নতুন উদ্যমে দেশ, সমাজ ও জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে উদযাপিত হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। স্বাগত ১৪৩৩!

আজ পহেলা বৈশাখ। দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, বাঙালির সর্বজনীন লোক উৎসব। আনন্দ, মিলন ও শুভযাত্রার প্রতীক এ দিনটি নতুন জীবনের আহ্বান নিয়ে আসে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানে আজ উৎসবের আবহ। রঙ, গান আর শুভকামনায় মুখরিত বাঙালির জনপদ।

একসময় বাংলা নববর্ষ পালিত হতো মূলত ঋতুভিত্তিক বা আর্তব উৎসব হিসেবে। তখন এ উৎসবের সঙ্গে কৃষিকাজের ছিল গভীর সম্পর্ক, কারণ কৃষি ছিল সম্পূর্ণরূপে ঋতুচক্রনির্ভর। পরে হিজরি চান্দ্র সন ও বাংলা সৌর সনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে নতুন বঙ্গাব্দ। কৃষিকাজ ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সন প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। তবে তা কার্যকর হয় তার সিংহাসনে আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে। প্রথমে এটি ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে এর নাম হয় বঙ্গাব্দ।

সে সময় চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত কৃষকরা জমিদার ও ভূস্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতেন। আর নতুন বছরের প্রথম দিনে ভূস্বামীরা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। সেই আয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখে যুক্ত হয় মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ উৎসবের রঙিন পরম্পরা।

‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে দেশবাসীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে ঐতিহ্য ও নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর ফিরে আসে নতুনের আহ্বান নিয়ে। নতুন বছরের আগমনে পুরনো জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।’

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের যার যার ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সহনশীলতা, উদারতা ও সম্প্রীতির চর্চা গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করবে এবং বহুমতের সহাবস্থানকে সুদৃঢ় করবে। বিশ্ব আজ নানা সংকট ও সংঘাতে বিপর্যস্ত। নববর্ষের এ শুভক্ষণে আমরা যেন সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণের পথ অনুসরণ করি—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে আমরা অতীতের সব হতাশা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।’

দিনটি সরকারি ছুটির দিন। প্রতিবারের মতো এবারো নববর্ষ উদযাপন করবে বিভিন্ন সংগঠন। ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। শোভাযাত্রায় এ বছরের প্রতিবাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।

বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে নানা আয়োজন হাতে নিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে রয়েছে পাঁচদিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একাডেমি জানিয়েছে, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমির বর্ষবরণ উৎসবে থাকছে ঢাকঢোল, লাঠিখেলা, ঘুড়ি উড়ানো, লাটিম খেলা, জারিগান, সারিগান, পটগান, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালা, কবিগান, গাজির গান, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া গান, পুতুলনাট্য, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বৈশাখী মেলার মতো নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ আয়োজন।

রমনা বটমূলে ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে ভৈরবীতে রাগালাপ দিয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ বরণের সূচনা করবে ছায়ানট। তাদের এবারের বার্তা, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। সুর, বাণী ও ছন্দে গাঁথা পরিবেশনায় উঠে আসবে দেশপ্রেম, মানবতা ও লোকজ জীবনের নানা অনুষঙ্গ। প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী এ আয়োজনে অংশ নেবেন প্রায় দুইশ শিল্পী। পরিবেশনায় থাকবে আটটি সম্মেলক গান, ১৪টি একক পরিবেশনা ও দুটি আবৃত্তি। এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হবে প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ এবং গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীকে।

‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, মীনা বাজারসংলগ্ন সড়কে বর্ণাঢ্য বৈশাখী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সকাল ৯টায় শুরু হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। দিনব্যাপী থাকছে বৈশাখী উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, কবিতা, নৃত্য এবং নানা আয়োজন।

হাজারো কণ্ঠে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করতে সকালে ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ‘সুরের ধারা’। খ্যাতিমান শিল্পীদের পাশাপাশি সংগীত পরিবেশন করবেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে ২০ এপ্রিল থেকে ১৪ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা আয়োজন করা হবে।

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে প্রতি বছরের মতো এবারো বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রয়াত গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী’। ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে পহেলা বৈশাখের ভোরে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।

নববর্ষ উপলক্ষে সব কারাগার, হাসপাতাল ও এতিমখানায় উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। শিশু-কিশোর, ছাত্রছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ থাকবে।

প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পহেলা বৈশাখে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে। সবাই চেষ্টা করে নতুন পোশাক পরতে, ভালো খাবার খেতে এবং দিনটি আনন্দের সঙ্গে কাটাতে। ঘরে ঘরে মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। পরিবার-পরিজন একত্র হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, গড়ে ওঠে আন্তরিকতার এক উষ্ণ পরিবেশ। নববর্ষে একে অন্যের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় গ্রামীণ সমাজে এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক রীতি। কোথাও কোথাও ঐতিহ্য অনুসারে ছোটখাটো মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ গান-বাজনার আয়োজন দেখা যায়। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির শক্তিশালী ধারক-বাহক।