চলমান করোনা পরিস্থিতিতে শিল্প-কারখানা চালুর সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানাগুলো পরিচালনার শর্ত বেঁধে দিয়েছিল সরকার। কারখানা মালিক ও সংশ্লিষ্টরাও সে সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইন প্রতিপালনের শর্ত মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে চালু থাকা এসব কারখানায় যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জেলায় চালু শিল্প-কারখানাগুলোয় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কিনা, সেটি তদারকি করতে কমিটি করেছে মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে গতকাল। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে. দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত গার্মেন্ট বা অন্যান্য শিল্প-কারখানার কোনো কোনোটিতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। জেলা পর্যায়ে অবস্থিত গার্মেন্ট বা শিল্প-কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং এ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার উদ্দেশ্যে জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সাত সদস্যবিশিষ্ট এসব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসককে। কমিটির সদস্য হিসেবে থাকছেন পুলিশ সুপার বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মেয়র বা প্রতিনিধি, বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ অথবা বিটিএমইএর প্রতিনিধি। এছাড়া কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে থাকছেন স্থানীয় সিভিল সার্জন।

কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, কমিটির সদস্য বা প্রতিনিধিরা নিয়মিত গার্মেন্ট বা শিল্প কারখানা পরিদর্শন করবেন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিল্প-কারখানাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন। কোনো কারখানায় কেউ কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত সন্দেহ হলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কিনা, সেটিও পর্যবেক্ষণ করবেন কমিটির সদস্য বা প্রতিনিধিরা।

এ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জনস্বাস্থ্য বিভাগের যুগ্ম সচিব নিলুফার নাজনীন। কমিটির সদস্য সচিবরা এ বিষয়ে ই-মেইলের মাধ্যমে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাকে অবহিত করবেন।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, চালু পোশাক ও শিল্প-কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে কমিটি কাজ করবে।

এর আগে ৩ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সাপেক্ষে সারা দেশের পোশাক ও অন্যান্য কারখানা খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে সারা দেশের পোশাক কারখানায় কর্মরত অনেক কর্মী নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি পোশাককর্মীর কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যান্য কারখানার হিসাব যোগ করা হলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরকে তিনটি আলাদা জোন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দেশের বেশির ভাগ পোশাক কারখানা এসব জেলায় অবস্থিত। নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিতের সংখ্যাও এ তিন জেলায় তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয় সভায়। সেক্ষেত্রে যদি কেউ এসব এলাকার বাইরে যান, তাহলে তাদের সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত কোয়ারেন্টিন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে বলেও বৈঠকে জানানো হয়। এছাড়া বৈঠকে কোনো কারখানায় বেশিসংখ্যক শ্রমিক নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হলে, সেটি বন্ধ করে দেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিল্প-কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় গার্মেন্ট কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীনও কারখানা সীমিত আকারে চালু না রাখা গেলে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মত দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালুর ওপর জোর দিয়েছিলেন তিনিও।

একইভাবে বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনও বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে কারখানা চালু করা হয়েছে। তবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শ্রমিকদের কাজ করতে হবে। মন্ত্রণালয় যদি মনিটরিং টিম তৈরি করে দেয়, তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।