বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বিনোদন শিল্পের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টুডিও, পাম গাছঘেরা বুলেভার্দ ও তারকাদের ঝলমলে জীবন। কিন্তু শতবর্ষের সেই আধিপত্য আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। ক্রমবর্ধমান ব্যয়, জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপে চলচ্চিত্র ও টিভি প্রযোজনা ধীরে ধীরে লস অ্যাঞ্জেলেস ছেড়ে অন্য রাজ্য কিংবা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
হলিউডের সিনেমা একসময় ছিল হলিউড ইন্ডাস্ট্রির সংস্কৃতির পরিচায়ক। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘বেওয়াচ’ এর মধ্যে অন্যতম। এটি ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অংশ। কয়েক দশক পর সিরিজটির নতুন সংস্করণ আবার ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়। রাজ্য সরকারও এটিকে স্থানীয় শিল্পের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু শুটিং শুরু হতেই দেখা দেয় নানা জটিলতা। সমুদ্রসৈকতে গাড়ি চালানো, রাতভর সরঞ্জাম রাখাসহ নানা বিষয়ে অনুমোদন পেতে বাধার মুখে পড়ে প্রযোজনা দল। এমন পরিস্থিতি নতুন করে সামনে আনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হলিউড কি এখনো চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা?
লস অ্যাঞ্জেলেস এখন পিছিয়ে পড়ছে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির প্রতিযোগিতায়। শহরটিতে চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয় বিশ্বের অনেক অঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। প্রথমত, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়। ফলে শ্রমিক ও কলাকুশলীদের পারিশ্রমিকও বেশি। শক্তিশালী ইউনিয়ন কাঠামো ও কঠোর শ্রমনীতির কারণেও কাজে বাধা পড়ে। আরো আছে জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক বাধা। সর্বশেষ স্টুডিও, লোকেশন ও সেবার ব্যয় বাড়ায় কাজ আরো জটিল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো উদার করছাড় ও নগদ প্রণোদনা দিয়ে প্রযোজকদের আকৃষ্ট করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নির্মাতাদের জন্য প্রশ্নটা আর শিল্পগত নয়, অর্থনৈতিক। একই মানের একটি প্রযোজনা বিদেশে যদি ৩০-৫০ শতাংশ কম খরচে করা যায়, তবে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়ে যায়।

স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলোর জনপ্রিয়তা আরেকটি কারণ। ২০১৮-১৯ ও কভিড মহামারীরর সময় স্ট্রিমিংয়ের জন্য প্রচুর কনটেন্ট তৈরি হয়। কিন্তু ২০২২ সালের পর সেই ‘স্ট্রিমিং বুদবুদ’ ফেটে গেলে ব্যয় কমাতে শুরু করে বড় স্টুডিওগুলো। পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার প্রযোজনাসংশ্লিষ্ট চাকরি হারিয়ে যায়। এগুলোর বড় অংশই ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসে। শুধু ক্যামেরার পেছনের কর্মীরাই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ফুল সরবরাহকারী, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, নির্মাণকর্মী ও অসংখ্য ছোট ব্যবসা।
একজন সেটসাপ্লায়ার ব্যবসায়ীর জানান, এমন মন্দায় তারা আগে কখনো পড়েননি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক জনপ্রিয় সিরিজ ও চলচ্চিত্র এখনো লস অ্যাঞ্জেলেসকেন্দ্রিক গল্প বললেও সেগুলোর শুটিং হচ্ছে অন্যত্র। একসময়ের ক্যালিফোর্নিয়ানির্ভর টেলিভিশন সিরিজের নতুন সংস্করণ তৈরি হচ্ছে কানাডা, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ায়। এমনকি আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলকে কেন্দ্র করে নির্মিত গল্পও শুটিং হচ্ছে বিদেশে। কারণ সেখানে খরচ কম এবং প্রণোদনা বেশি।
