২০১৮ সালে শুটিং শুরু হওয়া সিনেমাটি করোনা মহামারীসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন আটকে ছিল। অবশেষে এটি এবার দর্শকের সামনে আসছে। এ চলচ্চিত্রের নানা বিষয় ও ভবিষ্যৎ কাজ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন নুরুল আলম আতিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান

‘মানুষের বাগান’ দেশে মুক্তির আগেই দিল্লি ও নিউইয়র্কের উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে। সিনেমার এ আন্তর্জাতিক অর্জনকে আপনি কীভাবে দেখেন?

বাংলাদেশের গল্প ভিনদেশে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের সঙ্গে অন্য ভাষার, অন্য দেশের মানুষ দেখছে, তাদের ভালো লাগছে, এটাই আমাদের কাছে খুশির খবর। পুরস্কার তো বরাবরই অনুপ্রেরণা। বর্তমানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র একটা উল্লেখযোগ্য সময় পার করছে। তার সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ নির্মাণ আয়োজনে আছে। আজকের তারুণ্য তার আপন আপন সিনেমা ভাষার অন্বেষণে নানা ধরনের নির্মাণকর্ম নিয়ে হাজির হয়েছেন বিদেশের ফেস্টিভ্যালে, দেশের সিনেমা হলে, ওটিটি, অনলাইন প্লাটফর্মে। এও এক বাংলাদেশের ‘সিনেমার বাগান’।

মূল ভাবনাটি আপনার মাথায় কীভাবে এল?

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, এ ভাষার প্রথম নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদের কবি লুই পার একটি চর্যার দুটি চরণ এমন, “কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥" আজকের বাংলায় যার মানে দাঁড়ায়—শরীর যদি একটি গাছ, পাঁচটি তার ডাল, উতলা হৃদয়ে এসে বসত গড়েন কাল। এ কাল হলো মহাকাল। এ কাল হলো আমাদের বিচ্যুতির কাল। ঘোর অমানিশা। ব্ল্যাকহোল। সর্বনাশের সূচনা। আমাদের যে পাঁচ ইন্দ্রিয় চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক—এরা যদি আমাদের চঞ্চল মনের ফাঁক গলে এ মানুষী জীবন দখল করে নেয়, তখন জীবন বিপন্ন হয়। বাংলাদেশের মানুষের, তা যেকোনো বর্গেরই হোক—বড়লোক, ছোটলোক, যে কারো বেলায় একই কথা প্রযোজ্য। শুধু বাংলাদেশ কেন, দুনিয়ার তাবৎ মানুষের বেলায় একই কথা সত্য। হয়তো এ কথাই মানুষের বাগান রচনার প্রাথমিক সূত্র।

চলচ্চিত্রটি পাঁচটি আলাদা গল্পে তৈরি, বিষয়টা যদি একটু খোলাসা করতেন।

মানুষের বাগানের লিখনের শুরুতে পাঁচটি আলাদা গল্প আমরা লিখি। এ গল্প বৃক্ষের নাম পরিচয় হলো এমন—‘মা: একটি নদীর নাম’, ‘রাগ: অনুরাগের অসুখ’, ‘প্রেম: দেহ-মনের যুগলবন্দী’, ‘নেশা: এক ছদ্মবেশী বন্ধু’, ‘স্বপ্ন: নুনের মতন ভালোবাসা’। কিন্তু যখন আমরা নির্মাণে গেলাম, তখন নদী আমাদের নতুন বিন্যাসে টেনে নিল। নদীমাতৃক বাংলাদেশের আপন কথা, তার সংগ্রাম, স্বপ্নঘেরা কাহিনীচিত্রের প্ররোচনা দিল। এখানে একটা বড় যোগসূত্র হয়ে এল শত বছরের পুরনো জলযান রকেট সার্ভিস লেপচা। এ প্যাডেল স্টিমারে ভিন্ন ভিন্ন গল্পের চরিত্রদের কেউ কেউ বা সবাই একটি দীর্ঘ নৌযাত্রায় সামিল হবেন।

২০১৮ সালে শুটিং শুরু হয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার জার্নিটা আপনার জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

তখনো ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ ও ‘পেয়ারার সুবাস’ চলচ্চিত্র দুটি অসমাপ্ত ছিল। সে জায়গা থেকে আমরা চেষ্টা করেছিলাম মানুষের বাগান চলচ্চিত্রকে সঠিক সময়ে শেষ করে দর্শকের সামনে প্রদর্শন করা।

আমরা শেষও করেছি। কিন্তু করোনা ও অন্যান্য কারণে মানুষের বাগানের প্রদর্শনী আটকে গেল। এটা আমার ও মানুষের বাগানের সব কলাকুশলীদের জন্য বেশ চাপের ছিল। সব পেরিয়ে চলচ্চিত্রটি এখন দেশের বাইরের দর্শক দেখছে, দেশের দর্শকও শিগগিরই দেখতে পারবে, এটা অনেকটা স্বস্তির।

