সিনেমা বদলে দেয়ার ইতিহাসে যে সিনেমাগুলোর নাম আসে তার মধ্যে গদারের ব্রেথলেস প্রথম দিকে থাকবে। ত্রুফো, ফেলিনি, গদাররা যে ধারার শুরু করেছিলেন বা করতে চাচ্ছিলেন তার অন্যতম একটি উদাহরণও ‘ব্রেথলেস’। ১৯৬০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে বেশকিছু বিষয় গদার এনেছিলেন, যা সেই সময়কার সিনেমায় নতুন। এ ধরনের বিষয়গুলো সিনেমায় আনা হতো না। কেননা সিনেমার ধারাটি ছিল উপভোগ সম্পর্কিত। সেখানে বিনোদনের কোনো না কোনো অনুষঙ্গ থাকবে। প্রেম থাকবে। গদার এগুলো রেখেছিলেন, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত করেন সরাসরি কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার বিষয়। প্রেম তিনি দেখিয়েছেন, তবে প্রচলিত ধারায় নয়। সেখানে দ্বিধা আছে, আছে প্রশ্ন। তরুণের প্রেম ও তার তরুণী প্রেমিকার দ্বিধা এ সিনেমার একটি বড় জায়গাজুড়ে আছে, যদিও তা বোঝা কঠিন।

ব্রেথলেস, অর্থাৎ রুদ্ধশ্বাস। সিনেমাটি দেখতে দেখতে নানা কারণে প্রশ্ন আসবে যে এখানে আদতে কোথায় শ্বাসরোধ হচ্ছে। এটি থ্রিলার নয়, হররও নয়। এক সন্ত্রাসীর জীবন ও তার পালিয়ে বেড়ানোর গল্প ব্রেথলেস। মাইকেল নামের এ সন্ত্রাসী পালিয়ে বেড়ায় পুলিশের হাত থেকে। সে ফিরে আসে তার প্রেমিকার কাছে। একটা ইচ্ছে থাকে তার, জীবনকে নতুন করে তৈরি করার। কিন্তু সেটা আদতে সম্ভব হবে কিনা তা নির্ভর করে বেশকিছু বিষয়ের ওপর। সিনেমা সেই টানাপড়েনের মধ্যে চলতে থাকে। কিন্তু মাইকেল জানে একটি গাড়ি চুরি করে পালানোর সময় পুলিশকে গুলি করেছে সে। তার পালিয়ে বেড়ানো সহজ হবে না।

মাইকেল কপর্দকশূন্য। কিন্তু নিজেকে সে আমেরিকার সিনেমা পারসোনা হামফেরি বোগার্টের মতো করে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। প্যাট্রিসিয়ার সঙ্গে সে দেখা করে এবং প্যারিসের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। মেয়েটি একজন সম্ভাবনাময় সাংবাদিক। প্যারিসের রাস্তায় সে নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন বিক্রি করে। এ সময় মাইকেল এসে প্যাট্রিসিয়ার অ্যাপার্টমেন্টে লুকিয়ে থাকে এবং প্যাট্রিসিয়াকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটা লোন ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। প্যাট্রিসিয়াকে মাইকেল ইতালিতে বসবাস করার স্বপ্ন দেখায়। সে জায়গায়ই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। গদার দেখান প্যাট্রিসিয়া কিছুটা দ্বিধান্বিত। সে যখন জানতে পারে পুলিশ মাইকেলের পিছু নিয়েছে, তখন তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে সিনেমায় টেনশন তৈরি হয়। দর্শক এ সময়ে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে পড়ে।

গদারের ব্রেথলেস এমন কিছু বিষয় উপস্থাপন করে, যা এর আগে সিনেমায় আসত না। যেমন সিনেমায় এসেছে প্যারিসের চিত্র। প্যাট্রিসিয়া প্যারিসের বুলভার্দে ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করে এবং তার সঙ্গে পথে হাঁটে মাইকেল। তাদের দুজনের ভ্রমণের মধ্য দিয়ে এ সিনেমায় প্যারিসকে পোর্ট্রে করা হয়েছে। মাইকেলের উচ্চাশা যতটা না, তার চেয়ে উঠে এসেছে নতুন করে জীবন তৈরি করার ইচ্ছা। সে সময়কার তরুণদের মনের ইচ্ছার একটি বহিঃপ্রকাশ রেখেছেন গদার। পত্রিকার একটি বড় ভূমিকা ছিল পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে। সিনেমায় প্যাট্রিসিয়ার পত্রিকা বিক্রির চিত্রে সেটি তুলে এনেছেন গদার। তিনি নিজে কায়ে দ্যু সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ সিনেমার একটি দৃশ্যে দেখা যায়, একজন নারী হকার মাইকেলের কাছে কায়ে দ্যু সিনেমা নামের ম্যাগাজিনটি বিক্রি করার চেষ্টা করে।

সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। টানটান উত্তেজনা বলতে এখন যা বোঝায়, তা গদার রাখেননি। কিন্তু গাড়ি চুরি বা পুলিশের তাড়ার দৃশ্যে উপযুক্ত মিউজিক রেখেছেন। পোশাক, সেট ও নির্মাণে বাস্তবতার ছাপ স্পষ্ট। এ সিনেমায় মাইকেল ও প্যাট্রিসিয়ার ঘনিষ্ঠ হওয়ার দৃশ্যগুলোকে যৌনদৃশ্য না বলে রোমান্টিক বলাই ভালো। ঘনিষ্ঠতার রোমান্টিক চিত্রায়ণ করেছেন গদার। তার অন্যান্য সিনেমায় যৌনতা বা শরীরী উপস্থাপনা আছে, এ সিনেমায় তা তুলনামূলক মৃদু। সাদাকালো সিনেমাটিকে তিনি মাইকেল ও প্যাট্রিসিয়াির নগ্নতাকে দেখিয়েছেন, সেখানে তাদের শরীরের রঙের সঙ্গে সিনেমার রঙের মিল রেখেছেন পরিচালক গদার।

এ সিনেমার পর পরই জ্যঁ-পল বেলমঁদো তারকা বনে যান। তাকে নিয়ে একাধিক সিনেমা নির্মাণ করেছেন গদার। প্যাট্রিসিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিন সিবার্গ। তাদের রসায়নও চমত্কার ছিল, বিশেষত সিনেমার শেষের দিকে প্যাট্রিসিয়ার দ্বিধার জায়গাটিতে ‘মাইকেল-প্যাট্রিসিয়া সম্বাদ’টি ক্ল্যাসিক। পরে যদিও মাইকেলের দেবদাস সুলভ আচরণটি পুরনো ধারার প্রেমের গল্পেরই নতুন উপস্থাপন। তবে এখানে মাইকেলের ছুটে বেড়ানোর ক্লান্তি আধুনিক সময়ের মানুষের ছুটে চলার বিষয়টিকে চিহ্নিত করে। সিনেমার শেষ দৃশ্যে মাইকেল ও প্যাট্রিসিয়ার সংলাপ নিয়ে আজও দর্শক ও সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে তর্ক হয়। মাইকেল প্যাট্রিসিয়াকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলেছিল, নাকি সময়কে? গদার এখানেই অন্যদের থেকে এগিয়ে। আর এখান থেকেই শুরু হলো ফরাসি সিনেমার নতুন ধারা।