প্রযোজকদের ভাষায়, অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিদেশে না গেলে সেই প্রযোজনাই হয়তো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না। এ পরিস্থিতিতেই যুক্তরাজ্য ও কানাডায় শুটিং ও লোকেশন প্রদানের পরিমাণ বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রযোজনা আকর্ষণের দৌড়ে সবচেয়ে সফল দেশগুলোর একটি যুক্তরাজ্য। দেশটি শুধু প্রাথমিক ব্যয়ের ওপর করছাড় দেয় না, কিছু ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ মুনাফার অংশের ওপরও সুবিধা দেয়।
কানাডাও কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রণোদনার সমন্বয় ঘটিয়ে নির্মাতাদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, অনুকূল মুদ্রা বিনিময় হার এবং পর্যাপ্ত স্টুডিও সুবিধা।
ইউনিয়ন বনাম বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও বাদ দেয়া যায় না। প্রযোজকদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম ব্যয় ও ইউনিয়ন-সম্পর্কিত নিয়ম-কানুন অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ খরচ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য, সমস্যার সমাধান শ্রমিকদের মজুরি কমানো নয়।
তাদের মতে, বিদেশী ভর্তুকির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে ফেডারেল সরকারেরও এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় বিনোদন শিল্প ধীরে ধীরে সেই পথেই হাঁটবে, যেদিকে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক উৎপাদন শিল্প চলে গিয়েছিল।
হলিউডের সংকট নিয়ে আলোচনায় বারবার ফিরে আসছে ডেট্রয়েটের উদাহরণ। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পের কেন্দ্র ছিল শহরটি। কিন্তু কম ব্যয় ও সরকারি সুবিধার খোঁজে উৎপাদনের বড় অংশ অন্যত্র সরে যায়।
বিনোদন শিল্পের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে হলিউডও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পতনের মুখে পড়তে পারে।
তবে অন্য একটি মতও রয়েছে। ডেট্রয়েট যেমন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অটোমোবাইল কেন্দ্র, তেমনি হলিউডও হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। বরং ছোট হয়ে, আরো বিশেষায়িত হয়ে টিকে থাকবে।
তাহলে সমাধান কোথায়? ক্যালিফোর্নিয়া এরই মধ্যে কর প্রণোদনা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে। কিন্তু শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু রাজ্য পর্যায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ফেডারেল পর্যায়ের প্রণোদনা, যা বিদেশী ভর্তুকির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সাহায্য করবে।
মার্কিন কংগ্রেসে এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শ্রম ব্যয়ের ওপর জাতীয় পর্যায়ে করছাড় দেয়া হতে পারে। শিল্পের অনেকেই মনে করছেন, এটি বাস্তবায়ন হলে হলিউডের জন্য নতুন আশার দ্বার খুলতে পারে।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, হলিউড কি এখনো এত গুরুত্বপূর্ণ? সত্যি বলতে, সব সংকটের পরও লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি শক্তি এখনো অটুট। বিশ্বের সেরা প্রযুক্তিবিদ, নির্মাতা, অভিনেতা, লেখক ও পোস্ট-প্রডাকশন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ এখনো এখানেই কাজ করেন।
অনেক নির্মাতা বিশ্বাস করেন, কিছু গল্প শুধু লস অ্যাঞ্জেলেসেই সঠিকভাবে বলা সম্ভব। ব্যয় বেশি হলেও সৃজনশীল মান, অভিজ্ঞ কর্মী ও শিল্পের ঐতিহ্য এখনো শহরটিকে অনন্য করে রেখেছে।
হলিউডের সামনে তাই এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—বিশ্ববাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা এবং একই সঙ্গে নিজের ঐতিহাসিক পরিচয় ধরে রাখা। প্রশ্নটা শুধু অর্থনীতির নয়; এটি আমেরিকার সাংস্কৃতিক প্রভাব, কর্মসংস্থান ও শত বছরের একটি সৃজনশীল ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার লড়াইও।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










