বইটা লিখেছিলেন কল্কি কৃষ্ণমূর্তি। দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যের গল্প। তবে পুরো সাম্রাজ্যের গল্প বললে একটু ভুল হবে। গল্প মূলত সিংহাসন দখলের। চোল সাম্রাজ্যের অন্যতম সেরা নৃপতি রাজরাজ চোল কেমন করে সিংহাসন লাভ করলেন, সেই গল্প বলে কল্কির এ বই। আর সিনেমায় সে বইয়ের সার্থক উপস্থাপনার সূচনা বলা যায় মণি রত্নমের সিনেমাটিকে।

মণির আগে পোনিয়িন সেলভান থেকে সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন কমল হাসান। কিন্তু পোনিয়িন সেলভানের ব্যাপ্তির কারণে আশির দশকে তা সম্ভব হয়নি। এবার যখন সম্ভব হলো, বেশ আঁটঘাঁট বেঁধেই নেমেছিলেন মণি রত্নম। আর এর পেছনে ছিল বহুদিনের প্রস্তুতি। সিনেমার পরতে পরতে সে প্রস্তুতির প্রমাণ পাওয়া যায়। চরিত্র অনুসারে কাস্টিং থেকে শুরু করে প্রতিটি চরিত্রের পোশাক, চোল সাম্রাজ্যের সময়ের আবহ তৈরির ক্ষেত্রে মণি রত্নম কোনো ছাড় দেননি। আর গল্পের ক্ষেত্রে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন সিংহাসনের প্রতি সাম্রাজ্যের প্রধান ব্যক্তিদের লোভ ও ষড়যন্ত্রের দিকে, আর ছিল প্রেম।

আদিত্য কারিকালানের সঙ্গে নন্দিনীর প্রেমের বিষয়টি পোনিয়িন সেলভান: পার্ট ওয়ানের অন্যতম মূল বিষয় হলেও মণি রত্নম সেখানে পরিমিতিবোধ দেখিয়েছেন। আদিত্য কারিকালানের ক্রোধ, সীমানা বিস্তার ও যুদ্ধে তার রণমূর্তির পেছনে তার ব্যর্থ প্রেমের প্রভাব এ সিনেমায় বোঝানো হয়, কিন্তু তা সিনেমার মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ওই সূত্রেই মণি রত্নম দেখিয়েছেন যে সাম্রাজ্যের কোণে কোণে চলছে চোল সাম্রাজ্যের সিংহাসন নিয়ে ষড়যন্ত্র।

পোনিয়িন সেলভানের প্রথম পর্বের সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ হলো ভালাভারিয়া চরিত্রে কার্থির অভিনয়। প্রাণচাঞ্চল্যে পূর্ণ এক যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। আদিত্য কারিকালান তাকে পিতার কাছে প্রেরণ করেন সাবধান করার জন্য। সেখান থেকে তাকে যেতে হয় আদিত্যর বোন কুন্দবাইয়ের কাছে। সেখানেই শেষ নয়, তাকে সিংহলে যাত্রা করতে হয় আরুলমোয়ির সঙ্গে দেখা করতে। ভালাভারিয়ার এ যাত্রার মধ্য দিয়েই পুরো সিনেমার গল্প এগিয়েছে। সেখানে কখনো ষড়যন্ত্র, কখনো কৌতুক, কখনো চোল সাম্রাজ্যের ইতিহাস দেখিয়েছেন মণি রত্নম। বাদ পড়েনি অ্যাকশনও। কার্থির অভিনয় আর মণি রত্নমের ‘টু দ্য পয়েন্ট’ গল্প বলার কারণে সিনেমার গতি ছিল একদম টানটান।

