শিল্পীর শৈশব তার সৃষ্টির অনুপ্রেরণা। বেড়ে ওঠার সময়কার পরিবেশ, প্রতিবেশ থেকে আহরিত উপাদানই তার সারা জীবনের কাজে উঠে আসে। অনেক সময়ে আত্মজৈবনিক কিংবা শৈশবের স্মৃতি নিয়ে লেখা গল্প, উপন্যাস কিংবা নির্মিত সিনেমাই লেখক কিংবা পরিচালকের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে বিবেচিত হয়। কেনেথ ব্রানার বেলফাস্টও তেমনই একটি সৃষ্টি। উত্তর আয়ারল্যান্ডের অস্থিতিশীল সময়ের গল্পটি কেনেথের নিজের জীবনের গল্প, এ বিষয়ে কারো সন্দেহ নেই। শৈশবের অভিজ্ঞতাই তিনি এ সিনেমার প্রধান চরিত্রের চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন। কিন্তু গল্পটা নেহায়েত স্মৃতিচারণ না হয়ে অস্থির সেই সময়ের গল্প হয়ে উঠেছে।
সিনেমা শুরু হয় আধুনিক বেলফাস্টের দৃশ্য দিয়ে। উন্নতি, উত্কর্ষের সে দৃশ্য কিছুক্ষণ পর বদলে মূল সিনেমার সাদাকালো চিত্রায়ণে প্রবেশ করে। ব্রানা এখানে বেশ নাটকীয় কৌশলে পরিবর্তনটা আনেন। একটি দেয়ালের মধ্য দিয়ে দর্শককে পরিবর্তিত সময়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই দর্শকের সঙ্গে নয় বছর বয়সী বাডির পরিচয় হয়। বাডি এ সিনেমার মূল চরিত্র। ‘বেলফাস্ট’-এর পুরো গল্পটা ব্রানা মূলত বাডির চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন। গল্পের শুরু থেকে আমরা যেমন একটা সময় থেকে ভিন্ন সময়ে প্রবেশ করি, গলিতে ছুটে বেড়ানো হাস্যোজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের দৃশ্যর মধ্যে হঠাৎ একটা মিছিল এসে পড়লে গল্পের মাত্রা ফের বদলে যায়।
ব্রানার এ সিনেমা রাজনৈতিক। ষাটের দশকের শেষ দিকে আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সিনেমার উপজীব্য। কিন্তু রাজনৈতিক হয়েও রাজনীতির উত্তাপ দর্শকের বিরক্তির কারণ হয় না। ব্রানা এক ধরনের সূক্ষ্ম বিদ্রূপ দেখিয়েছেন তার সিনেমায়। এতে তার কৌশলটা ছিল বাডির চোখ দিয়ে সময়টা দেখা। কেননা নয় বছর বয়সী বাডি প্রতিটি ঘটনারই দর্শক, কিন্তু তার কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নেই। কিন্তু গির্জার ফাদারের প্রোটেস্ট্যান্ট-বিরোধী বক্তব্য দেয়া এবং পরমুহূর্তে দান চাওয়ার সময়ের মধ্যে বাডির অভিব্যক্তি পরির্তনের মধ্যে কমিক রিলিফ যেমন আছে, তেমনি তত্কালীন সাম্প্রদায়িকতার তীব্রতা প্রকাশেও ঘাটতি হয়নি।
বেলফাস্ট যেমন উত্তর আয়ারল্যান্ডের কাহিনী, তেমনি একটি পরিবারেও কাহিনী। বাডির পরিবারকে কেন্দ্র করেই বেলফাস্ট আবর্তিত। বাডির চরিত্রে মাত্র ১০ বছরের জুড হিলের মধ্য থেকে প্রশংসনীয় অভিনয় বের করে এনেছেন ব্রানা। সাদাকালো হওয়া কিংবা জুডের অভিনয়ের কারণে সিনেমা দেখতে দেখতে সিনেমাপ্রেমীদের অবচেতন মনে ব্রুনো (দ্য বাইসাইকেল থিভস), অপু
(পথের পাঁচালী) কিংবা চ্যাপলিনের দ্য কিডের স্মৃতি চলে আসতে পারে। কিন্তু চরিত্র হিসেবে বাডি এদের তুলনায় সাবলীল। ক্ল্যাসিক সিনেমার উদাহরণ টানার কারণ হলো ব্রানা মূলত ক্ল্যাসিক অনুসরণ করেছেন। বাডির বাবা-মা চরিত্রের নাম ‘মা’ এবং ‘পা’ আমাদের বিশ্বসাহিত্যের মা চরিত্রগুলোর (ম্যাক্সিম গোর্কি, পার্ল এস বাক) কথা মনে করিয়ে দেয়। গল্পের গভীরতার সঙ্গে ব্রানার কাহিনী উপস্থাপনের ধরন, ক্যামেরার কাজ, সিনেমাটোগ্রাফি, অভিনয় আর পরিচালনার কারণে ৯৪তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের সম্ভাব্য সেরা সিনেমার তালিকায় প্রথমে অবস্থান করছে। ব্রানা অবশ্য এ পর্যন্ত পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাঁচবার অস্কার মনোনয়ন পেয়েছেন।
