ওটিটি জগতে পা রেখেছে বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর। তবে শেষ দুই বছরে ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজ নির্মাণে গতি এসেছে। দেশীয় ওটিটি প্লাটফর্মে যেমন আসছে কিছু ভালো কাজ, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের প্লাটফর্মের সঙ্গে মিলেও দেশের অনেকে কাজ করছেন। সে ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তানিম নূর পরিচালিত সিরিজ ‘কাইজার’। সিরিজটি এসেছে হইচইয়ে। আর মুক্তি পাওয়ার পরই হইচই ফেলে দিয়েছে দুই বাংলার দর্শকদের মধ্যে।

কাইজার একটি থ্রিলার সিরিজ। বেশির ভাগ ক্ল্যাসিক গোয়েন্দা গল্পের মতোই এখানে শুরুতে আছে একটি খুনের ঘটনা। সে খুনের তদন্তে নামে প্রধান চরিত্র। এ সিরিজে সে চরিত্রটির নাম কাইজার। মজার ব্যাপার হলো শার্লক, ফেলুদা বা পোয়ারোর মতো তুখোড় গোয়েন্দা সে নয়। কাইজার আমাদের আশপাশে হেঁটে চলে বেড়ানো একজন নিয়মিত পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি বাংলাদেশ পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ অর্থাৎ ডিবিতে কাজ করেন। তার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভাঙা পরিবার, সে কারণে মানসিক অস্থিরতা, ক্যারিয়ারেও কয়েকটা লাল দাগ এবং তার ওপর রয়েছে ভিডিও গেমে আসক্তি। এহেন কাইজারকেই এ সিরিজে জোড়া খুনের রহস্যভেদ করতে দেখা যায়।

ওয়েব সিরিজ হিসেবে কাইজার এগিয়ে থাকবে বেশকিছু কারণে। প্রথমত, সিরিজের গল্প বলা ও গল্প তৈরি করার ধরনটা ভিন্ন। প্রধান চরিত্র কাইজারকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সময় নিয়ে। মূল কাহিনীর পাশাপাশি কাইজারের ব্যক্তিজীবন, সম্পর্ক, ভালোমন্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেটা কখনো মূল কাহিনী থেকে সরে যায়নি। গল্পের সাবপ্লট এবং মূল কাহিনীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে দক্ষ হাতে।

এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিনয়। আফরান নিশো নিজের সিগনেচার ক্যারেক্টার থেকে বেরিয়ে এসে একটু ভিন্ন রকম কাজ করার চেষ্টা করেছেন। কাইজারের মতো রগচটা চরিত্র আফরান আগেও করেছেন, কিন্তু এখানে কাইজার একজন দায়িত্ববান গোয়েন্দা, পাশাপাশি ফ্রাস্ট্রেটেড হলেও তার মধ্যে আছে আবেগ। এসবটা তিনি চমত্কার ফুটিয়ে তুলেছেন। কাইজারের চরিত্রটি এ সিরিজের গল্পকার ও পরিচালক প্রতিষ্ঠিত করতে গল্পটার ডালপালা তৈরি করেছেন। আর ১০টা গোয়েন্দার মতো কাইজার একা না। তার একটা পরিবার আছে, বন্ধুবান্ধব আছে। অর্থাৎ সাধারণ একজন মানুষ কিন্তু কাজের প্রতি যিনি শতভাগ সৎ। এখানেই ক্ল্যাসিক গোয়েন্দাদের খোলস ঝেড়ে ফেলে কাইজার তার স্বাতন্ত্র্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে।

আফরান নিশোর কাইজারের সঙ্গে যে পার্শ্ব চরিত্রগুলো রয়েছে, তারাও ভালো অভিনয় করেছেন। অম্লান চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, শিরিন চরিত্রে রিকিতা নন্দিনী শিমু, নিকিতা চরিত্রে ঋদ্ধি, ব্যারিস্টার চরিত্রে ইমতিয়াজ বর্ষণ পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। ক্যামিও করেছেন আহমেদ রুবেল। গল্পের বাঁক দেখে মনে হচ্ছে পরের সিজনে তিনি আসবেন মূল খল চরিত্র হয়ে।

বাংলাদেশী গোয়েন্দা সিরিজ হিসেবে কাইজার ভিন্ন রকম। প্রথমত, সিরিজটি সাজানো হয়েছে কম্পিউটার গেমের আদলে। এমন না যে সিরিজের মাঝে মাঝে অ্যানিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গল্পটা এগিয়েছে গেমের গঠন অনুসারে। এমনকি প্রতিটি পর্বের নামও গেমের এক একটা স্টেজ অনুসারে। আরো একটি কারণে কাইজার ভিন্ন। এ সিরিজে অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে ফেলুদা, শার্লক, কিরীটী রায়ের মতো গোয়েন্দা চরিত্র ও আগাথা ক্রিস্টির নাম। কাইজাররা ছোটবেলায় তিন বন্ধু মিলে গোয়েন্দাগিরি করত। ‘তিন গোয়েন্দা’ হতে চেষ্টা করেনি, আশি-নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে এমন কিশোরের দেখা মেলা দুর্লভ। সিরিজে বিষয়টি তুলে আনার সঙ্গে কাজী আনোয়ার হোসেন ও রকিব হাসানকে ‘কৃতজ্ঞতা’ও প্রকাশ করেছেন নির্মাতারা।

সব মিলিয়ে, মার্ডার মিস্ট্রির পাশাপাশি কাইজার হয়ে উঠেছে একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প। সেখানে নির্মাণের পরিমিতিবোধ, সংগীতের ব্যবহারে নস্টালজিয়া দেখা যায়। আবহ সংগীতের সময় আশির দশকের ঢাকা দেখিয়েছেন তানিম নূর। খুন, মাদক ব্যবসা, তিন গোয়েন্দা, গেম আর সম্পর্কের ভাঙাগড়ার ‘কাইজার’ তাই সব মেজাজের দর্শককে আটকে রাখে।