সিনেমায় লক্ষণীয় বিষয় হলো ভিজুয়াল এফেক্টস। সারা ভারতে যখন ভিজুয়াল এফেক্ট নিয়ে নানা কথা হচ্ছে এবং সমালোচনা হচ্ছে কোনো কোনো সিনেমা নিয়ে, সেখানে মণি রত্নমের সিনেমার ভিএফএক্স প্রায় নিখুঁত। এ সবকিছুর জন্য আসলে মণি রত্নমের পুরো টিম, যেমন সিনেমাটোগ্রাফির জন্য রবি বর্মণ, সংলাপের জন্য জয়মোহন, চিত্রনাট্যের জন্য মণি রত্নমের সঙ্গে জয়মোহন ও কুমারবেল এবং সিনেমার চমৎকার সম্পাদনার জন্য শ্রীকর প্রসাদ প্রশংসার যোগ্য। সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন এআর রহমান। তার কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন হয় না। এ সিনেমার সংগীতও অসাধারণ।

সিনেমাটিতে বেশকিছু যুদ্ধদৃশ্য রয়েছে। সেখানে প্রধান পুরুষ আদিত্য কারিকালানরূপী বিক্রম। পোনিয়িন সেলভানে বিক্রমের চরিত্রটিই প্রথম পর্যায়ে প্রধান বলে মনে হয়। আদিত্যর চরিত্রটি আগ্রাসী। বিক্রম বরাবরই এ ধরনের চরিত্রে চমৎকার কাজ করেন। এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি। এ সিনেমার প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে আছেন বিক্রম ও ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। স্ক্রিন শেয়ার না করলেও তাদের রসায়ন চমৎকার। এটি চিত্রনাট্য ও মণির পরিচালনার পাশাপাশি তাদের অভিনয়ের গুণ। প্রতিশোধের ধিকিধিকি আগুন আদিত্য ও নন্দিনী বহন করে, আর তা বিক্রম ও ঐশ্বরিয়ার চোখেমুখে দেখা যায়। একইভাবে ভালো করেছেন তৃষা কৃষ্ণন। কুন্দ চরিত্রে আভিজাত্য ও আত্মবিশ্বাস তার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে। ঐশ্বরিয়া ও তৃষার মুখোমুখি সিকোয়েন্সটি সিনেমার অন্যতম। বাদ দেয়া যাবে না প্রকাশ রাজ, প্রভু, পার্থিব ধারাকৃষ্ণ ও শোভিতা ধুলিপালাকেও। প্রতিটি চরিত্রে অনবদ্য কাজ করেছেন তারা।

পোনিয়িন সেলভান মূলত রাজরাজ চোলের গল্প। তার প্রথম জীবনের নাম আরুলমোয়ি বর্মণ (কোথাও কোথাও অরুণমোয়িও লেখা হয়)। পরন্তক তথা সুন্দ চোলের তিনি কনিষ্ঠ পুত্র, আদিত্য কারিকালানের ভাই। কথিত আছে পাঁচ বছর বয়সে কাবেরী নদীতে ডুবতে বসলে খোদ ‘মাতা কাবেরী’ তাকে জীবনদান করেন। কাবেরীর অন্য নাম ‘পোনি বা পোন্নি’ হওয়ার কারণে আরুলমোয়ির আরেক নাম ‘পোনিয়িন সেলভান’। রাজরাজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়ম রবি। এ সিনেমার শেষের দিকে ৩০-৪০ শতাংশে আরুলমোয়িকে আনা হয়েছে। সে চরিত্রে জয়ম রবি পরিণত রাজপুত্র হওয়ার দিকে এগোচ্ছেন, এমন একটি চরিত্রে নিজেকে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। সিনেমার শেষের দিকে তার এবং সিনেমার বাকি গল্পের বিস্তৃতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সে গল্প অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবে। নতুন রূপে দ্বিতীয় পর্বে ফিরবেন আরো অনেকে। যেখানে শেষ করেছেন মণি, দর্শকের আগ্রহ পরের পর্বের জন্য বাড়ছে বৈ কমছে না। চোলদের মতো দর্শকরাও পোনিয়িন সেলভানের ফেরার অপেক্ষা করবে।