ভারতের হিপ-হপ সংস্কৃতিতে বড় নাম হয়ে উঠেছিলেন সিধু মুসে ওয়ালা। পাঞ্জাবি এ গায়ক রীতিমতো একটা বড় জনগোষ্ঠীকে তার সংগীত ও স্টাইলে প্রভাবিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি একসময় শিকার হন হত্যাকাণ্ডের। তবে সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড না, সিধুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সম্প্রতি বিবিসিকে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে জানিয়েছেন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত গোল্ডি ব্রার।

২০২২ সালের মে মাসের এক সন্ধ্যায় হত্যা করা হয় সিধুকে। সিধু মুসে ওয়ালা তার গ্রামের কাছে নিজের গাড়িতে করে বের হলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন ভেঙে গুলি তার শরীর ভেদ করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্যাংস্টার গোল্ডি ব্রার ফেসবুকে দায় স্বীকার করে। তিন বছর পরেও ব্রার পলাতক এবং এখন পর্যন্ত কারো বিচার হয়নি। তবে বিবিসি আই যোগাযোগ করেছে গোল্ডির সঙ্গে এবং জানার চেষ্টা করেছে এ হত্যাকাণ্ডের কারণ।

সিধু মুসে ওয়ালার আসল নাম শুভদীপ সিং সিধু। পাঞ্জাবের ছোট একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে ২০১৬ সালে কানাডায় পড়াশোনার জন্য যান। সেখান থেকেই তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। তার সাহসী গানের কথা, রাজনৈতিক মন্তব্য এবং গ্রামীণ পরিচয়ের ওপর জোর দিয়ে তিনি পাঞ্জাবি হিপ-হপকে নতুন রূপ দেন। ইউটিউবে তার গানের ভিউ কয়েক বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে এবং তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছেন।

কিন্তু তার খ্যাতি তাকে বিপদের মুখে ফেলে দেয়। তার স্পষ্টভাষিতা ও প্রভাবশালী অবস্থান তাকে পাঞ্জাবের কুখ্যাত অপরাধজগতের টার্গেটে পরিণত করে। বিশেষ করে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের। বিষ্ণোই বর্তমানে জেলে থাকলেও গোল্ডি ব্রার বিদেশ থেকে তার জন্য অপারেশন চালান বলে জানা যায়।

সম্প্রতি বিবিসি আইকে সাক্ষাৎকার দেন গোল্ডি। তিনি দাবি করেন, মুসে ওয়ালা এমন কিছু ভুল করেছিলেন, যা ক্ষমার যোগ্য ছিল না। একটি কাবাডি ম্যাচের সঙ্গে তার সংযুক্তিকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুরু হয়। এ কাবাডি ম্যাচ বিষ্ণোইদের প্রতিদ্বন্দ্বী বম্বিহা গ্যাং আয়োজন করেছিল। মুসে ওয়ালা বম্বিহাদের হয়ে প্রচার করেছিলেন। বিষ্ণোই গ্যাং এটিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখে।

পরে পরিস্থিতি শান্ত হলেও আবার উত্তেজনা বাড়ে ২০২১ সালে বিষ্ণোইয়ের ঘনিষ্ঠ ভিকি মিড্ডুখেরা খুন হওয়ার পর। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে বম্বিহা গ্যাংয়ের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। পুলিশ সিধুর বন্ধু ও ম্যানেজার শাগনপ্রীত সিংয়ের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে। যদিও সিধু তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন, শাগনপ্রীত পরে অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে যান।

সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও সিধুর দোষ আছে বলেই বিশ্বাস করেন গোল্ডি। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘সবাই জানত সিধুর ভূমিকা কী ছিল। আমরা ন্যায়বিচার চেয়েছিলাম, কিন্তু কেউ শোনেনি। তাই আমরা নিজেরাই ব্যবস্থা নিলাম। ভদ্র কথা না শুনলে বন্দুকের গর্জন শোনাতে হয়।’

সিধু মুসে ওয়ালা ছয়জন সশস্ত্র হামলাকারীর হাতে খুন হন। এদের হাতে ছিল একে-৪৭ ও পিস্তল। সিধুর গাড়িতে ২৪টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। সঙ্গে থাকা দুজন বেঁচে যান। ৩০ জনের বেশি গ্রেফতার হয়, দুই সন্দেহভাজন পুলিশের তথাকথিত এনকাউন্টারে নিহত হয়। কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য অন্ধকারেই ছিল। কেবল একটা কাবাডি ম্যাচ তো হত্যার কারণ হতে পারে না।

মুসে ওয়ালার সঙ্গে বিষ্ণোইয়ের সম্পর্ক জটিল ছিল। গোল্ডির মতে, তারা বহু বছর যোগাযোগ রাখতেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তিগত অপমান ও সংঘর্ষ তার মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।

এ হত্যাকাণ্ড কেবল প্রতিশোধ নয়, একটি কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। ব্রার ও বিষ্ণোইয়ের নাম অনেকেই জানত না। মুসেকে মারার পর তারা এখন পরিচিত নাম। সাংবাদিকদের মতে, মুসে ওয়ালার মৃত্যুর পর গ্যাংস্টারদের চাঁদাবাজির ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। ব্যবসায়ী ও সংগীতশিল্পীরা ভয়ে রয়েছেন।

গোল্ডি যদিও বলেছেন, চাঁদাবাজি হত্যার কারণ ছিল না, তবে স্বীকার করেন এটা তাদের গ্যাং পরিচালনার মূল অংশ। তিনি বলেন, ‘চারজনের পরিবার চালাতে একজন মানুষকে সারা জীবন সংগ্রাম করতে হয়। আর আমাদের তো শত শত লোক আছে। চাঁদাবাজি করতেই হয়। টাকা পেতে হলে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে হয়।’

সিধু মুসে ওয়ালার হত্যাকাণ্ড পাঞ্জাবের তারকাখ্যাতি, রাজনীতি ও অপরাধজগতের অন্ধকার যোগসূত্রকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু এখনো বিচার অধরা। গোল্ডি অনুতপ্ত নন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ভাইয়ের জন্য যা করা দরকার, তা করেছি।’

ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে জীবন হারিয়েছেন মুসে ওয়ালা। একসময় মুসে ওয়ালা বলেছিলেন, তিনি চান মানুষ যেন তাকে মার্কিন র‍্যাপার টুপাক শাকুরের মতো মনে রাখে। আজ তার সংগীত ও মৃত্যু—দুটোই তাকে আধুনিক পাঞ্জাবের শিল্প, ক্ষমতা এবং অপরাধের সংঘর্ষের প্রতীক করে তুলেছে।