ধুত্বের এ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বলিউড বেশ ক্লিশে। সব গল্পেই ‘দোস্ত, দোস্ত না রাহা’ (বন্ধু আর বন্ধু রইল না) বিষয়টি এনে ফেলা হয়। গানটি রাজ কাপুর, বৈজয়ন্তীমালা ও রাজেন্দ্র কুমার অভিনীত সঙ্গম (১৯৬৪) সিনেমায় ফিচার করা হয়েছিল। এক নারী নিয়ে দুই বন্ধুর বিচ্ছেদের প্রচলিত এ গল্প এসেছে এর আগে ও পরের বহু সিনেমায়। ত্রিকোণ প্রেম বা লাভ ট্রায়াঙ্গল থেকে খুব কম ক্ষেত্রেই বেরিয়েছে বলিউড। কমল হাসান, ঋষি কাপুর অভিনীত ‘সাগর’, সঞ্জয় দত্ত ও সালমান খান অভিনীত সাজান সিনেমা একই ধারায় তৈরি। অবশ্য ‘সিলসিলা’ ও ‘দেবদাস’ কিছুটা ভিন্ন, কিন্তু সেখানে মূল চরিত্রদের মধ্যে বন্ধুত্বের বিষয়টি ছিল না।

এদিক থেকে কুন্দন শাহর স্যাটায়ার ‘জানে ভি দো ইয়ারো’র গল্পটি ভিন্ন। নাসিরউদ্দিন শাহ ও রবি বাসওয়ানির অনস্ক্রিন বন্ধুত্ব এখানে এসেছে। সিনেমার গল্পে দুই দুর্ভাগা ফটোগ্রাফারকে জীবনসংগ্রাম করতে দেখা যায়। এর মধ্যে আবার তারা মুম্বাইয়ে বড় কোনো কাজ করবে বলে বিশ্বাস করে। সতীশ কৌশিক, বিধু বিনোদ চোপড়া, সতীশ শাহকে নিয়ে নির্মিত এ সিনেমায় দর্শককে চমত্কার একটি স্যাটায়ার উপহার দিয়েছেন কুন্দন শাহ। এর মধ্য দিয়ে বিশেষ হয়ে উঠেছে মূলত নাসিরউদ্দিন শাহ ও রবি বাসওয়ানির অভিনয় ও তাদের বন্ধুত্ব।

বলিউডের বন্ধুত্বের গল্প নিয়ে সিনেমার অভাব নেই। এর মধ্যে ‘দোস্তি’, ‘দোস্তানা’, ‘ইয়ারানা’, ‘জালওয়া’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘কাই পো চে’—বহু নাম নেয়া যায়। এর মধ্যে ‘দোস্তানা’ এ নতুন শতাব্দীর নতুন বিষয়কে উপজীব্য করে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। সিনেমাটি ছিল মূলত কমেডি। তবে কমেডির মধ্য দিয়ে নানা জটিল বিষয় এসেছিল। কিন্তু সেখানে শেষ পর্যন্ত মূল বিষয় হয়ে উঠেছিল জন আব্রাহাম ও অভিষেক বচ্চনের রসায়ন। বন্ধু হিসেবে তাদের যোগাযোগ, সহমত হওয়া, দ্বিমত হওয়া থেকে শুরু করে দ্বৈরথ, সব মিলিয়ে এ দুই অভিনেতার যুগ্ম হওয়া একটি সাধারণ গল্প দর্শককে অসাধারণ অভিজ্ঞতা দিয়েছিল। সেকাল অর্থাৎ ষাট বা সত্তরের দশকের সঙ্গে এ শতাব্দীর সিনেমার ক্ষেত্রে কিছু কিছু অনুষঙ্গে পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু মূল গল্পটির মধ্যে মিল থাকে। ‘ইয়ারানা’ কিংবা ‘জানে ভি দো ইয়ারো’য় মূল ছিল বন্ধুর জন্য বন্ধুর জীবনে অবদান। ‘সঙ্গম’, ‘দোস্তানা’র মতো সিনেমায় কোনো না কোনোভাবে দুই পুরুষের বন্ধুত্বের মধ্যে এক নারী এসে পড়ে।

এগুলো ছিল মোটামুটি দুজন পুরুষের বন্ধুত্বের গল্প। যদিও বন্ধুত্বের লিঙ্গভেদ করা উচিত নয়। তবে বন্ধুত্বের দুর্দান্ত গল্প ছিল ‘কাই পো চে’, ‘দিল চাহতা হ্যায়’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘তেরে মেরে সাপনে’ ও ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’য়। সিনেমাগুলোয় তিন কিংবা একাধিক বন্ধুর একত্র অ্যাডভেঞ্চার (জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা, দিল চাহতা হ্যায়), জীবনসংগ্রাম (কাই পো চে ও থ্রি ইডিয়টস) এসেছে। এর মধ্যে থ্রি ইডিয়টসে দেখানো কলেজজীবনের বন্ধুত্ব দর্শককে যেভাবে যুক্ত করেছে তা বিগত কয়েক দশকে অন্য কোনো সিনেমা পারেনি। রাজকুমার হিরানীর সিনেমাটি তাই সব বয়সের দর্শকের কাছে প্রিয়। আমির খান, মাধবন ও শারমান জোশী দর্শকদের মন জয় করেছেন। জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবিয়েছেন জয়া আখতার। হূতিক রোশন, ফারহান আখতার ও অভয় দেওলের মধ্যে দর্শক নিজেদের খুঁজে পেয়েছে।

বন্ধুত্বে লিঙ্গভেদ করার কিছু নেই, কিন্তু বলিউডে নারীদের বন্ধুত্ব বা বান্ধবী মহল সেভাবে আবিষ্কৃত হয়নি। নানা সিনেমায় খণ্ডাকারে এসেছে তা। ‘ভিরে দি ওয়েডিং’, ‘ককটেল’, ‘ডোর’, ‘পিঙ্ক’, ‘এক লাড়কি কো দেখা তো...’ প্রভৃতি সিনেমায় তা কিছুটা দেখা যায়। এর বাইরে শিশুতোষ বা কিশোরদের বন্ধুত্ব (অ্যাডভেঞ্চার বাদে) নিয়ে সিনেমা হয়েছে খুবই কম। এদিকটা নিয়ে বলিউডের আলাদা করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।