মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর আজ। ৩০ দিন সিয়াম সাধনার পর ঈদের আনন্দ উদযাপন করবেন বাংলাদেশের মুসলমানরা। বৃহস্পতিবার দেশের কোথাও ১৪৪৭ হিজরি সনের শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। গতকাল রমজান মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হওয়ায় আজ সারা দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হবে।

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমি দেশে ও প্রবাসে বসবাসকারী সকল বাংলাদেশী এবং সারা বিশ্বের মুসলমানদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। ঈদুল ফিতর মুসলমানদের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর অপার খুশি আর আনন্দের সুসংবাদ নিয়ে আমাদের মাঝে সমাগত হয় ঈদ। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিন মুসলমানরা সকল অন্যায়, অবিচার ও পাপাচার হতে মুক্ত হয়ে উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন ও পারলৌকিক মুক্তির প্রয়াস পায়। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এ অভিযাত্রায় ঈদুল ফিতরের শিক্ষা সকলের মাঝে নতুন উদ্যম ও অনুপ্রেরণা জোগাবে এ প্রত্যাশা করি।’

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীসহ বিশ্বের সব মুসলমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ঈদুল ফিতর আমাদের জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতার বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করুক, এই প্রত্যাশা করি। ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসবের একটি। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা ও সংযমের পর ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনে আনন্দ, শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। রমজান মাস সংযম, ত্যাগ, খেদমত ও আত্মশুদ্ধির অনন্য শিক্ষা দেয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন ঈদুল ফিতরের আনন্দ, রহমত ও বরকত আমাদের সবার জীবনে বর্ষিত করেন।’

যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ব্যাপক উৎসাহ, আনন্দ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সারা দেশের মুসলমানরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন। রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ঈদ জামাতের প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ব্যবস্থাপনায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। আবহাওয়া প্রতিকূল বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে এ জামাত অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে সকাল ৯টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাতে একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করবেন।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতিরা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, মুসলিম বিশ্বের কূটনীতিকরা জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। ঈদের প্রধান জামাতে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঈদগাহ ময়দানে ৩ হাজার ৫০০ নারীসহ মোট ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ, ওজু ও নামাজের সংরক্ষিত ব্যবস্থা থাকছে। এছাড়া পর্যাপ্ত ওজুখানাসহ মুসল্লিদের জন্য মেডিকেল টিমের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকায় ঈদ জামাতকে ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার। তিনি বলেন, ‘ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা নেই। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রসংলগ্ন পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সকাল ৮টায় কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান নগরবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদ জামাতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। ঈদগাহে প্রবেশের জন্য তিনটি গেট রাখা হবে এবং নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথের ব্যবস্থা করা হবে। মুসল্লিদের সুবিধার্থে ওজুর ব্যবস্থা রাখা হবে।

আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) দুই প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করবেন বলে ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো ঈদের পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদ জামাত সকাল ৭টা, সকাল ৮টা, সকাল ৯টা, সকাল ১০টা ও বেলা পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে।

জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ঈদের জামাত সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদের স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপরা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ-সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মুসল্লিরা এ জামায়াতে অংশ নেবেন। জামাত সবার জন্য উন্মুক্ত। জামাতে আগ্রহী মুসল্লিদের অংশগ্রহণের জন্য সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামি’আয় ঈদের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৮টায় এবং দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৯টায়।

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া মাঠে দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাতের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ১৮২৮ সালে প্রথম অনুষ্ঠিত জামাতের হিসেবে এটি হবে ঈদের ১৯৯তম জামাত। জামাত নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

মুসল্লিদের জন্য পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সকাল ১০টায় শুরু হবে এ জামাত। এ মাঠে একসঙ্গে তিন লাখেরও বেশি মুসল্লি জামাতে নামাজ আদায় করে থাকেন। রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে তিনবার বন্দুকের ফাঁকা গুলির শব্দে নামাজের প্রস্তুতি নেয়ার সংকেত দেয়া হয়।

সারা দেশে বিভাগ বা জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রধানরা জাতীয় কর্মসূচির আলোকে নিজ নিজ কর্মসূচি প্রণয়ন করে ঈদ উদযাপন করবেন। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো যথাযথ গুরুত্বসহকারে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার ও সংবাদপত্রে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবে।

ঈদ উপলক্ষে দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, বৃদ্ধনিবাস, ছোটমণি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, আশ্রয় কেন্দ্র, সেইফ হোমস, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র, দুস্থ কল্যাণ ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে উন্নত মানের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশন যথাযথভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে। এ উপলক্ষে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ঈদের দিন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা টিকিটে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সব শিশু পার্কে প্রবেশ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদের দিন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা টিকিটে জাদুঘর, আহ্‌সান মঞ্জিল, লালবাগের কেল্লা ইত্যাদি দর্শনীয় স্থানে প্রবেশ এবং তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশুদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।