গত সোমবার সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে সরকারের একাধিক পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনে থাকলেও তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা-সমন্বয় কিংবা আনুষ্ঠানিক চিঠি চালাচালি করেনি ইসি।

এ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে—সরকারের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই ইসির এ এখতিয়ার আছে কিনা, ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ভোট হবে নাকি শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যাবে নির্বাচনের তারিখ?

পুরো বিষয়টিতেই সরকার ও ইসির মধ্যে একটি ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা না হওয়ায় নির্বাচনে ভোটের তারিখ পরিবর্তন হতে পারে বলেও মত দিচ্ছেন তারা।

গতকাল স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। এ নিয়ে কোনো চিঠি চালাচালি হয়নি।’ তিনি জানান, সাধারণত তফসিল ঘোষণার আগে সরকারকে জানানো হয়, আইন-শৃঙ্খলা কমিটি বৈঠক করে, বাজেট অনুমোদন হয়। এবার তা হয়নি বলে সরকারও অবগত নয়।

এরপর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে ইসির একক কোনো এখতিয়ার নেই।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ইসির ঘোষিত সূচি চূড়ান্ত নয়। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পর সিদ্ধান্ত হবে।

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু সময় পর ইসির অবস্থান স্পষ্ট করে সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘১৭ সেপ্টেম্বর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। নিশ্চিতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে দুদিন ধরে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে।’

তারিখ ঘোষণা নিয়ে ইসির এখতিয়ারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের মতো করেই আমরা আইনমাফিক করেছি। আমাদের একটা লিগ্যাল অবলিগেশন আছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইলেকশন করার, আমরা সেই বিবেচনাই করেছি। এছাড়া ঘোষিত তারিখটি কোনো পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত কিছু নয়, এটি পুরোপুরি একটি সম্ভাব্য সময়সূচি। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও অন্যান্য সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ১৭ সেপ্টেম্বর ঊর্ধ্বতন সরকারের সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের আলোচনার পর মতামত নিয়ে তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। তবে এখনই নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার মতো কোনো শঙ্কা নেই।’

সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, ‘সংবিধানের ১১৯ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ইসি সরকার আদিষ্ট বা অনুরোধপ্রাপ্ত হবে। অর্থাৎ ভোট আয়োজনের জন্য ইসিকে সরকারের সঙ্গে এক ধরনের আইনি সমন্বয় করে এগোতে হবে। সেখানে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সময়সূচি ঘোষণার ক্ষেত্রে এ জায়গায় এক ধরনের সমন্বয়ের ঘাটতি বা গ্যাপ দেখা যাচ্ছে।’

একই কথা জানিয়ে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, ‘ইসি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পূর্ব-আলোচনা ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশ করাতেই সরকার ও ইসির মধ্যে মূলত একটি ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে ইসির আলোচনা করা উচিত ছিল।’

জেসমিন টুলি জানান, এ ঘটনায় কোনো পক্ষেরই খারাপ কোনো উদ্দেশ্য নেই এবং যেহেতু আইন এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তাই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মতামতের পরই এ সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ বা চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে। এটাকে সরাসরি পিছিয়ে যাওয়া না বলে আলোচনার মাধ্যমে সমন্বয়ের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।