সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। প্রায় সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে। এর আগে সফলতার সঙ্গে সামলেছেন ব্র্যাক ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর পদ। চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি)। এমটিবির ২৭ বছর পূর্তি, ব্যক্তিগত জীবন, ব্যাংকিং ক্যারিয়ারসহ দেশের ব্যাংক খাতের নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমামূল হাছান আদনান

বেসরকারি খাতের তিনটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কাজ করেছেন। এর মধ্যে এমটিবিতে আছেন প্রায় সাত বছর। এখান থেকেই আগামী ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যাচ্ছেন। আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনের গল্প শুনতে চাই।

ছোটবেলায় কখনো পাইলট, কখনো ব্যারিস্টার হওয়ার কথা ভেবেছি। তবে ব্যাংকার হওয়ার কথা কখনো মাথায় আসেনি। আমাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন কিংবা আশপাশে এমন কোনো ব্যাংকারও ছিলেন না, যাকে দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বে স্নাতক শেষ করার পর জানতে পারলাম, আইবিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে, যেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করলে করপোরেট খাতে কাজের অনেক সুযোগ তৈরি হয়। এরপর আইবিএতে ভর্তির চেষ্টা করি এবং প্রথমবারেই সফল হই। তখনো ব্যাংকার হওয়ার পরিকল্পনা ছিল না।

কর্মজীবনের শুরুতে এফএমসিজি খাতে কাজ করি। এরপর যোগ দিই আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাবিনকোতে। সেটি ১৯৮৮ সালের কথা। সেখানে প্রায় চার বছর কাজ করার পর আইডিএলসি ফাইন্যান্সে যাই। ১৯৯৬ সালে ব্যাংক খাতে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা ভাবি। ততদিনে দেশে দ্বিতীয় প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক ও বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। আমি যে ভবনে কাজ করতাম, সেখানেই ছিল গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক, যা বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড নামে পরিচিত। যাতায়াতের পথে ব্যাংকটি দেখতাম। দেশের প্রথম সারির ব্যাংকগুলোর একটি হওয়ায় সেখানে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়।

তখন আইডিএলসিতে কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন মামলা দেখাশোনার জন্য মাঝেমধ্যে আদালতে যেতে হতো। সেখানেই কাইজার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি বর্তমানে নগদের চেয়ারম্যান। তিনি তখন গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে ঋণ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তাকে বললাম, ব্যাংকে কাজের একটা সুযোগ খুঁজছি। তিনি জীবনবৃত্তান্ত দিতে বললে দিলাম। এরপর সাক্ষাৎকারে নির্বাচিতও হয়ে গেলাম। গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে যোগদানের পর চট্টগ্রামে পোস্টিং হয়। পরে ওই ব্যাংকটিকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড অধিগ্রহণ করে। সেখান থেকেই আমার বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ে পথচলা শুরু। পরে সন্তানদের বেড়ে ওঠার কথা বিবেচনা করে ঢাকায় ফেরার প্রয়োজন অনুভব করি। ২০০২ সালে সিটিব্যাংক এনএর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমি যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যাংকে কাজ করি।

সে সময় সিটিব্যাংক এনএর পক্ষ থেকে সিঙ্গাপুরে বদলির প্রস্তাব পাই। আমার ও পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান ও নির্ভরশীলদের অনুমতিপত্রও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন বড় মেয়ে ভারতে ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাকালরিয়েট (আইবি) পড়ছিল, ছোট মেয়ে মাত্র নবম শ্রেণীতে উঠেছে। আমার স্ত্রীও শিক্ষকতা করতেন। সন্তানদের আপত্তির কারণে সে সময় আর সিঙ্গাপুরে যাওয়া হয়নি। এরপর সিদ্ধান্ত নিই, দেশে থাকলে বেসরকারি ব্যাংকেই কাজ করা উচিত। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের মার্চে প্রাইম ব্যাংকে যোগ দিই। এভাবেই কেটে গেছে আমার ৩৮ বছরের কর্মজীবন। এখন সেই দীর্ঘ পথচলার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শেষের দিকে।

ক্যারিয়ারের শুরুতে কিংবা মাঝপর্যায়ে কি কখনো ভেবেছিলেন, একদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় তিনটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী হবেন?

