শিল্প কখনো কখনো অবসেশন হয়ে ওঠে। গভীর ভালোবাসা অনেক সময়ই ভুল পথে চালিত করে মানুষকে। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল, তার কোনো মানদণ্ড হয় না। কিন্তু ন্যূনতম একটা সীমারেখা থাকা প্রয়োজন। আমাদের আলোচ্য সিনেমাটি সে সীমা দেখায় না, তবে একটা ধারণা দেয়। কিন্তু শিল্প, বিশেষত সিনেমার প্রতি ভালোবাসা, ভালোবাসা থেকে অবসেশনের জায়গাটি বেশ স্পষ্ট করে তুলে ধরে। যদিও এ গল্পের পেছনে থাকে ব্যক্তিগত আরেকটি গল্প বা না পাওয়া কিন্তু তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সিনেমার প্রতি ট্রিবিউট। আবার অন্যদিকে, এসব কিছু বাদ দিলে ‘‌চুপ: দ্য রিভেঞ্জ অব অ্যান আর্টিস্ট’কে একটি নিরেট সাইকো থ্রিলার বলা যেতে পারে।

সিনেমার ট্রিবিউটের বিষয়টি থেকেই শুরু করা যাক। সিনেমাজুড়ে গুরু দত্তের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য রাখা ছিল। ড্যানিকে দিয়ে আর বালাকৃষ্ণান যেভাবে গুরু দত্তের কথা তুলে এনেছেন, তা সম্ভবত বালকির নিজের মনেরই কথা। গুরু দত্তের সাহেব বিবি অউর গুলাম, পেয়াসা, কাগজ কে ফুল সিনেমাগুলোর রেফারেন্সই কেবল ব্যবহার করেননি বরং বিশেষভাবে সম্মান জানিয়েছেন। নীলার সঙ্গে ড্যানির পরিচয়ের শুরুর দিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘‌জানে কেয়া তু নে কাহি’-র প্রথম পরিচয়। গুরু দত্তের জন্মদিনে নীলাকে দেয়া কাগজের টিউলিপকে (কাগজ কে ফুল) এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। তার ছবির সামনে টিউলিপ রেখে ড্যানির কথা বলার অংশটি ট্রিবিউট থেকে অবসেশনে চলে যায়। গল্পের এ দিক সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

একজন সিরিয়াল কিলার সিনেমা সমালোচকদের খুন করে চলে এবং তাদের মাথায় রেখে যায় স্টার চিহ্ন। প্রথমে মনে হয় সে খারাপ রেটিং দেয়া সমালোচকদের হত্যা করছে কিন্তু পরে দেখা যায় প্রশংসা করলেও ছাড় পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে বোঝা গেল, খুনির টার্গেট মূলত অসৎ রিভিউকারী। কেননা সে সিনেমা ভালোবাসে এবং মনে করে অসৎ রিভিউ দিয়ে সিনেমা, পরিচালক, কলাকুশলী সবার ক্ষতি করা হচ্ছে। এ জায়গায় বালকি মূলত প্রচলিত অসাধুতাকে তুলে ধরেন। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এ অনলাইন যুগে সিনেমা মুক্তি পাওয়ামাত্র একজন বিশেষ ব্যক্তির রিভিউ ওই সিনেমার ভাগ্য বদলে দিতে পারে। নাwম সমালোচকের প্রশংসায় একটি খারাপ সিনেমা সাধারণ দর্শকের কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠতে পারে, আবার একটি ভালো সিনেমা খারাপ রিভিউর কারণে ব্যর্থ হতে পারে।

বালকি স্পষ্ট করে দেখাননি কিন্তু অরবিন্দ যখন প্রযোজক, পরিচালক ও সমালোচকদের ডেকে কথা বলেন, সে সময় বোঝা যায় এ রিভিউর পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আর্থিক লেনদেন ভূমিকা রাখে। বাস্তবে বহু সমালোচক, প্রযোজক, পরিচালক বা তারকার কাছ থেকে অর্থ নিয়ে রিভিউ করেন। মজার ব্যাপার, তারা যে সবসময় নিজের সিনেমার প্রশংসার জন্য খরচ করেন, এমন না। অন্যের সিনেমার নিন্দা করার জন্যও এটি করেন। আবার সমালোচকরা কখনো কখনো ব্যক্তিগত ভালো লাগা, মন্দ লাগা দিয়ে একটি সিনেমার বিচার করে ফেলেন। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই উচিত নয়। সিনেমাকে সময় ও দর্শকের হাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত। কেননা গুরু দত্তের কাগজ কে ফুল সে সময় সমালোচকরা ছুড়ে ফেললেও, আজ তাকে মাস্টারপিস বলে ধরা হয়।

