বগুড়ার আদমদীঘিতে পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন টানতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রোপণ করা অর্ধশত তালগাছের বেঁচে থাকা ঝুঁকির মুখে। ১৯৭১ সালে বিজয়ের নিদর্শন হিসেবে রোপণ করা অর্ধশতাধিক তালগাছের পাতা কাটছাঁট করা হয়। এতে গাছগুলো শুকিয়ে ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। এরই মধ্যে চারটি তালগাছ শুকিয়ে মারা গেছে। আরো ৩৬টি শুকিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছের অধিকাংশ পাতা কেটে ফেলায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের নিদর্শন হিসেবে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নসরতপুর রেলস্টেশনের পাশে শতাধিক তালগাছ রোপণ করেন। এ দলে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ত ম শামছুল হক, মুনছুর রহমান, আবুল কাশেম, জাহাঙ্গীর আলম, নজরুল ইসলাম, শাহাদত হোসেন, সুনীল কুমার সরকারসহ অনেকে। সে সময় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নসরতপুর কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ আ ত ম শামছুল হক ধারণা করেছিলেন ‘শতাধিক তালগাছ রোপণ করলে কমপক্ষে ৭১টি তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’ শতাধিক তালগাছের মধ্যে প্রায় ৭৫টি তালগাছ টিকে গেলেও সর্বশেষ ৪০টি তালগাছ বেড়ে ওঠে। সেই তালগাছগুলো ৫২ বছর পরও বিজয়ের চিহ্ন হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। সারিবদ্ধ এ গাছের দিকে তাকালেই ট্রেনযাত্রী, আগন্তুকসহ এলাকার সব মানুষেরই চোখ জুড়িয়ে যেত। শামছুল হকসহ অধিকাংশ বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করলেও তালগাছগুলো তাদের স্মৃতি বহন করছিল। 

মাথা মোড়ানোর ফলে তালগাছগুলো মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েছে। তবে দু-তিনটি গাছে নতুন করে পাতা গজাতে দেখা গেছে। বাকিগুলো হুমকির মুখে। যেকোনো সময় এগুলো মারা যেতে পারে। 

আদমদীঘি উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে উপজেলার মুরইল বাজার এলাকায় একটি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হয়। সেখান থেকে নসরতপুর এলাকায় বিদ্যুতের লাইন টানার সময় গত এপ্রিলে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে ওই তালগাছের মাথার দিকের বেশির ভাগ পাতা কেটে দেয়। কোনো কোনো গাছের একেবারে মাথাও কেটে দেয়া হয়। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কুমার সরকার বলেন, ‘স্বাধীনতা ও বিজয়ের স্মারক হিসেবে তালগাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল। পল্লী বিদ্যুতের লোকজন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত তালগাছগুলোর পাতা কেটে ফেলেছে। এতে গাছগুলো মরতে শুরু করেছে। একদিকে রেললাইন অন্যদিকে রেলের খাদ থাকায় তারাও (বিদ্যুৎ বিভাগ) নিরুপায় হয়েই কাজটা করেছেন। তবে যেভাবেই হোক বিকল্প কিছু করে তালগাছগুলো রক্ষার দাবি জানাই।’

আদমদীঘি উপজোর নসরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক আজাদ বলেন, ‘বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সরকার সারা দেশে তালগাছ রোপণ করছে। সেখানে তালগাছের সব কেটে দেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়।’

বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জি এম মনোয়ারুল ইসলাম ফিরোজী বলেন, ‘বিদ্যুতের লাইন স্পর্শ হওয়ায় তালগাছগুলোর মাথা কেটে ফেলা হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইন সঞ্চালন আইন মতেই এ কাজ করা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে অন্য তালগাছ রক্ষার চেষ্টা করা হবে।’