পুরনো বছরের জীর্ণতা, গ্লানি ও শোককে বিদায় জানিয়ে ‘পহেলা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ’কে বরণে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালির সর্বজনীন এ উৎসবে শামিল হয় তারা। দেশজুড়ে কোটি মানুষ একযোগে মেতে ওঠে নববর্ষ বরণের আনন্দে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনা বটমূলে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ সেথা শির’ প্রতিপাদ্যে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান।

গণতন্ত্র পুনরুত্থানের বার্তা দিয়ে সকাল ৯টা ৬ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে বের করা হয় ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এ বছরের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের সুরে ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। এতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। শুরুর দিকে ছিল অশ্বারোহী। তারপর পর্যায়ক্রমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বাংলাদেশের পতাকা হাতে শিক্ষার্থী, রোভার স্কাউট, প্রক্টরিয়াল টিম, সবশেষে শোভাযাত্রার প্রধান ব্যানার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় উপস্থিত হন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। আরো উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য, প্রক্টর ও শিক্ষকরা। শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউটার্ন নেয়। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলা অনুষদে এসে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে শেষ হয়।

শোভাযাত্রার মোটিফগুলোর মধ্যে মোরগ গণতান্ত্রিক ভোরের প্রতীক। হাতি সোনারগাঁর ঐতিহ্যবাহী মোটিফের স্মারক। পায়রা শান্তির প্রতীক। টেপা পুতুল-ঘোড়া গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নির্দেশ করে। দোতারা বাউল সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি মোটিফের সঙ্গে পাঁচটি পটচিত্রও ছিল। এসব পটচিত্রের কাজ করেছেন পটচিত্রী টাইগার নাজির। এসব পটচিত্রে সুন্দরবনে জীবিকা নির্বাহকারীদের ‘দেবী বনবিবি’, বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক মুঘল সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, লোকচিত্রকলা গাজীর পট এবং মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের চরিত্র বেহুলাকে তুলে ধরা হয়। শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, বাংলাদেশে গত দেড় যুগ এক ফ্যাসিবাদী শাসনতন্ত্রের মধ্যে ছিল। সেখান থেকে একটা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ দেশ আবার গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা করেছে। তাই যে নতুন ভোর, নতুন দেশ, নতুন গণতন্ত্রের সূর্য উদিত হয়েছে, তাকে শুভকামনা জানাতেই আমাদের প্রতীকী মোরগ। মোরগ যেমন আমাদেরকে প্রভাতে সূর্য ওঠার আগে জাগিয়ে দিয়ে শুভকামনা জানায়, আমরাও এ দেশে গণতন্ত্রের পুনরুত্থানকে শুভকামনা জানাই। আমরা চাই, এ দেশে আবার ন্যায়বিচার ফিরে আসুক।’

বৈশাখের আনন্দে শামিল হতে ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা অংশ নেন বৈশাখী শোভাযাত্রায়। দেশী পোশাকে রঙের মেলায় মিশে গেছেন তারা। একই সঙ্গে প্রকাশ করছেন নববর্ষের উচ্ছ্বাস।

এর আগে এদিন ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে রমনা বটমূলে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ সেথা শির’ প্রতিপাদ্যে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান। সকাল ৮টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে অংশগ্রহণ ছিল সর্বস্তরের মানুষের, অনুষ্ঠানের বিস্তৃতি ঘটে পুরো পার্কজুড়ে। উৎসবে শামিল হন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন সবাই। মিলনমেলা ঘটে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের। বাদ যায়নি শিশুরাও। অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশীরাও।

সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের পরিবেশনা দিয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী পরিবেশনা। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁইয়ের গান, লোকগান, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ ও জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান। এছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ ও প্রয়াত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা গীতিকার সুরকার ও চিত্রশিল্পী মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের গান পরিবেশন করা হয়। পরিবেশিত হয় মোট ২২টি গান। সর্বশেষ পরিবেশিত হয় জাতীয় সংগীত।

এদিন রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে ঐতিহ্যবাহী ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩-কে স্বাগত জানানো হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ, যা বাঙালির সংগীতপ্রেমের এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে। চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম।

ভোরের প্রথম প্রহরে সম্মিলিত কণ্ঠে গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। এরপর পর্যায়ক্রমে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীরা।

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে গতকাল সকাল থেকেই পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ প্রতিপাদ্যে বর্ষবরণ পর্ষদের আয়োজনে দিনব্যাপী উৎসব ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। এদিন সকাল ৯টায় দেশাত্মবোধক ও বৈশাখী গানের সমবেত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর মীনাবাজার সংলগ্ন সড়ক থেকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। রঙিন মুখোশ, লোকজ মোটিফ ও প্রতীকী উপস্থাপনায় সাজানো শোভাযাত্রাটি রাপা প্লাজা ঘুরে আবার মূল মঞ্চে এসে শেষ হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য ও শিল্পীরা। দিনব্যাপী এ উৎসব সন্ধ্যায় বাউল সংগীতের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। আয়োজকরা জানান, এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা।

যুদ্ধবিরোধী গান ও কবিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেছে চার প্রগতিশীল সংগঠন। এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ক্যাম্পাসের হাকিম চত্বরে ব্যতিক্রমী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট ও কোরাসের আয়োজনে অনুষ্ঠানে ইরান-ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া ধর্মান্ধ-মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোরতার অনুরণন ফুটে ওঠে এসব পরিবেশনায়। বিপুলসংখ্যক দর্শক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

কবিতা, গান, নৃত্য, আবৃত্তিসহ নানা আয়োজনে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করেছে বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ। বিকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’ শিরোনামে তাদের এ বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়। গণসংগীত সমন্বয় পরিষদভুক্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে দলীয় সংগীতে অংশগ্রহণ করে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, বহ্নিশিখা, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, আনন্দন, ভিন্নধারা, সুরতাল, সমস্বর, উঠোন, উজান ও সুরনন্দন। দলীয় নৃত্যে অংশ নেয় বহ্নিশিখা ও ধৃতি নর্তনালয়।

রাজধানী ছাড়াও দেশজুড়ে বর্ণিল আয়োজন ও উৎসবমুখর পরিবেশে পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উদযাপিত হয়েছে উৎসব, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।