কেনেথ ব্রানা সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত। ২৩ বছর বয়সে রয়াল শেকসপিয়ার কোম্পানিতে যোগ দেন। সেখানে শেকসপিয়ার-সৃষ্ট নানা চরিত্রে অভিনয় করে ব্রানা নিজেকে পোক্ত করেন। অভিনয় থেকে পরিচালনায় এসে একের পর এক ভিন্নধর্মী কাজ উপহার দিয়েছেন কেনেথ ব্রানা। মেরি শেলীর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’,
শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’
থেকে ক্রিস্টির ‘মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’—ব্রানার প্রতিটি কাজে এক ধরনের সাহিত্যিক প্রতীতি দেখা যায়। ‘বেলফাস্ট’ও সে ধরনের বিস্তৃতি এবং গভীরতা ধারণ করে। আয়ারল্যান্ডের রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক বিভেদের যে গল্পগুলো তিনি এনেছেন, তা মূলত বাডির পরিবার এবং প্রতিবেশের মাধ্যমে উপস্থাপিত। পরিবারটির আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রতিটি ছোট ছোট বিষয়ের প্রতি দর্শকের দৃষ্টি টেনে এনেছেন পরিচালক। এর মধ্যে স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল নিজ বাসভূম থেকে ঠাঁইনাড়া হওয়ার বেদনা। বেলফাস্ট সেখানে পামুকের ইস্তানবুলের প্রতিধ্বনি করে।
বেড়ে ওঠার সময়ের গল্প নিয়ে সাজানো সিনেমায় আমরা বাডির ‘মা’-কে একজন আদর্শ মা হিসেবে পাই। ক্যাট্রিওনা বেলফির মধ্যে মাতৃসত্তা স্পষ্ট। ‘পা’ চরিত্রে অভিনয় করা জেমি ডোরন্যানের চৌকো মুখ, সবল কাঁধ একজন দায়িত্বশীল পিতার কথাই মনে করিয়ে দেয়, যিনি প্রায় একাই সংসারের জন্য খেটে চলেন। বাডির ‘পা’ কাজ করে তার বাড়ি থেকে বহুদূরে। বাডির সময় কাটে মূলত পিতামহ, পিতামহীর সঙ্গে। বেলফাস্টের সঙ্গে পৃথিবীর যেকোনো অঞ্চলের দর্শক নিজেকে সংযুক্ত করতে পারবেন, কেননা বাডির বেড়ে ওঠা আর পরিবারের গল্পটা পরিচিত, সহজ। এরই মধ্যে কেনেথ ব্রানা সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার গল্প বলেন। স্কুলে নিয়মিত পড়াশোনায় এগিয়ে যাওয়া বাডি যখন বন্ধুর কাছে ‘গোপন ক্লাব’
বিষয়ে শোনে, একে গোপন রাজনৈতিক সংগঠনের রূপক ভাবলে ভুল হয় না। গোপনে মা-বাবার ঝগড়া, আলোচনা শুনে ফেলা বাডি বিস্তৃত প্রান্তরে বাবার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে যখন প্রশ্ন করে, ‘আমরা বেলফাস্ট ছেড়ে যাচ্ছি?’, সেটা সামাজিক না রাজনৈতিক বাস্তবতা, তা নিয়ে সমালোচক মহলে তর্ক হতে পারে।
আমরা বরং দেখি নামের মতো ‘বেলফাস্ট’ সত্যিই আয়ারল্যান্ডকে উপস্থাপন করে। আইরিশ ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত সবাই বলেছেন, ‘বেলফাস্ট’ আইরিশ উপাদানে পূর্ণ। একটি দৃশ্যে দরজার সামনে বসে ‘মা’-র আলু ছেলা, ভ্যান মরিসনের গান, টেলিভিশনে চলা ‘স্টার ট্রেক’, দাদা-দাদি চরিত্রে জুডি ডেঞ্চ এবং কিয়ারান হিন্ডসের রসায়ন থেকে শুরু করে সবকিছুতে আইরিশ ছাপ স্পষ্ট। প্রাত্যহিক জীবনের দৃশ্যায়নের সঙ্গে রেডিও, টেলিভিশনে চলা খবরে বেকারত্ব, সহিংসতার ইতিহাস রেখেছেন পরিচালক। পিকেটিং চলাকালীন দৃশ্যটি ক্ল্যাসিক ফটোগ্রাফি ঘোষিত হওয়ার দাবিদার। সিনেমার প্রায় প্রতিটি ফ্রেম একাধিক গল্প বলে। সেগুলো যেন ব্রানার ঝাপসা চোখের নস্টালজিয়াকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। নয় বছর বয়সে শহর ছেড়ে ব্রানার পরিবার যখন বেলফাস্ট ছাড়ছিল, তার আগে তিনিও হয়তো বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমরা কি সত্যিই বেলফাস্ট ছেড়ে যাচ্ছি?’