না, কখনই ভাবিনি। এমনকি প্রাইম ব্যাংকে যোগ দেয়ার আগে, ২০০৭ সালের শেষ দিকে যখন সিঙ্গাপুরে যাওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত, তখনো কোনো বেসরকারি ব্যাংকে যোগ দেয়া কিংবা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী হওয়ার কথা চিন্তা করিনি। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দেয়ার পরই প্রথম প্রধান নির্বাহী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।

তখন প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন আজম জে চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন এম শাহজাহান ভূঁইয়া। তারা আমাকে কাজের অনেক সুযোগ দিয়েছিলেন। প্রাইম ব্যাংকে কিছুদিন কাজ করার পর ব্র্যাক ব্যাংক থেকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে যোগ দেয়ার প্রস্তাব পাই। ২০০৮ সালের অক্টোবরে ব্র্যাক ব্যাংকে যোগ দিই। এরপর ২০১০ সালের জুনে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিই। পরে ২০১৫-১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা ব্যাংকের এমডি ছিলাম। সেখান থেকে এমটিবির শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে যোগ দিই।

ক্যারিয়ারে অনেক মানুষের সহযোগিতা পেয়েছেন। তাদের স্মরণের পাশাপাশি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কোন ব্যাংকে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

প্রতিটি ব্যাংকেই অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন, আর প্রতিটি জায়গায় কাজের মধ্যে আলাদা ধরনের রোমাঞ্চ ছিল। ২০১০ সালে যখন ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দিই, তখন ব্যাংকটিকে মানুষ সেভাবে চিনত না। অনেকে এটিকে এনজিও ব্যাংক বলে মনে করত। তখন ব্যাংকটির করপোরেট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০০ কোটি টাকা। এসএমই খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৯ শতাংশ। ব্র্যাক ব্যাংক ছাড়ার সময় তা কমিয়ে ৭-৮ শতাংশে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম।

ব্র্যাক ব্যাংকে থাকতেই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসির সঙ্গে ক্রেডিট লাইনের চুক্তি করি। ধীরে ধীরে ব্যাংকটির করপোরেট ব্যাংকিং কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হয়। এ খাতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ পোর্টফোলিও গড়ে তুলেছিলাম। ২০১১ সালে বিকাশের যাত্রা শুরু হয়। আমি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলাম। সেটিও ছিল আমার কর্মজীবনের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তি।

ব্র্যাক ব্যাংকে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান স্যার ফজলে হাসান আবেদের বড় ভূমিকা ছিল। ব্যাংকটির তৎকালীন এমডিও আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তবে ডিএমডি হিসেবে যোগদানের মাত্র দুই বছর পর তিনি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আমি তাকে বলেছিলাম, তিনি যেন না যান, কারণ আমি তখনো দায়িত্ব নেয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নই। কিন্তু তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আমার মনে হয়, কর্মজীবনে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এরপর ২০১৫ সালে ঢাকা ব্যাংকে যোগ দিই। সেখানে ব্যাংকটির রূপান্তর ও বাণিজ্য অর্থায়ন কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত করার কাজে যুক্ত ছিলাম। সেটিও ছিল আমার কর্মজীবনের আরেকটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে আসার পর অভিজ্ঞতা কেমন?

