গত চার বছরে যশোরে ১ হাজার ১১২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯৯ হাজার ৪৮৭ টাকা। ঢাকার অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন মারা যাওয়ার পর যশোরে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ ৭৫৮টি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিককে নোটিস দিয়েছে জেলা প্রশাসন। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি স্থাপন করে হালনাগাদ তথ্য ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৩ মার্চ যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কমলেশ মজুমদার স্বাক্ষরিত এক নোটিসে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। নোটিসে উল্লেখ করা হয়, অনাকাঙ্ক্ষি দুর্ঘটনা এড়াতে আট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিধিমোতাবেক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি (ড্রাই পাউডার ফায়ার এক্সটিংগুইসার ও কার্বন-ডাই অক্সাইড ফায়ার এক্সটিংগুইসার) স্থাপনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হলো।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স যশোরের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, নোটিস দেয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৬টি বাজার মালিক সমিতি, মার্কেট, সুপার মার্কেট ও শপিং মল ৮৭টি, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ৫০৫টি, বহুতল ভবন ৪৫টি এবং হোটেল রয়েছে ৫৫টি।
যশোর ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ২৬১টি। যার আর্থিক ক্ষতি ছিল ২ কোটি ৬৯ লাখ ৭১ হাজার ৬৮৭ টাকা। ২০২১ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ২৪৬টি। আর্থিক ক্ষতি ছিল ৫ কোটি ৭৬ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ টাকা। ২০২২ সালে যশোর জেলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ৩২২টি। যাতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল ২ কোটি ১১ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ২৮৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। যাতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল ২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
কর্মকর্তারা জানান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও ঘনবসতি এলাকায় বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আবার কিছু বহুতল ভবনেও আগুন লেগেছে। এসব বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের সক্ষমতা নেই ফায়ার সার্ভিস অফিসের। কেননা বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণে যে টার্ন টেবল লেডার (টিটিএল) গাড়ি প্রয়োজন, সেটি তাদের নেই। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে পানিস্বল্পতাও। কারণ গত তিন বছরে জেলায় শতাধিক পুকুর বা জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে।
যশোর পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ সাজিয়া সুলতানা জানান, গত তিন বছরে আড়াই শতাধিক ভবন অনুমোদন দিয়েছেন তারা। ছয়তলা পর্যন্ত ভবন অনুমোদন দিয়ে থাকে পৌরসভা। সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে কী পরিমাণ পুকুর বা জলাশয় ভরাট হচ্ছে তা নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়েছে। কেননা রাতারাতি সবাই পুকুর ভরাট করে ফেলছে।
পুকুর ভরাট করতে হলে অবশ্যই পৌরসভার অনুমোদন লাগবে বলে জানান, পৌর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফ হাসান। কেউ অনুমোদনবিহীন জলাশয় ভরাট করলে তাদের বিরুদ্ধ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
যশোর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ জানান, গত চার বছরে যশোরে ১ হাজার ১১২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯৯ হাজার ৪৮৭ টাকা।’
এ বিষয়ে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. ছোলজার রহমান জানান, যশোর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা রয়েছে চারতলা পর্যন্ত আগুন নেভানোর। কিন্তু শহরে ৮-১৪ তলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এরইমধ্যে যশোর পৌর এলাকার হোটেল সিটি প্লাজা, হাসান ইন্টারন্যাশনাল, কাপুড়িয়াপট্টির হোটেল নয়ন, হোটেল চৌধুরী, হোটেল ওরিয়ন ইন্টারন্যাশনাল, রেলবাজারের হোটেল শাহানাজসহ শতাধিক আবাসিক-বাণিজ্যিক ভবন মালিক, বিপণী বিতান মালিক সমিতি, বাজার মালিক সমিতি এবং হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নোটিস পাঠানো হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যশোরের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘যশোরের বড়বাজার, কালেক্টরেট মার্কেটসহ একাধিক মার্কেট অগ্নিঝুঁকিতে। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে হাতের কাছে ফায়ার এক্সটিংগুইসার রাখতে ব্যাপক সচেতনতা ছাড়া এমন দুর্ঘটনা মোকাবেলা কঠিন। শুধু ফায়ার সার্ভিস এই সংকট মোকাবেলা করতে পারবে না। এর জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে।’










