আর্থিক দুশ্চিন্তা কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে। ২০২৫ সালে আর্থিক চাপের কারণে কাজের উৎপাদনশীলতা কমে বলে জানিয়েছিলেন ৫৬ শতাংশ কর্মী। চলতি বছর এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশে। একইসঙ্গে কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অবসরজীবনের প্রস্তুতিতে নিয়োগদাতাদের সহায়তার প্রত্যাশাও বাড়ছে।

মেটলাইফ বাংলাদেশের এমপ্লয়ি বেনিফিটস ট্রেন্ডস স্টাডি (ইবিটিএস) ২০২৬-এর দ্বিতীয় সংস্করণে এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ মতিঝিলের মেটলাইফের প্রধান কার্যালয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়োগদাতাদেরও রয়েছে বলে মনে করেন ৮১ শতাংশ কর্মী। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে, কর্মীদের অবসরজীবনের জন্য সঞ্চয়ে সহায়তাও নিয়োগদাতাদের দায়িত্ব মনে করেন ৮৬ শতাংশ কর্মী। গত বছর এ হার ছিল ৬৭ শতাংশ।

কর্মীদের আর্থিক উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা অকালমৃত্যুর মতো পরিস্থিতিতে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, চিকিৎসার ব্যয় বহন, সংসারের আয় ধরে রাখা, সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটানো এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দেয়া।

গবেষণায় কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারও উঠে এসেছে। এতে অংশ নেয়া ৫৫ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, তারা প্রতিদিনের কাজে এআই ব্যবহার করেন। এআই ব্যবহারকারীদের ৯১ শতাংশ বলেছেন, প্রযুক্তিটি তাদের কাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কাজের চাপ কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানসিক ক্লান্তি কমানো এবং আরো অর্থবহ কাজে মনোযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে এআই সহায়ক বলে মনে করেন তারা।

তবে কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া বা প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় অংশ নেয়া নিয়োগদাতাদের ৫৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কর্মীদের এআই ব্যবহারে উৎসাহ দেন বা এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রেখেছেন। এসব নিয়োগদাতার মধ্যে মাত্র ৩৭ শতাংশ মনে করেন, কর্মীরা সহজেই এআই গ্রহণ করছেন।

এদিকে আর্থিক উদ্বেগ বাড়লেও চাকরি নিয়ে কর্মীদের সামগ্রিক সন্তুষ্টির হার বেড়েছে। ২০২৫ সালে ৭৮ শতাংশ কর্মী চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন, চলতি বছর এ হার দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশে। তবে বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত আর্থিক সংকট বা ব্যয়ের সময় নিয়োগদাতার সহায়তা প্রত্যাশা করেন ৭২ শতাংশ কর্মী।

কর্মীদের কাছে বীমা ও সুস্থতাসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধার গুরুত্বও বাড়ছে। গবেষণায় ৭৯ শতাংশ কর্মী বলেছেন, বীমা ও সুস্থতাসংক্রান্ত সুবিধা পেলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আনুগত্য বাড়বে। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৭৮ শতাংশ। জীবনবীমা, আয়ের সুরক্ষায় বীমা, গুরুতর অসুস্থতার বীমা এবং অক্ষমতাজনিত সুরক্ষার ক্ষেত্রে কর্মীদের প্রত্যাশা ও প্রতিষ্ঠানের দেয়া সুবিধার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

নিজেদের প্রয়োজন ও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আগ্রহও বেড়েছে কর্মীদের। ২০২৫ সালে ৬৫ শতাংশ কর্মী ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা পেতে আগ্রহী ছিলেন। ২০২৬ সালে এ হার বেড়ে হয়েছে ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ৭৮ শতাংশ নিয়োগদাতা কর্মীদের সুযোগ-সুবিধাকে ইতিবাচক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। চলতি বছর এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ শতাংশে।

অন্যদিকে, অবসরজীবনের প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছেন ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী অনেক কর্মী। এ বয়সী কর্মীদের মধ্যে যাদের অবসরজীবনের কোনো পরিকল্পনা নেই, তাদের হার ২০২৫ সালের ৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৮১ শতাংশ হয়েছে। অবসরজীবনের জন্য কীভাবে সঞ্চয় করতে হবে এবং সঞ্চিত অর্থ থেকে কীভাবে নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে নিয়োগদাতাদের সহায়তা চান কর্মীরা।

গবেষণায় বিভিন্ন খাতের মোট ৭০৯ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং ১২৬ জন নিয়োগদাতা। তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য, টেলিযোগাযোগ, খুচরা বিক্রয়, উৎপাদন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

মেটলাইফ বাংলাদেশের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আলা আহমদ বলেন, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র শুধু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের বিষয় নয়; কাজের জগৎ বদলে যাওয়ার সঙ্গে কর্মীরা যেন মানিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি, আর্থিক নিরাপত্তা, সুস্থতা ও প্রাসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে কর্মক্ষেত্রে আরো সম্পৃক্ত, সংকট মোকাবেলায় সক্ষম ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।