এমটিবিতে যোগ দেয়ার সময় এ ব্যাংকের অনেক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীভূত ছিল। সেগুলো কেন্দ্রীভূত করার কাজে যুক্ত ছিলাম। তখন ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকারও কম, যা এখন প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় সুশাসন নিশ্চিত করেছি। ২০১৪-১৬ সালে বিতরণকৃত কিছু খারাপ ঋণের প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে। তবে গত ছয় বছরে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের হার মোটামুটি ১ শতাংশের কাছাকাছি। এক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। গর্ব করে বলতে পারি, বর্তমানে আমরা বাজারের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল ব্যাংক। অন্য ব্যাংক যেখানে ব্যাংকিং অ্যাপ তৈরিতে ২৫-৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, সেখানে আমাদের সহকর্মীরা নিজেদের প্রচেষ্টায় প্রায় কোনো অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ব্যয় ছাড়াই অ্যাপটি তৈরি করেছেন। পাশাপাশি ভয়েস ও ভিডিও ব্যাংকিং নিয়েও কাজ করেছি। কার্ড ব্যবসায়ও আমাদের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। একসময় সপ্তম-অষ্টম অবস্থানে থাকলেও এখন তৃতীয় স্থানে রয়েছি। গ্রাহকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা উন্নত করতে লাউঞ্জ চালু করেছি। পাশাপাশি রিব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাংকটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে পেরেছি। এসব পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়ায় আমাদের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তিনি ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক ও পরামর্শক। যেখানেই কাজ করেছি, সেখানেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। পরিচালনা পর্ষদ, সহকর্মী ও পুরো দলের সহযোগিতায়ই তা সম্ভব হয়েছে।

৩৮ বছরের কর্মজীবনে পেছনে ফিরে তাকালে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বেদনা দেয়?

কর্মজীবনে চড়াই-উতরাই থাকেই। বিভিন্ন সময়ে সংকট এসেছে, সাময়িক হতাশাও কাজ করেছে। তবে পরে মনে হয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতা আমার জন্য ভালোই হয়েছে। যেমন সিঙ্গাপুরে যাইনি। ২০০১ সালে কানাডায় অভিবাসনের প্রক্রিয়াও প্রায় সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। আমি খাঁটি বাংলাদেশী, নিজের দেশকে নিয়ে গর্ব করি। বিদেশে ভ্রমণ আর সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে মানিয়ে নেয়া এক বিষয় নয়।

তবে ব্যক্তিগত জীবনে একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে। পড়াশোনার জন্য মেয়েরা অনেক দূরে চলে যাওয়ায় তাদের বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কাছে থেকে উপভোগ করতে পারিনি। এ সময়টা খুব মিস করি। যদিও দূরে থেকেও তারা সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছে, তবু বাবা হিসেবে তাদের পাশে থাকতে পারলে ভালো লাগত।

ক্যারিয়ারের পাশাপাশি কোন সাফল্য আপনার জন্য বেশি আনন্দের?

পরিবারকে কেন্দ্র করেই আমার জীবন আবর্তিত। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। আমরা চার ভাই ও এক বোন ছিলাম। নানা কারণে হয়তো সব ইচ্ছা পূরণ করতে পারিনি। কিন্তু মেয়েদের ভালো স্কুলে পড়া, পড়াশোনা শেষ করা, বিয়ে ও ভালো চাকরি করতে দেখে ভীষণ ভালো লাগে। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, তারা এখন স্বাবলম্বী। মাঝেমধ্যে বলে, ‘বাবা, আমাদের জন্য কিছু রাখতে হবে না। তুমি নিজের জীবন উপভোগ করো।’ একজন অভিভাবক হিসেবে এর চেয়ে তৃপ্তির আর কী হতে পারে!

আপনার স্ত্রী-সন্তানদের কথা বলছিলেন, ব্যাংকিংয়ের এ দীর্ঘ পথচলায় পরিবার থেকে সহযোগিতা কেমন ছিল?