এ সিনেমায় মনোজ ও স্পর্শিয়াসহ আরো গুণী অভিনয়শিল্পী আছেন, তাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মনোজ-স্পর্শিয়া ছাড়াও অনেক নতুন ও অভিজ্ঞ অভিনয়শিল্পীরা অভিনয় করেছেন। যেমন নাসির উদ্দিন খানেরও মানুষের বাগান প্রথম চলচ্চিত্র। দেশ-বিদেশে প্রশংসিত মোস্তফা মনোয়ার, জ্যোতিকা জ্যোতি, মনিরা মিঠু, শামীমা নাজনীন, জয়রাজ, প্রসূন আজাদ, স্বাগতা, হাসনাত রিপন, বাকার বকুল—এমন সব দুর্ধর্ষ অভিনেতা অভিনয় করেছেন। তুলনামূলকভাবে আমার অন্য কাজের চেয়ে মানুষের বাগানের চরিত্রগুলোকে নিজের মতো বিকশিত হতে দেখতে চেয়েছি।

সিনেমাটি হলের পর ওটিটি প্লাটফর্ম ‘আইস্ক্রিন’-এ মুক্তি পাবে। স্বাধীন ধারার সিনেমার জন্য ওটিটি মাধ্যমকে আপনি কতটা সম্ভাবনাময় মনে করেন?

ওটিটি সময়ের প্রয়োজনে সৃষ্টি হওয়া একটি মাধ্যম। এটাকে সিনেমার নয়া বাস্তবতা বলা যায়। সিনেমা হলের পরে ওটিটি মানুষের চলচ্চিত্র দেখাকে সহজ করে তুলেছে। স্বাধীন ধারা বা মূলধারা যেটাই বলি না কেন, সব চলচ্চিত্রের জন্যই ওটিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সিনেমা হলে না দেখতে পারা দর্শকের জন্য এটি একটি বিকল্প ব্যবস্থা। নেটফ্লিক্স, আমাজনসহ নানা ওটিটি মাধ্যমের জন্য সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে। তবে সিনেমা দেখার উপযুক্ত জায়গা প্রেক্ষাগৃহ।

দীর্ঘ বিরতির পর আপনার সিনেমা মুক্তি পেতে যাচ্ছে, এ বিরতির কারণ কী?

কিছুটা অলসতা, বাকিটা প্রযোজকদের আমার সিনেমা যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করতে না পারার ব্যর্থতা। নতুন যারা চলচ্চিত্র প্রযোজনা করছেন, তাদের সঙ্গে আমার একধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। ফলে আমার ভাবনাগুলো নিজের কাছেই থেকে যাচ্ছে। ভাবনাগুলো সিনেমার পর্দায় মুদ্রিত হতে পারছে না।

সিনেমাটি নিয়ে দর্শককের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

মানুষের বাগান বাংলাদেশের মানুষের গল্প। মানুষের বাগানের চরিত্রগুলো আসলে আমাদের দেশের মানুষের চারিত্রিক বা জীবন বাস্তবতা। এ বাস্তবতা হয়তো অনেকের ভালো লাগবে, অনেকের ভালো নাও লাগতে পারে। তবে সাত বছর আগের নির্মিত চলচ্চিত্র দর্শকের কেমন লাগবে জানি না। আমি চাইব, সিনেমাটা দর্শক সিনেমা হলে দেখুক।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়, মারামারি-রক্তপাত থেকে সরে এসে দর্শক স্টোরি বেজড গল্প বেশি পছন্দ করছে। এ প্রেক্ষাপটে মানুষের বাগান দেশের দর্শক কীভাবে নেবে বলে আপনি মনে করেন?

এটা খুব ভালো লক্ষণ। সিনেমার নামে যে ফর্মুলা, তার বাইরেও যে সিনেমার আপন আর প্রাত্যহিক বাস্তবতার গল্প দর্শক পছন্দ করছে এটা ইতিবাচক। আন্দাজ করি, ভবিষ্যতে এ দর্শক নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমারও দর্শক হয়ে উঠবে। মানুষের বাগান সাত বছর আগের নির্মাণ। আজকের দর্শক- কেউ কেউ পছন্দ করবে, কারো বেলায় হয়তো ‘না’। তবে নিজের চারপাশের এসব মানুষের চেনা-অচেনা গল্পগুলো সে ঠিকই জেনে যাবে। এটা মানুষেরই বাগান।

আগামীতে নতুন কোনো চলচ্চিত্র বা নাটকের কাজে আপনাকে দেখা যাবে কিনা?

লাল নামে একটি সিনেমার রিসার্চ, চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ। শিগগিরই নির্মাণ যাত্রা শুরু হবে। এক-দেড় বছরের মধ্যে সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হতে পারব।