সিনেমায় নতুন ধারা এনেছিলেন তিনি। আর্ট ফর আর্টস সেক শুধু নয়, তার সিনেমা রাজনৈতিক। ‘নুভেল ভাগ’-এর তিনি ছিলেন অন্যতম কাণ্ডারি। ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ নামে পরিচিত এ আন্দোলন থেকে গদারের উত্থান বললে ভুল বলা হয় না। ফুল লেন্থ, ফিচার ফিল্ম, শর্টফিল্ম মিলিয়ে তার নির্মাণের সংখ্যা শতাধিক। দীর্ঘজীবনে তিনি সিনেমার জন্য নিজেকে নিবেদন করেছেন আর সিনেমা জগতে দিয়েছেন ভিন্ন ধারা। গদার আর সিনেমা তাই সমার্থক হয়ে ওঠে। তবে প্রথাগত সিনেমা নয়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সিনেমায় গদার এনেছিলেন তার নিজস্ব চিন্তা। সে চিন্তা মানুষের জীবন ও মানসিক জটিলতা থেকে শুরু করে ফরাসি সমাজ ও রাজনীতিকে নিয়ে এসেছেন। কিংবদন্তি হয়েছেন তার জীবৎকালেই। আর সে বর্ণাঢ্য জীবন তিনি শেষ করলেন গতকাল।
৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন জ্যঁ লুক গদার। বলার অপেক্ষা রাখে না গদার তার সময়ের সেরা একজন নির্মাতা। ১৯৬০ সালে নির্মিত ব্রেদলেস তাকে সিনেমা জগতে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ভিবরে সি ভিয়ে, কনটেম্পট, আলফাভিলের মতো সিনেমা নির্মাণ করেছেন তিনি। বলা হয় তিনি পরিচালকদের পরিচালক।
গদারের জন্ম ১৯৩০ সালের ৩ ডিসেম্বর। তিনি সুইজারল্যান্ডের নিয়নে বেড়ে ওঠেন। শহরটি লেক জেনেভার তীরে অবস্থিত। আর পাঁচটি ইউরোপীয় কিশোরের মতোই ছিল তার শৈশব। কিন্তু বদলটা আসে যখন তিনি ১৯৪৯ সালে ফ্রান্সে ফেরেন। দেশে ফিরে এসে তিনি সিনে ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন। ফ্রান্সে তারা নতুন এক ধরনের সিনেমার কথা ভাবছিল। এ সময় সমালোচক আঁদ্রে ব্যাজে, ফ্রান্সিস ত্রুফো, ক্লড ক্যাব্রল ও জ্যাক রিভের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। নতুন ধারা নিয়ে নিরীক্ষায় আগ্রহী গোষ্ঠীর তিনি অন্যতম সদস্য। ‘কায়ে দ্যু সিনেমা’ নামে তাদের গ্রুপটি পরিচিত। এদের সঙ্গে গদার ম্যাগাজিনে সিনেমার সমালোচনা লিখতে শুরু করেন এবং দ্রুতই সমালোচক হিসেবে মনোযোগ আকর্ষণ করেন।
সমালোচক থেকে নির্মাতা হওয়ার আগে তিনি একটা মোটামুটি প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে গেছেন। ১৯৬০ সালে ব্রেথলেস নির্মাণের আগে তিনি বেশকিছু শর্টফিল্ম নির্মাণ করেন। সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি ত্রুফোর আইডিয়া ব্যবহার করেছিলেন। এক পাতি অপরাধী ও তার প্রেমিকাকে নিয়ে ত্রুফো একটা গল্প ভেবেছিলেন কিন্তু সেটি নিয়ে আর এগোননি। ত্রুফোর অনুমতি নিয়ে গদার এ সিনেমায় হাত দেন। ১৯৫৯ সালের প্যারিসের পটভূমিতে এ সিনেমার গদার কৃত্রিম আলোর ব্যবহার খুবই কম রেখেছিলেন। আরেকটি বিষয় ছিল প্রতিদিনের চিত্রনাট্য সেদিনই লেখা হতো। গদারের ন্যারেটিভ ও ক্যামেরার কাজের পাশাপাশি গল্পের উপস্থাপনের জন্য সিনেমাটি সে সময়ের অন্যতম বাস্তবধর্মী সিনেমা হিসেবে সবার কাছে গণ্য হয়। এ সিনেমা দিয়েই অভিনেতা জ্যঁ-পল বেলমন্দো একজন স্টার হয়ে ওঠেন আর বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গদার জিতেছিলেন সিনেমা পরিচালকের পুরস্কার।