ব্যাংকে অনেক সময় দিয়েছি, কিন্তু আমার স্ত্রী কখনো এ নিয়ে অভিযোগ করেননি, বরং সবসময় বলেছেন, আমি যেটা ভালো মনে করব, সেটাই যেন করি। তিনি সানবীম স্কুলের শিক্ষক। আর সন্তানদেরও অতিরিক্ত কোনো চাহিদা ছিল না। তাদের চাওয়া ছিল ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাওয়া। পরিবারের এ সমর্থন আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে।

সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আপনার মা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন বললেন। মা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

আমার মা ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ। এ বছরের এপ্রিলে তিনি মারা গেছেন। আমাদের পড়াশোনাসহ সবকিছুই মায়ের হাতে গড়ে উঠেছে। আমরা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়িনি; সরাসরি তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম। প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল মায়ের কাছে। মা স্কুলের গণ্ডি পেরোননি, কিন্তু কবিতা লিখতেন, সাহিত্য আসরে অংশ নিতেন এবং ‘বেগম’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো। একসঙ্গে ক্যারম ও লুডো খেলতাম। বিয়ের পরও আমার স্ত্রী দেখেছে, মায়ের সঙ্গে রাত ১২টা পর্যন্ত টেলিভিশনে সিনেমা দেখছি।

আমার বাবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক ছিলেন। তিনি সবসময় আমাদের ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন। ভাইবোনেরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এক ভাই মেঘনা ব্যাংকের এমডি পদে আছেন। আরেক ভাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য। বোন ভিকারুননিসায় শিক্ষকতা করতেন, এখন কানাডায় ভালো সরকারি চাকরি করছেন। ছোট ভাই লন্ডনে কাজ করছেন। আমরা সব ভাইবোন নিজ নিজ জায়গায় ভালো অবস্থানে আছি।

আলোচনায় আপনার জীবনের যে গল্প উঠে এসেছে, তাতে একটি পরিপূর্ণ ও পরিতৃপ্ত জীবনের ছবি পাওয়া যায়। নিজের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মানুষের চাহিদার শেষ নেই। তবে নির্দিষ্ট কিছু অর্জন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কখনো ভাবিনি ব্যাংকার হব। অথচ এখনো একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এটি আমার জন্য অনেক বড় তৃপ্তির বিষয়। নিজেকে বাংলাদেশের সৌভাগ্যবান মানুষদের একজন মনে করি। দেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ব্যাংক খাতে কাজ করেন প্রায় আড়াই লাখ। তাদের সবাই তো আর প্রধান নির্বাহী হতে পারেন না। এ অর্জনের পেছনে আমার প্রতিশ্রুতি ও পরিশ্রমের ভূমিকা রয়েছে। নৈতিকতার সঙ্গে কখনো আপস করিনি। আইনস্টাইনের একটি উক্তি আছে—মেধা ১ শতাংশ, আর পরিশ্রম ৯৯ শতাংশ। আমি সবসময় পরিশ্রমে বিশ্বাস করেছি। কর্মজীবনের শুরুর দিকে অফিসে যাওয়ার যে তাগিদ ছিল, এখনো তা একই রকম আছে। কাজের প্রতি আগ্রহ ও স্পৃহা কখনো কমেনি।

নতুন প্রজন্মের যারা ব্যাংকিংয়ে আসছেন কিংবা ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী হবে?

কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই। যে প্রতিষ্ঠানেই কাজ করুন, কাজের প্রতি সৎ ও নিষ্ঠাবান থাকতে হবে এবং নিজের কাজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় দলাদলি ও কূটকৌশল থেকে দূরে থাকুন। সবসময় মানুষের উপকার করতে না পারলেও কারো ক্ষতি যেন আমরা না করি। সৎ উপার্জনের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমার জীবনদর্শন হলো বর্তমানে মনোযোগ দেয়া। লিও টলস্টয়ের ‘থ্রি কোশ্চেনস’ গল্পে পড়েছিলাম, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো বর্তমান। অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করলে বর্তমানের কাজ ভালো হবে না। তাই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করুন, নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। ভবিষ্যৎ এমনিতেই ভালো হবে।

দেশের ব্যাংক খাতে ফিরি। ২০০৯ সালের পরবর্তী দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাতে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। অনেকে সে সময় সাহস করে কথা না বললেও আপনি সরব ছিলেন। এ কারণে কখনো বিপদ কিংবা চাপে পড়তে হয়েছিল?