আর বালকির চুপ: দ্য রিভেঞ্জ অব অ্যান আর্টিস্টের সমালোচনা করতে বসে একবার হলেও থমকে যেতে হয়। কেননা সিনেমার বিষয়ই তো এ সমালোচনা। কিন্তু সেক্ষেত্রে বলতে হয়, সিনেমা হিসেবে এটি চমৎকার। শুরু থেকেই একটা আবেশ তৈরি করে, যা থাকে শেষ পর্যন্ত। সাইকো থ্রিলার হয়েও চমৎকার একটি রোমান্টিক ভাব আছে। দুলকার সালমানের সঙ্গে শ্রেয়া ধন্বন্তরির রসায়ন ভালো কাজ করেছে। এছাড়া এ রসায়নের পেছনে কাজ করেছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও ক্যামেরার কাজ। বৃষ্টি, ড্যানির ফুলের দোকান, নীলার অফিস ও বাসা মিলিয়ে একটা ছিমছাম ভাব আছে। দর্শককে ধরে রাখে।

অভিনয়ের দিক থেকে দুলকার সালমান এ সিনেমায় চমৎকার কাজ করেছেন বললে ভুল হবে না। নিজের সিনেমা ব্যর্থ হওয়ায় তার ক্রোধ, তবু সিনেমার প্রতি ভালোবাসার জায়গাগুলো তিনি অসাধারণভাবে প্রকাশ করেছেন। তাল মিলিয়েছেন শ্রেয়া ধন্বন্তরিও। সানি দেওলকে অনেকদিন পর অনুসন্ধানী সিনিয়র পুলিশ অফিসার চরিত্রে দেখতে পাওয়া একটি ভালো অভিজ্ঞতা। তবে সানির চরিত্রটি আরো ভালোভাবে সাজানো সম্ভব ছিল। দুলকারের রোমান্টিক ও সাইকো চরিত্রের মধ্যে দুয়েকটি জায়গায় তাল কেটেছে। তবে জেনোবিয়া শ্রফ চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন পূজা ভাট। তার লুক, বাচনভঙ্গি ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এ সিনেমায় তার চরিত্রের জন্য উপযুক্ত। নিজ চরিত্রে অমিতাভ বচ্চনের ক্যামিওটিও সময়োপযোগী। 

পরিচালনার ক্ষেত্রে বালকি তার সিগনেচার রেখেছেন। সাদামাটার মধ্যে শৈল্পিক একটি উপস্থাপন বরাবরই থাকে তার সিনেমায়। চুপও ব্যতিক্রম নয়। সিনেমার গল্পের প্রয়োজনে সহিংসতা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্যারেন্টাল গাইডেন্স প্রয়োজন হতে পারে। তবে এমন চিত্রায়ণ, দৃশ্যায়ন নতুন কিছু নয়।

চুপ যে বিশেষ কয়েকটি ব্যাপার চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, তার মধ্যে একটি হলো সিনেমার স্বল্প জ্ঞান নিয়ে সমালোচক হওয়ার ইচ্ছা ও চেষ্টা। অন্যদিকে অর্থলোভ। মাঝখান থেকে ‘‌সিনেমা’র প্রতি সৎ থাকে না কেউ। এটি সে জায়গা থেকে ছবির প্রতি সৎ হতে বলে। চুপ বলে-সিনেমাকে ভালো বা মন্দের তকমা দেয়া একজন সমালোচকের দায়িত্ব নয়। তার দায়িত্ব এর গভীরতা, সৌন্দর্য এমনকি দুর্বলতাগুলো আলোচনা করা। ড্যানির জবানিতে বালকি আমাদের সিনেমার গভীরে তাকাতে বলেন এবং চুপ: দ্য রিভেঞ্জ অব অ্যান আর্টিস্টের গভীরে কান পাতলে নৈঃশব্দ্যের সুর শোনা যায়।