২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঠিক কোন মুহূর্তে আপনি আপনার আলোচিত গান ‘কথা ক’ লিখলেন? কোন পরিবেশ বা অনুভূতি থেকে গানটি তৈরির তাগিদ অনুভব করেছিলেন?

ওই সময় দেশের পরিস্থিতি দেখে সবাই যার যার জায়গা থেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল। আমার মনে হলো, সাধারণ কোনো লেখা বা আলোচনার চেয়ে আমি আমার সংগীতের মাধ্যমে ভালো প্রতিবাদ করতে পারব। আমি যেহেতু র‍্যাপ করি, তাই ভাবলাম র‍্যাপকে মাধ্যম বানিয়ে আমার ভেতরের কথাগুলো প্রকাশ করি। সে তাগিদ থেকেই মূলত গানটি লেখা।

গানটির লেখা শুরু করা থেকে প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত পুরো জার্নিটা যদি সংক্ষেপে বলতেন।

১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের দিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছিল। ১৬ জুলাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই অনুভব করলাম—আমাকে এখনই কিছু একটা করতে হবে, এক ধরনের তাগিদ কাজ করছিল। সেদিনই গানটি লেখা শুরু করি, সন্ধ্যার মধ্যে রেকর্ডিং শেষ হয় এবং রাতেই আমরা এটি প্রকাশ করি। গানটি যে দেশজুড়ে এতটা ছড়িয়ে পড়বে বা মানুষ এভাবে লুফে নেবে, তা ভাবনায় ছিল না; কেবল নিজের দায়বদ্ধতা থেকেই তৈরি করেছিলাম।

‘কথা ক’ প্রকাশের দিনই রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হন। খবরটি পাওয়ার পর আপনার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল?

পরিস্থিতি যে এমন মারাত্মক মোড় নেবে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। খবরটি পাওয়ার পর মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ওই স্থানে আমিও থাকতে পারতাম, আজ হয়তো আমার মায়ের বুক খালি হতো। আমরা সবাই তীব্র ধাক্কা খেয়েছিলাম এবং স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম।

আপনার গানের ‘‌কথা ক, দ্যাশটা বলে স্বাধীন তাইলে খেচটা কই রে?’ লাইনটি অনেক জনপ্রিয়তা পায়। এটি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী বলে মনে করেন?

আসলে তখন সবাই একই রকম মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সবাই যে কথাটি মনে মনে ভাবছিল, গানটির মাধ্যমে সেটিই ফুটে উঠেছিল। ফলে শ্রোতারা লাইনটির সঙ্গে নিজের অনুভূতিকে সরাসরি মেলাতে পেরেছিলেন।

গানটি প্রকাশের পর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী হিসেবে কি ধরণের পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে?

গানটি প্রকাশের পর পরই সেটি মিউট করে দেয়া হয় এবং স্ট্রাইক পাঠানো হয়। এরপর ১৭ জুলাই যখন আমরা চাষাঢ়ায় রাজপথের আন্দোলনে যোগ দিই, সেখান থেকে কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকেই আমাকে নানাভাবে হুমকি দেয়া শুরু হয়। পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে যেতে পারে, এমন খবর পাওয়ার পর আমি আর নিজের বাসায় অবস্থান করতে পারিনি, নিরাপত্তার খাতিরে কিছুদিন অন্য জায়গায় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল।

আপনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখেছিলেন র‍্যাপ শিল্পীরা উপযুক্ত সম্মান পাচ্ছেন না। এ বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে যদি কিছু বলতেন।

বিষয়টি শিল্পী বা বিভিন্ন ঘরানার সংগীতের মধ্যে নয়, সমস্যা তৈরি করেন মূলত আয়োজক ও পরিচালকরা। আমাদের দেশে র‍্যাপকে অনেক সময় কেবল ‘স্ট্রিট কালচার’ ভেবে হালকাভাবে দেখা হয়। কোনো বড় আয়োজনে গেলে র‍্যাপ শিল্পীদের সুযোগ-সুবিধা, সম্মান বা পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত আপস করতে হয়। আমরা আশা করেছিলাম, জুলাই অভ্যুত্থানে র‍্যাপ মিউজিকের বিশাল প্রভাবের পর হয়তো এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসবে, যদিও পুরোপুরি তা হয়নি।

গণ-আন্দোলনের প্রতিবাদী গান থেকে সম্প্রতি ‘প্রিয়মালতী’ সিনেমার ‘এই শহরের স্বার্থপর’ গানে কাজ করলেন। সিনেমার গানে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?

অভিজ্ঞতা সত্যি খুব চমৎকার। জুলাইয়ের আগেই আমার দুটি অ্যালবাম বের হয়েছিল এবং সিনেমা নিয়ে টুকটাক কথা চলছিল। অবশেষে গুণী কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে কাজটি করতে পেরে ভালো লেগেছে।

বর্তমানে কী নিয়ে কাজ করছেন? নতুন কোনো প্রজেক্ট বা অ্যালবামের পরিকল্পনা আছে?

এখন আমি মূলত আমার নিজের দুটি নতুন অ্যালবাম নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। সম্প্রতি আমার ‘সিস্টেম’ নামের একটি গান প্রকাশ পেয়েছে। আসলে র‍্যাপ মিউজিক মানেই প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলা এবং প্রতিবাদের ভাষা।

আপনার গান ও অবদানের কথা সপ্তম শ্রেণীর ‘ইংলিশ ফর টুডে’ পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি একজন শিল্পী হিসেবে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সত্যি বলতে, আমাদের নাম কোনো পাঠ্যবইয়ে ঠাঁই পাবে, এমন কিছু আমরা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। আমরা কোনো প্রাপ্তির আশায় আন্দোলন বা গান তৈরি করিনি, কেবল মুহূর্তের তাগিদে করেছি। তবে এ স্বীকৃতি অনেক বড় পাওয়া। দেশের মানুষের ভালোবাসার প্রতি আমরা অশেষ কৃতজ্ঞ।

জুলাই অভ্যুত্থানের সার্বিক অর্জন ধরে রাখা নিয়ে দেশবাসীকে কী বলতে চান?

দেশের বর্তমান অসামঞ্জস্য ও দ্বন্দ্বগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠা দরকার। বৈষম্য দূর করে সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নিতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। সেক্ষেত্রে আবার সবাইকে একই সুরে বলতে হবে—‘কথা ক’!