সিনেমার ধারা বদলের এক ধরনের ইচ্ছে ছিল গদার ও তার সময়ের পরিচালকদের। গদার, ত্রুফোদের ‘কায়ে দ্যু সিনেমা’ বিশ্বাস করত সিনেমা আসলে চিত্রকলার মতো বিমূর্ত হয়েও উপন্যাসের মতো বিস্তৃত হবে। যদিও ত্রুফো একে কোনো আন্দোলন বা থিওরি হিসেবে প্রচার করতেন না কিন্তু ‘কায়ে দ্যু সিনেমা’ নিজস্ব একটি ধারা হয়ে উঠেছিল। সে ধারায় ত্রুফোর মতো পরিচালকরা সাধারণ দর্শকের কাছে কিছুটা অপরিচিত হলেও গদার জনপ্রিয় হন।
গদারের সিনেমা মানে ফ্রেমে ফ্রেমে চিত্রকলা। ন্যারেটিভ কিছুটা জটিল বলা যায়। কিন্তু সেখানে গদার জটিল হলেও স্পষ্ট। তিনি সিনেমাকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল সমাজকে কোনো না কোনোভাবে তুলে ধরা। ব্রেথলেসের পরে গদারের লা পেতি সোলদা ফরাসি সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়। সিনেমায় তিনি ফরাসি সরকারের নানা দমনমূলক নীতি থেকে সরে আসতে উপদেশ দিয়েছিলেন। ফরাসি সরকার সিনেমাটি ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। এ সিনেমা নির্মাণের সময় আনা কারিনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে তারা পরিণয়ে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
গদার কেন গুরুত্বপূর্ণ, এমন প্রশ্ন এ সময়ে এসে আর কেউ করে না। তবে এ কথা মনে রাখা দরকার যে আশির দশকে গদারের আবেদন কমতে শুরু করে। তার সিনেমায় থাকা রাজনৈতিক অবস্থান এর দৃঢ়তা হারায় এবং দর্শকের রুচির সঙ্গে তাল মেলাচ্ছিলেন না গদার। অবশ্য এরপর কিং লিয়ার (১৯৮৭) পুরনো গদারকে ফিরিয়েছিল সিনেমাপ্রেমীদের সামনে। এই ২০১০ সালেও সিনেমা নির্মাণ করেছেন গদার। সিনেমার নাম ছিল ফিল্ম সোশ্যালিজমে।
গদারের সিনেমার সৌন্দর্য দেখতে হলে তার সিনেমা নিয়ে কিছুটা ভাবতে হবে। ফ্রেম বুঝতে হবে। সিনেমায় তিনি নিজের সময়ে বেশকিছু উপাদান যুক্ত করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে নির্মিত আলফাভিলে সিনেমায় তিনি নয়্যার ঘরানার সঙ্গে সায়েন্স ফিকশনের ছোঁয়া রেখেছিলেন। গদারের সিনেমায় ফ্রান্স, ফরাসি মানুষ, সমাজ ও রাজনীতি থাকার কারণে তিনি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। সিনেমাকে যারা বদলে দিচ্ছিলেন, যাদের জন্য সিনেমা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে, তাদের মধ্যে গদারের নাম আসবেই। সে কারণেই বার্নার্দো বের্তোলুচির ২০০৩ সালের ‘দ্য ড্রিমারস’ সিনেমায় একটি চরিত্রের মুখে শোনা যায়, ‘গদার ইজ সিনেমা।’










