বাঙালির সত্যজিৎ চর্চা থেমে ছিল না কখনো। ফেলুদা থেকে সিনেমা নির্মাণ, সত্যজিতের গল্প থেকে শর্টফিল্ম, কমিকস তৈরি হতো। এর মধ্যেই বেঁচে ছিলেন তিনি। কিন্তু সে সময় মানুষ সত্যজিৎ বা শিল্পী সত্যজিৎকে নিয়ে কাজ হয়েছে কম। কিছু কিছু হতো। তবে থিতিয়ে গিয়েছিল অনেকটা। সম্প্রতি সত্যজিৎকে নিয়ে নতুন করে লেখা হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে সিনেমা। সে ধারায় খানিকটা ভিন্ন সংযোজন অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’। তিনি তুলে এনেছেন ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমার পেছনের গল্পটা। সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে মুক্তি দেয়া হয়েছে সিনেমাটি। অনীক দত্তের তরফ থেকে এটি সত্যজিৎ রায়ের প্রতি ‘শ্রদ্ধার্ঘ্য’।

নির্মাণের শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল অপরাজিত। যেহেতু সত্যজিৎ রায় ও তার কাজ নিয়ে গত কয়েক বছরে নানা ধরনের কাজ হচ্ছে, ফলে সিনেমাটির মনোযোগ পাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এ সিনেমার মনোযোগ পাওয়ার আরেকটি কারণ সিনেমার মূল চরিত্রের লুক। যখনই কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সিনেমা তৈরি হয় তখন সেই ব্যক্তির সঙ্গে অভিনেতার লুক মেলানো স্বাভাবিক। কিন্তু এ সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে জিতু কামাল নিজেকে এতটা বদলেছেন যে সিনেমার শুটিংয়ের ছবি দেখে মনে হয়ের্িছল সত্যজিৎ রায়ই যেন ফিরে এলেন। সত্যজিতের উচ্চতার সঙ্গে জিতুর কিছু মিল ছিল কিন্তু মেকআপ এত পারফেক্ট যে সত্যজিতের সঙ্গে মিল রেখে আর কোনো অভিনেতা নিজেকে উপস্থাপন করেনি। শোনা গিয়েছে, সত্যজিতের দাঁতের সঙ্গে মিল রাখার চেষ্টায় জিতু ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁতের মধ্যে ফাঁক তৈরি করিয়েছিলেন।

কিন্তু লুকের দিকে নজর দিয়ে ‘লুক-অ্যালাইক’ হয়ে গেলেই যে সিনেমা ভালো হবে এমন তো নয়। অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’কে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তার প্রথমটা মানসিক। খোদ সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেছিলেন ‘অপরাজিত’ নামে একটি সিনেমা। তাই দর্শকের অবচেতন মনে একটা তুলনা চলে আসবে। অনীকের সিনেমা নিয়ে তাই দর্শকের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সিনেমা মুক্তির আগে ও পর পরই দর্শকের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। তবে সময় যেতে কিছু বিপরীত মন্তব্যও এসেছে। এর একটি হলো স্পষ্টতই সত্যজিৎ রায় ও পথের পাঁচালীর নেপথ্য গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমায় সত্যজিৎকে অপরাজিত রায় নামে উপস্থাপন ও পথের পাঁচালীকে ‘পথের পদাবলী’তে রূপান্তর। কৌশলগত দিক থেকে ঠিক থাকলেও দর্শকের আবেগের জায়গাটি থেকে কারো কারো খানিক আপত্তি তৈরি হয়েছে।

জিতু কামালের অভিনয়ে খাদ ছিল না। লুক তো মিলিয়েছেনই, বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও সত্যজিতের সঙ্গে মিলিয়েছেন নিজেকে। কিন্তু সব মেলালেও সত্যজিতের কণ্ঠখানাও ছিল ব্যতিক্রম। সেটা ধরতে জিতুর ঠোঁটে বসানো হয়েছে চন্দ্রাশীষ রায়ের স্বর। কিন্তু তা এতটা ভালো মিলেছে যে একবারের জন্যও আরোপিত মনে হয় না। অন্য অভিনেতাদের মধ্যে বিজরা রায়ের চরিত্রে সায়নী ঘোষ, বিধান রায়ের চরিত্রে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সর্বজয়ার চরিত্রে অঞ্জনা বসু, সুপ্রভাদেবীর চরিত্রে অনসুয়া মজুমদারও চমত্কার অভিনয় করেছেন।  সুব্রত মিত্রের চরিত্রে দেবাশীষ রায় এ সিনেমায় দারুণ কাজ করেছেন। সাপোর্টিং প্রতিটি চরিত্রই এত সাবলীল যে মনে হয় সত্যিই সত্যজিতের গ্রুপটিকে চোখের সামনে দেখছি। বিজয়া রায়ের চরিত্রে সায়নী ঘোষ অনেক বেশি সপ্রতিভ। বিজয়াকে সেভাবে স্ক্রিনে দেখা যায়নি বলে তার চরিত্রটি নিয়ে মন্তব্য করা কঠিন তবে ‘আমাদের কথা’র পাঠকরা অনেকটাই মেলাতে পারবেন।

‘অপরাজিত’কে সত্যজিতের জীবনিভিত্তিক সিনেমা বলা যায় না, কেননা জীবনের খণ্ডাংশ নিয়ে সিনেমাটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু পথের পাঁচালী নির্মাণের পেছনের গল্পটির মুনশিয়ানার সঙ্গে আনা হয়েছে তার ব্যক্তিজীবন, আড্ডা, বন্ধুত্ব ও পারিবারিক জীবন।

বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে বৃত্তি নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ, সেখানে ‘বাইসাইকেল থিভস’ দেখে নিজের সিনেমাকে স্পষ্ট করে দেখতে পাওয়ার পর সিনেমা তৈরিতে আর্থিক ও নানামুখী যে বাধা সত্যজিৎ পেয়েছিলেন সবই এনেছেন অনীক। কিন্তু এ সিনেমার সবচেয়ে নান্দনিক ও সফল বিষয় বলতে হয় পথের পাঁচালীর বিখ্যাত দৃশ্যগুলোর পুনর্নির্মাণ। অপু-দুর্গার রেলগাড়ি দেখা, বাংলায় বৃষ্টি নামার দৃশ্য, যা সত্যজিৎ ও পথের পাঁচালীর ‘সিগনেচার’ তার সুচারু দৃশ্যায়ন করেছেন অনীক। এমনকি ইন্দির ঠাকরুনের চরিত্রটির জন্যও তিনি একজন শিল্পীকে খুঁজে বের করেছেন। চুনিবালা দেবীর মতো না হলেও তিনি উপযুক্ত ‘সাবস্টিটিউট’ ছিলেন। সব মিলিয়ে পথের পাঁচালীকে নতুন করে দেখার পাশাপাশি এ সিনেমায় পাওয়া গেল সত্যজিৎ ও তার কাজকে। জন্মশতবার্ষিকীতে এমন শ্রদ্ধার্ঘ্য সত্যজিতের মতো কীর্তিমানের প্রাপ্য এবং সেখানে সামান্য কিছু খামতি থাকলেও মোটের ওপর অনীক দত্ত সফল।