যেকোনো কাজ শুরুর আগে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন সত্যজিৎ রায়। সিনেমার শুটিংয়ের আগে সে সিনেমার পাত্রপাত্রী, সময়কাল বিবেচনা করে কস্টিউম, মিউজিক, সেট সাজানোর জন্য প্রস্তুতি নিতেন তিনি। তার জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’। সত্যজিৎ রায় মুন্সী প্রেমচাঁদের গল্প থেকে সিনেমাটি তৈরি করেন। ওয়াজিদ আলী শাহর সময়কালের দুই অভিজাতকে নিয়ে গল্পটি রচিত। সিপাহি বিদ্রোহের সময়কালের এ গল্পের সিনেমা সংস্করণে সে সময়কার সংস্কৃতি জানা সত্যজিতের জন্য জরুরি ছিল। এ সিনেমার সেট ও কস্টিউম কেমন হওয়া উচিত তা জানতে ১৯৭৬ সালে সত্যজিৎ রায় ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে গিয়ে মুর্শিদাবাদ ও লক্ষ্নৌয়ের
চিত্রকলা সম্পর্কে জেনেছেন। মূল গল্পের সমান্তরালে তিনি যে গল্পটি বলেছেন তার সময়োচিত উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে তিনি কোনো কসুর বাকি রাখেননি।
সত্যজিৎ রায় একটি নোটবুকে তার নানা গবেষণার সূত্র রাখতেন। ‘খেরোর খাতা’ নামে নোটবুকটি আজও তার ভক্ত থেকে শুরু করে লেখক ও সিনেমা নির্মাতাদের আগ্রহের বিষয়। এ খাতায় ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’র শুটিংয়ের শিডিউল ও অন্যান্য তথ্য পাওয়া যায়। এর বাইরে সত্যজিৎ রায়ের জীবনীকার অ্যান্ড্রু রবিনসন জানিয়েছেন শতরঞ্জ কি খিলাড়ির চিত্রনাট্য তৈরি করতে সত্যজিৎকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। সিনেমার শুরুতে তিনি প্রায় ১০ মিনিটের একটি প্রস্তাবনায় (প্রলগ) ব্রিটিশদের সঙ্গে অযোধ্যার সম্পর্ক ও রাজ্য অধিগ্রহণের বিষয়টি এনেছেন। এটি তৈরি করার জন্য সত্যজিৎকে সে সময়ের নানা দলিল, চিত্রকলা, আলোকচিত্র নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। প্রস্তাবনার দৃশ্যায়নে টিলি কেটলের আঁকা নবাব শুজা-উদ-দৌলার পেইন্টিং প্রদর্শন করেন।
সিনেমার সেটে অযোধ্যা ও অযোধ্যার জীবন চিত্রায়ণে সত্যজিৎ রায় ভারতীয় শিল্পীদের চিত্রকর্মের ওপর নির্ভর করেছেন। প্রথমে তিনি লক্ষ্নৌয়ের স্টেট মিউজিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তার খেরোর খাতার নানা এন্ট্রি ও সিনেমার প্রযোজক সুরেশ জিন্দালের দেয়া তথ্যানুসারে, সত্যজিৎ রায় ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির চিত্রকর্ম নিয়ে গবেষণার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। তিনি লন্ডনে ভারতের ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের ডিরেক্টর পাম কুলেকে একাধিকবার চিঠি লিখে এ বিষয়ে সাহায্য চেয়েছেন।
কলকাতায় বসে সত্যজিৎ নিজের মতো করে গবেষণা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি উইলিয়াম ফস্টারের এ ডেসক্রিপটিভ ক্যাটালগ অব দ্য পেইন্টিংস, স্ট্যাচুস অ্যান্ড ফ্রেমড প্রিন্টস ইন দ্য ইন্ডিয়া অফিস-এর ওপর নির্ভর করেছেন। সত্যজিৎ তার নোটবুকে আটটি চিত্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি লন্ডনে গিয়ে ছবিগুলো সরাসরি দেখা ও ফটোগ্রাফ নেয়ার সুযোগ পান। এ সময় তিনি স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরোর সঙ্গে দেখা করেন।
সত্যজিৎ রায়ের নোটবুকের এন্ট্রিতে প্রথমে ছিল আসফ-উদ-দৌলার দরবারের একটি পেইন্টিং। দেখা যাচ্ছে, তিনি দরবারে সংগীত শুনছেন। তার নোটবুকে আরো উল্লেখ রয়েছে, ছবিগুলো মুর্শিদাবাদ স্টাইলে অঙ্কিত, যা কিনা অওধী ঘরানার বিপরীত। সত্যজিতের তালিকায় আসফ-উদ-দৌলার আরেকটি ছবি ছিল। লক্ষ্নৌয়ের কোনো চিত্রকরের আঁকা এ ছবিতে নবাবকে মোরগের লড়াই উপভোগ করতে দেখা যায়। ছবিতে একজন ইংরেজ সেনা ও নীল কোট পরা একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। রোজি জোনসের মতে, ইনি কর্নেল জন মরডন্ট হতে পারেন। শতরঞ্জ কি খিলাড়িতে মোরগ লড়াইয়ের দৃশ্য রয়েছে, তবে তা এ চিত্রকর্মের তুলনায় ভিন্ন।
সত্যজিৎ রায়ের নোটবুক দেখে মনে হয় ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি পরিদর্শনকালে ওয়াজিদ আলী শাহর একটি ছবিই বিশেষভাবে তার মনোযোগ কেড়েছিল। এ ছবিতে দেখা যায় ওয়াজিদ আলী শাহ লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন। লক্ষ্নৌয়ের চত্বর মঞ্জিলে ১৮৪৭ সালের ২২ নভেম্বর সাক্ষাতের ঘটনাটি ঘটে। এ ছবিতে তৎকালীন অযোধ্যা ও ব্রিটিশদের রাজপোশাক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ছবি থেকেই সত্যজিৎ রায় পোশাকের বিস্তারিত ধারণা নিয়ে থাকতে পারেন। সিনেমার যে সিকোয়েন্সে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহর সঙ্গে আউটরাম সাক্ষাতের দৃশ্যের সঙ্গে এ ছবির সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
সত্যজিতের নোটবুক ও তার পরিচিতদের স্মৃতি থেকে জানা যায় সিনেমা নির্মাণের আগে তিনি কস্টিউম ও সেট নির্মাণে বাস্তবের মিল রাখার ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। বেনারসের নানা জায়গা, অলিগলি ঘুরেছিলেন বলে জয় বাবা ফেলুনাথে সে জায়গা এত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু ওয়াজিদ আলী শাহের সময় ভ্রমণ করা সম্ভব ছিল না। সত্যজিৎ সে কাজটি করেছিলেন চিত্রকর্ম থেকে ঐতিহাসিক উপাদান নেয়ার মাধ্যমে। সে কারণেই শতরঞ্জ কি খিলাড়িতেও অযোধ্যা ও ওয়াজিদ আলী শাহর সময় এতটা স্পষ্ট।










