আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগের কথা, বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। এই ছোট বয়সেই বাবার সঙ্গে বিদেশে পাড়ি জমান মোহাম্মদ ফরিদ। সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান ভারতে। পরে সেখান থেকে পৌঁছান পাকিস্তানে। সেখানে কাজ করার সময় একদিন চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। বাধ্য হয়ে ফরিদের দুই পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকেরা। এরপর থেকেই হুইল চেয়ারের দুই চাকায় ভর করে চলছিল তার নিঃসঙ্গ জীবন।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে ফরিদ যখন কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না, এমন সময় এক মানবপাচারকারী তাকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। তার মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছান ফরিদ। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে কাটিয়ে দেন প্রায় ১৪ বছর। এ পুরো সময়জুড়ে দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন তিনি। শাস্তিস্বরূপ তাকে তিনবার আটক করে ক্যাম্পে রাখে তুরস্কের পুলিশ। সর্বশেষ গ্রেফতারের পর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

গত মঙ্গলবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। নিজের ও বাবা-মায়ের নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’—এটুকু ছাড়া তেমন কোনো তথ্যও দিতে পারছিলেন না। বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি ফরিদকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে। এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান।

সেই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার বিকালে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে কথা হয় তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কথোপকথনের একপর্যায়ে ফরিদের হাতে একটি আঙুল বেশি—অর্থাৎ ছয়টি আঙুল—থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সৈয়দ আলম। ছোটবেলার এ শারীরিক বৈশিষ্ট্যই দুই ভাইয়ের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে। পরিবারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন।

ফরিদ ১

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয় ফরিদকে। এ সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেল এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম বলেন, মোহাম্মদ ফরিদের ঘটনা যে কাউকে স্পর্শ করবে। আমরা তার পাশে থাকব।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে আমরা ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিতে পেরেছি। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া কঠিন কাজ। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা হয়েছে। তবে শুধু পরিবারের কাছে ফেরানো নয়, আমরা তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরো কিছু করতে চাই যাতে তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীরা বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

এর মধ্য দিয়ে ফরিদের বৃদ্ধ মা নূরজাহান বেগমের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। যে মা এত বছর ধরে বড় ছেলের ফেরার আশায় ছিলেন, এবার তার সেই অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।

ফরিদের ছোট ভাই সৈয়দ আলম স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। তিনি বলেন, আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। কক্সবাজারে আমাদের বৃদ্ধ মা, বড় ছেলের অপেক্ষায় আছেন। আমরা গরিব মানুষ। জানি না কী হবে। তবে আমরা আমাদের ভাইকে নিয়ে থাকব।