সে সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে চাপ আসত। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন মহল থেকে ফোন করে বলা হতো, ‘মাহবুব ভাই, বিষয়টি নিয়ে একটু কথা না বললেই পারেন।’ এক সহকর্মীও একবার বলেছিলেন, ‘সব বিষয়ে তোমাকে কথা বলতে হবে কেন?’ কিন্তু একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকে সত্য ও বাস্তবসম্মত কথা বলার চেষ্টা করেছি। কোনো পক্ষ নেয়ার জন্য নয়, বরং সঠিক তথ্য তুলে ধরার জন্য কথা বলেছি। কারণ কোনো বিষয়ে সঠিক তথ্য না দিলে সেটির ভুল ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সবার সঙ্গে পেশাদার আচরণ বজায় রাখারও চেষ্টা করেছি।

এখন অনেকে বলেন, সে সময় আরো দশজন আপনাদের মতো প্রতিবাদ করলে ব্যাংক খাতের আজ এ দশা হতো না। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২২-২৩ হাজার কোটি টাকা ছিল, যা এখন সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় ঠেকেছে। ব্যাংক খাতে কফিনের শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়েছিল ২০১৭ সালে, যখন ইসলামী ব্যাংককে রাতের অন্ধকারে দখল করা হয়েছিল। ওই শুরুটাই পুরো অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে গেছে।

বর্তমান সময়ে ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরছে বলে কি মনে করেন?

গণ-অভ্যুত্থানের পর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ড. আহসান এইচ মনসুর কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ এবং সুদহার ও বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ ছিল ইতিবাচক। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল ব্যাংক খাত সংস্কার করলেই হবে না; বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও অন্যান্য সংকটে অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না।

সুশাসন পুরোপুরি ফিরে এসেছে, এমনটা বলার সুযোগ এখনো নেই। গত ১৮ বছরে অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। তাদের অনেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাদের কাছে অবৈধ অর্থ এখনো রয়ে গেছে। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, আদালতের মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের দ্রুত বিচার এবং মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে বর্তমান গভর্নর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এখন থেকে আদালতভিত্তিক মামলাগুলো ফলোআপ করার কথা তিনি বলেছেন। এসব উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

সরকারের প্রতি পরামর্শ থাকবে, সবকিছু একসঙ্গে করতে না গিয়ে আট-দশটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এ কাজে এমন সৎ ও মেধাবী মানুষদের যুক্ত করতে হবে, যারা কোনো ধরনের আপস করবেন না।

দেশের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ এবং এমটিবির আগামী দিনগুলো নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

আগামী দিনে ব্যাংক খাতে স্বাভাবিক পুনর্গঠন ঘটবে বলে মনে করি। বর্তমানে দেশে ৫৭টি ব্যাংক থাকলেও ভবিষ্যতে এ সংখ্যা কমে ২০-২৫টিতে নেমে আসতে পারে। সব ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে। শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী ব্যাংকগুলোই বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারের দিকে এগোলে এসব ব্যাংকের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যাংকগুলোর মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।

এমটিবি গতকাল ২৮ বছরে পা রেখেছে। দীর্ঘ এ যাত্রায় পাশে থাকা ১৫ লাখ গ্রাহকের প্রতি আমি অশেষ কৃতজ্ঞ। ভালো-মন্দ নানা সময়ে তারা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। আমরা হয়তো দেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যাংক নাও হতে পারি, কিন্তু আমরা দেশের ‘মোস্ট রেসপন্সিবল’ এবং ‘মোস্ট রেসপেক্টেড’ ব্যাংক হতে চাই। সহকর্মীদের দিন-রাতের পরিশ্রমেই আমরা আজকের অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছি।