সত্তরের দশকে বলিউডে নায়িকাদের শাড়িতেই দেখা যেত। এর বাইরে পশ্চিমা পোশাকেরও ছিল নির্দিষ্ট কিছু ধরন। নায়িকাদের ‘লুক’ থেকে শুরু করে ‘রোল’- সবই ছিল ছকে বাঁধা। সেই ছক ভেঙে বেরিয়ে আসা প্রথম নায়িকা ছিলেন জিনাত আমান। সত্তরের দশকে যে ধরনের চরিত্রে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন তা ছিল সময়ের তুলনায় এগোনো। দেব আনন্দ পরিচালিত ১৯৭১ সালের সিনেমা ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ এক্ষেত্রে উপযুক্ত উদাহরণ। সিনেমায় জেনিস চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জিনাত। হিপি কালচারের অনুসরণে নির্মিত সিনেমায় জিনাতের চরিত্রটি সে সময়ের হিসেবে উপযুক্ত ছিল না। যে কেউ চরিত্রটি করার আগে দ্বিধান্বিত হতেন।
‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ সিনেমার প্লট নেপালে। প্রধান চরিত্র জেনিস। ছেলেবেলার নানা বিরূপ অভিজ্ঞতার কারণে সে মারিজুয়ানায় আসক্ত হয়। এরপর তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয় মারিজুয়ানা সেবন এবং চিন্তাহীন জীবন। সত্তরের দশকে বলিউডে এ ধরনের চরিত্র সহজভাবে গ্রহণ করা হতো না। উপরন্তু সিনেমার নাম থেকে স্বাভাবিকভাবেই দর্শক ধরে নিয়েছিল সিনেমাটি হবে ভক্তিমূলক। কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ বিপরীত এ সিনেমা মুক্তির পরপরই দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। বলিউড যে সময় সংসারী বা ভক্তিমতী নারী চরিত্রের বাইরে কেবল রোমান্টিক সিনেমার নায়িকাদের পছন্দ করত। সে সময় তারা জেনিসকে গ্রহণ করেছিল জিনাতের দারুণ অভিনয়ের জন্য। জেনিসের মারিজুয়ানা আসক্তি বা এলোমেলো জীবনের বাইরে তার নিজস্ব এক বিষণ্নতা ছিল, যা দর্শক খুঁজে পেয়েছিল জিনাতের মধ্যে।
জিনাত আমান যখন বলিউডে ভিন্ন ধারার চরিত্রে অভিনয় করছেন তখন বলিউডে নায়িকাদের সেক্স সিম্বল হিসেবে উপস্থাপনের চল ছিল। হলিউডের অনুসরণে করা হতো এ কাজ। সুইমিং পুল থেকে উঠে আসার দৃশ্য থেকে শুরু করে ক্লাব বা ক্যাবারের নাচে নায়িকাদের যৌনাবেদন ফোটানো হতো। জিনাত সম্পর্কে এ কথা তোলার কারণ হলো কুরবানি সিনেমায় তার ‘আপ জ্যায়সা কোয়ি’ ও ‘লায়লা ও লায়লা’ এ ঘরানারই উপস্থাপন। কুরবানি মুক্তি পায় ১৯৮০ সালে। ১৯৮১ সালের নসিব সিনেমায় হেমা মালিনী প্রায় একই ধারার ‘মেরে নসিব মে’ গানে পারফর্ম করেন। কিন্তু জিনাতের শরীরী ভাষা ছিল হেমার তুলনায় অনেক বেশি গাঢ়।
জিনাত আমানকে দর্শকরা সত্যম শিবম সুন্দরমের জন্যও মনে রাখবে। গ্ল্যামারের এক নতুন সংজ্ঞা নিয়ে এসেছিলেন তিনি। রুপার মতো এ ধরনের চরিত্র জিনাতের আগে-পরে বলিউডে আরো হয়েছে কিন্তু রুপার মতো মাটির কাছাকাছি চরিত্রের আবহ কেউ তৈরি করতে পারেনি। জিনাত আমানের সময়কার বহু অভিনেত্রীই তাদের প্রথম জীবনে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু জিনাত ব্যতিক্রম। তার ক্যারিয়ারের প্রথমদিকের সিনেমা ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’। আর সেখানেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি। ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ সিনেমার জেনিস চরিত্রে কেউ অভিনয় করতে রাজি হচ্ছিল না। ভারতীয় একটি মেয়ে পশ্চিমা পোশাক ও ভাবধারায় যার জীবনযাপন এমন চরিত্রে অভিনয় করে ক্যারিয়ার প্রশ্নের মুখে ফেলতে চাননি কেউ। কিন্তু জিনাত আদতেই ছিলেন ‘ড্যাম কেয়ার’। জিনাতের বর্ণনায় দেব আনন্দ তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘দেখতে ভারতীয় কিন্তু পশ্চিমা ধারায় লালিত-পালিত এক নারী যে লোকসমক্ষে ধূমপান বা পশ্চিমা পোশাকে স্বচ্ছন্দ।’ মিস এশিয়া প্যাসিফিকের স্টাইল দেখেই দেব আনন্দ তাকে ওই চরিত্রের জন্য বেছে নিয়েছিলেন।
জিনাত আমান সম্পর্কে এ তথ্য খুব কম মানুষই জানে। তিনি মিস এশিয়া প্যাসিফিক হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে প্রথম ভারতীয় হিসেবে তিনি এ খেতাব লাভ করেন। ফেমিনা মিস ইন্ডিয়ায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিলেন এবং এরপর ফার্স্ট প্রিন্সেস নামে পরিচিত হন। বলিউডে এর পরবর্তী বছরগুলো জিনাত আমান প্রিন্সেসের মতো করেই রাজত্ব করেছেন। ‘ডন’, ‘টক্কর’, ‘আজনাবি’, ‘লাওয়ারিশ’ সিনেমাগুলোয় তার অভিনয় এখনো দর্শকদের আকর্ষণ করে। কিন্তু বিশেষ হয়ে থাকে ‘লায়লা ও লায়লা’ বা ‘আপ জ্যায়সে কোয়ি’ গানগুলো। এ কারণেই ‘দম মারো দম’ এ সময়ে এসে তৈরি হয় এবং ‘লায়লা ও লায়লা’ গানে নতুন করে নাচেন এ কালের অভিনেত্রী।
জিনাত আমান ছক ভেঙেছিলেন নানাভাবে। কুরবানির ‘আপ জ্যায়সে’ গানটিতে তার পারফরম্যান্স এখনো বিখ্যাত কিন্তু জিনাত নিজেই বলেন, ‘তখন কোনো প্রথাগত কোরীয়গ্রাফার আমাদের ছিল না। আমার মনে আছে, ফিরোজ খান আমাকে বলেছিলেন নিজের মতো করে পারফর্ম করো।’ জিনাতের নিজের মতো করে করা সেই পারফরম্যান্সই তাকে অমর করে রাখছে।










